আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দু’পক্ষেরই মাঠ দখলের প্রস্তুতি চলছে
প্রথম পাতা » আজকের সকল পত্রিকা » আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দু’পক্ষেরই মাঠ দখলের প্রস্তুতি চলছে


শুক্রবার ● ১২ জানুয়ারী ২০১৮

 ছবি সংগৃহীত

বঙ্গ-নিউজঃ এ বছরটি একাদশ সংসদ নির্বাচনের বছর। টানা নয় বছর সরকারে থাকা আওয়ামী লীগ চায় আগামীতেও ক্ষমতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে। তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি চায় দাবি আদায় করে ক্ষমতায় ফিরতে। তবে এই মুহূর্তে সবার চোখ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের দিকে। ধারণা করা হচ্ছে, এই রায় হতে পারে রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে এবং রায় বিপক্ষে গেলে রাজপথে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। অন্যদিকে, এখন থেকেই নির্বাচন পর্যন্ত রাজনীতির মাঠ দখলে রাখতে ধারাবাহিক কর্মসূচিসহ পরিকল্পনা নিয়েছে আওয়ামী লীগ।
আগামী নির্বাচন পর্যন্ত রাজপথসহ সারাদেশের মাঠ দখলে রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে আওয়ামী লীগ। দাবি-দাওয়া নিয়ে বিএনপি যাতে আবার মাঠে নেমে জ্বালাও-পোড়াও না করতে পারে এবং ফের যেন ওয়ান ইলেভেন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হতে পারে সেজন্য সতর্ক রয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি। কোথাও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। যে কোনোভাবেই হোক সারাদেশের মাঠ দখলে রাখার পরিকল্পনার বার্তা ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ মহানগর, জেলা-উপজেলাসহ তৃণমূল পর্যায়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। দলীয় সূত্র ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জানা গেছে, বিএনপি মাঠে নামা মানেই জ্বালাও-পোড়াও করা। এ বিষয়টি এখন থেকেই জোড়ালোভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরবে আওয়ামী লীগ। বিএনপি ফের মাঠে নেমে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে এবং সেক্ষেত্রে ওয়ান ইলেভেন সৃষ্টির আশংকা দেখছে ক্ষমতাসীনরা। তাই অযৌক্তিক দাবি-দাওয়া নিয়ে মাঠে নামার সুযোগ দেবে না আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, ওয়ান ইলেভেন থেকে আওয়ামী লীগ শিক্ষা নিয়েছে। কিন্তু বিএনপি শিক্ষা নেয়নি বলেই ভয়-আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া বিএনপি তার বর্তমান অবস্থা জেনে গেছে। নির্বাচনের আগেই সারা দেশে আওয়ামী লীগের জোয়ার দেখে বিএনপি বুঝে গেছে যে, আগামী নির্বাচনে তাদের পরিণতি কী। ভোট পাওয়ার মতো কোনো কাজ তারা করেনি। এ কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা তারা করছে। তবে বিএনপির সেই দুরভিসন্ধি বাস্তবায়ন করতে দেবে না আওয়ামী লীগ। দেশে আর ওয়ান ইলেভেন আসতে দেবে না আওয়ামী লীগ।

নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে এমনটি ধরে নিয়েই প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। তবে কোনো কারণে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে সেক্ষেত্রে কী হবে, তারও প্রস্তুতি রয়েছে দলটির। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে ক্ষমতাসীন জোটের প্রায় ১৫ জন নেতা ইত্তেফাককে জানান, নির্বাচনে কে অংশ নিলো, না নিলো তাতে রাজনীতিতে কিছু যায় আসে না। এটা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে না আসলে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় যেতে ১৪ দলীয় জোটের বেগ পেতে হবে না। থাকবে না কোনো ঝুট-ঝামেলা। ক্ষমতাসীন জোটের নেতাদের ধারণা, আদালতে শাস্তি পাওয়ার মাধ্যমে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। একই সঙ্গে মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের কাছে তারা পেরে উঠবেন না।

অপর দিকে, সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, আগুনে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা, সন্ত্রাস, ভাঙচুর কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে না। আমরা কখনোই এ ধরনের কাজ বরদাশ্ত করবো না। এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে কঠোর হাতে দমন করা হবে।

জানা গেছে, বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া এবং চার বছর সরকার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারায় ক্ষমতাসীন জোটে মনোবল এখন অনেক বেড়েছে। তারা মনে করে, নির্বাচন বানচাল করার সাধ্য বিএনপি জোটের নেই। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে এবং ১৪ দলীয় জোট এমনিতেই ক্ষমতায় চলে আসবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক কমে যাবে। তাই প্রার্থীদের খুব বেশি প্রচারণা না চালালেও চলবে। তাই প্রচারণার চেয়ে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে মাঠে নেমেছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। এদিকে জোটের শরিক দলগুলো এখন ভাগবাটোয়ারার ক্ষেত্রে নানা হিসাব কষছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা আগামী নির্বাচনে শতাধিক আসনে প্রার্থী দিতে চান। তবে আসন ভাগাভাগির বিষয়ে কৌশলী আওয়ামী লীগ। তাই যথাসময়ে অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে দলটি।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, শরিক দলগুলো গত নির্বাচনে ৬০ আসন চেয়ে পেয়েছে মাত্র ১৮টি। এবার ১০০ আসনের প্রস্তুতি নিলেও তাদের কয়টি দেওয়া হবে তা জানার জন্য নির্বাচনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। নেতাদের এমন বক্তব্যে ধারণা করা হচ্ছে, আসন ভাগাভাগি নিয়েই জটিলতায় পড়বে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম জানান, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করা অপরিহার্য। আগামী নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী হবে। এক্ষেত্রে সংবিধানের বাইরে গিয়ে কারো অযৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়টি আদালতের বিষয়। তবে কোনো মহলের অন্যায় আন্দোলন, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সময় ও স্রোতের মতো আগামী নির্বাচন কারো জন্য অপেক্ষা করবে না। নির্বাচন বিএনপি বা কারো জন্য বসে থাকবে না। সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির নির্বাচন ঠেকানোর সাধ্য থাকলে দেকাক। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জনগণ তাদের প্রতিহত করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম ও সম্পাদকমণ্ডলীর ৫ জন সদস্য, ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় ২ জন নেতা, জাসদের ৩ জন নেতাসহ ১৪ দলীয় জোটের ১৫ জন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, রাজনৈতিক গ্যারাকলে পড়েছে বিএনপি। এ যাত্রায় তারা এ থেকে রক্ষা পাবে না। তারা বলেন, মাঠের রাজনীতিতে বক্তব্য দিয়ে বিএনপি নেতাদের মোকাবিলা করা হবে। একই সঙ্গে তাদের অতীত অপকর্মের মামলা ও গ্রেফতারের চাপ তো রয়েছে। এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট আবার ক্ষমতায় আসবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ’জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ মামলায় যুক্তিতর্ক প্রায় শেষ পর্যায়ে। আদালতে তার আইনজীবীরা যুক্তি উত্থাপন করছেন। গতকাল নবম দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। আগামী ১৬, ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি পরবর্তী যুক্তিতর্কের দিন ধার্য করেন আদালত।আইনজীবীরা বলছেন, আগামী মাসে মামলার রায় হতে পারে। সমপ্রতি বিশেষ আদালতে নিজের ‘সাজা’ শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বেগম জিয়া। দুই মামলায় ‘সাজা’ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তার দলের নেতা-কর্মীরাও।

এই আশংকাকে আমলে নিয়ে দুই ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বিএনপি। প্রথমত, রায়ের পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তারা উচ্চ আদালতে যাবেন এবং দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হবে রাজপথে। মূলত বিএনপি আদালতে লড়াই অব্যাহত রাখলেও ভেতরে-ভেতরে রাজপথে কর্মসূচি ও কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে দলটির হাইকমান্ড। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ধরন, রাজপথে প্রতিক্রিয়ার কৌশল নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে দলটির ভেতরে। এরই মধ্যে গত সোমবার রাতে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই খালেদা জিয়াকে ছাড়া আগামীতে নির্বাচনে অংশ নেওয়া হবে না।

বেগম জিয়ার আইনজীবী ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, নিরপেক্ষভাবে বিচার করা হলে খালেদা জিয়া সম্পূর্ণভাবে খালাস পাবেন। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, (দুদক) পারেনি। মওদুদ আহমদ বলেন, ধরে নিলাম মিথ্যা মামলায় একটি রায়ে তার (খালেদা জিয়া) সাজা হয়ে গেল। ভালো কথা, আমরা আপিল ফাইল করব। আপিলটা হলো কনটিনিউশন অব দ্য প্রসিডিংস। অর্থাত্ যে বিচার হয়েছে, এটা হলো সে বিচারের ধারাবাহিকতা। তখন আমরা তার জন্য ইনশাআল্লাহ জামিন নেব। বেগম খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হলেও নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারবেন। সাজা হলেও খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি দল ও জোটের নেতৃত্বও দিতে পারবেন। তিনি বলেন, সাজানো রায় হলে আইনী লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে মোকাবিলা করা হবে।

আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, আমরা যে যুক্তি উপস্থাপন করেছি তাতে ন্যায় বিচার হলে সাজা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে বিচার প্রভাবিত করা হলে ভিন্ন কিছু হতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা উচ্চ আদালতে যাব। আইনগতভাবেই মোকাবিলার সব রকম প্রস্তুতি রয়েছে আমাদের। আইনি লড়াই এবং রাজপথে লড়াই চলবে। কর্মসূচি আসবে। সময়মত সব কিছু হবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আইনি লড়াই চলছে। সামনেও চলবে। রাজনৈতিকভাবে আমরা মোকাবিলা করবো।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে মামলা চলছে, তাতে সাজা হওয়ার কোনো গ্রাউন্ড নেই। এর পরও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাজা দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে সরকার। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাজা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে আন্দোলনের মুখে সারাদেশে রাজপথ বন্ধ হয়ে যাবে।

এদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা দুটো শেষ না হতেই আরও ১৪টি মামলা বকশীবাজারে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে নেওয়া হয়েছে। বিএনপি এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, খালেদা জিয়ার মামলা বিশেষ আদালতে নেওয়ার মানেই হচ্ছে, তাকে হয়রানি করা। আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রচারণায় চেয়ারপারসনকে নামতে না দিয়ে হয়রানি করার জন্য এই মামলাগুলো সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে এসব করে কোনো লাভ হবে না।

দু’টি মামলায় যুক্তিতর্ক উত্থাপনের জন্য দিন ধার্য থাকলেও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় যুক্তিতর্ক চলছে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্ক এখনও শুরু হয়নি।

বাংলাদেশ সময়: ৮:২৪:০৯ ● ৫০ বার পঠিত



পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আরো পড়ুন...