“রঙ্গে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন’- জালাল উদদীন মাহমুদ

Home Page » ফিচার » “রঙ্গে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন’- জালাল উদদীন মাহমুদ
বুধবার, ১০ অক্টোবর ২০১৮



 

 জালাল উদদীন মাহমুদ

দ্বাদশ কিস্তি
তালোড়া শাখায় 11 মাস- ষষ্ঠ পর্ব।

একদিন ম্যানেজার সাহেব ব্যাংকে ঢুকেই শাখার কেয়ারটেকার আমিনুরকে বললেন ”আমার পেটের খুব অসুখ তাড়াতাড়ি মজিদ ডাক্তারের নিকট থেকে ঔষধ নিয়ে এসো। ” আমিনুর কিছুক্ষণের মধেই দুধের মত সাদা সিরাপ ও ক্যাপসুল নিয়ে এসে বললো ”ডাক্তার এখনই ১টি ক্যাপসুল ও ২ চামচ সিরাপ খেতে বলেছে।” ম্যানেজার খেয়ে নিলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বাথরুমে ঢুকলেন। আমরা ভেবেছিলাম গ্রাম্য ডাক্তার মজিদও ঔষধ নিয়ে সাথেই আসবে। কারণ এ ডাক্তার বেশ কিছু দিন ধরে ম্যানেজারের কাছে ঘোরাঘুরি করছিল 25000/- টাকা ঋণ নেয়ার জন্য। ম্যানেজার বলেছিলেন চলতি হিসাবে অন্ততঃ ২গুন লেনদেন করতে। ডাক্তার করেছে কি একজনের কাছ থেকে 50000/- টাকা ধার নিয়েছেন। তাকে অনেক গুলি চেক দিয়েছে। সম্ভবতঃ লাভের উপর ধার নিয়েছে। ঐ ভদ্রলোক সপ্তাহে 1/2 দিন তারিখ অনুসারে চেক নিয়ে ব্যাংকে আসে আর টাকা তুলে নেন। ফুল অটোমেটিক পদ্ধতিতে লেনদেন চলছিল। আমাদেরও মনে হলো ডাক্তার দেউলিয়া গোছের ছিলেন। তবে লোনের জন্য হিসাবের এ লেনদেনের পদ্ধতি আমার কাছে ইউনিক মনে হয়েছিল। অনেকটা চাবী মাইরা দিছে ছাইড়া জনম ভরে ঘুরতাছে গোছের। ধার নিয়ে ঋণদাতাকে চেক দিয়েছে হিসাবে লেনদেন হচ্ছে। বাঃ এরি নাম বুঝি বুদ্ধির খেলা। চলনে বলনে মেরুদন্ডহীন , স্বভাব চরিত্রে দুর্বল , পিঠ বাকাঁ সাধাসিধে চেহারার ডাক্তার পাজামা –পাঞ্জাবী পরে ঘুরতেন। তিনি হিসাবে লেনদেনের পরিমান বাড়ানোর এ পদ্ধতি যে কোথ্থকে পেয়েছিলেন তা আজও আমার বোধগম্য হচ্ছে না । এ ডাক্তারের ঋণ অবশ্য শেষ পর্যন্ত হয় নাই। হিসাবে জমা একবার ,তবে উত্তোলন বহুবার। হিসাবে লেনদেনের এ চরিত্র দেখে রফিক সাহেব তাকে জিজ্ঞাসা করলে ডাক্তার লেনদেনের এ অভিনব পদ্ধতির কথা স্বীকার করে।। এত সামান্য চালাকিতে কি আর লোন হয়?

যা হোক মিনিট বিশেক পরেই সেই ডাক্তার এসে রোগীর হাল- হকীকত জানতে চাইলেন। আমরা চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি রোগীর হাল হকীকত খুবই খারাপ। উনি একবার বাথরুম থেকে বের হন তো দুই বার ঢোকেন। ইতোমধ্যে প্যান্ট খুলে তোয়ালে পরে নিয়েছেন। ডাক্তার সব দেখে বললেন ম্যানেজার স্যার চিন্তুা করবেন না আমি এমন ওষুধ দিছি পেট একদম ক্লিয়ার হবে। তবে কোষ্ঠ্য ঠিন্য কেন হয়েছিল। 0মাক-সব্জি খান না ? “কোষ্ঠ্য কাঠিন্য! কিসের কোষ্ঠ্য কাঠিন্য! আমি শেষ রাত থেকে শুধু বাথরুমে যাচ্ছিলাম তা বন্ধ হবার জন্য ঔষধ আনতে পাঠিয়েছি। ”ম্যানেজার ক্ষীণ কন্ঠে বলেই চলছেন। ডাক্তার তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন আপনার কোষ্ঠ্য কাঠিন্য না? তবে আমিনুর যে বললো । আমি তো তাড়াতাড়ি পেট ক্লিয়ার করার কড়া ডোজের ঔষধ দিয়েছি। আমরা শুনে থ । ম্যানেজার সাহেব চিৎকার করে বাথরুম থেকে বলতে লাগলন ঐ আমিনুর যেন পালাতে না পারে। ওকে ধরেন। ওকে বেঁধে রাখেন। ওরে বাবারে ! বলে আবার বাথরুমের দরজা বন্ধ করলেন। রফিক সাহেব পাশের দোকান না কোথা থেকে একটি লুঙ্গি ও তোয়ালে এনে উনার হাতে দিলেন। খাবার স্যালাইন কোথায় পাবে –তখন তো তার প্রচলনই হয় নাই। ওদিকে ডাক্তার ও আমিনুল সেদিন সারাদিনই লাপাত্তা।

সন্ধ্যার আগ দিয়ে ম্যানেজারের বাসা থেকে এক সেট পোশাক আনানো হল। সারাদিন উনি প্রায় সিটেই বসতে পারেন নাই। নতুন কাপড়-চোপড় পরা হলে বাসায় তাকে পৌঁছে দেবার জন্য রফিক সাহেব রওনা দিলেন কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই রফিক সাহেব ফিরে এলেন । জানালেন তিনি এখন অনেক সুস্থ , টেলিফোন এক্সচেন্জ অফিসে ঢুকেছেন , পরে বাসায় যাবেন। বললাম কোথায় হয়তো জরুরী ট্রাঙ্ককল করবেন। রফিক সাহেব আমার মুখের দিয়ে তাকিয়ে নতুন করে আবিস্কার করলেন এখনও জগৎ সংসারের সবকিছু বোঝার বয়স আমার হয় নাই। এত বছর পর আজও মনে হয় জগৎ সংসারের সবকিছু বোঝার বয়স আমার এখনও হয় নাই। গুনের নামতা মুখস্থ করার সময় শিখেছিলাম দুই দ্বিগুনে চার হয় । কিন্তু অহরহ তো পৌনে চার বা সোয়া চারও হতে দেখি। যা হোক ,সেদিন রফিক সাহেবের তাচ্ছিল্য ভরা চাহনীতে আমার জ্ঞানের যে দীনতা ধরা পড়েছিল , সারা কর্ম জীবনে তা আর ঘোচে নাই। এখনও অবস্থার তেমন হের ফের হয়েছে বলে মনে হয়না । তবে ব্যস্ত ব্যাংকিং জীবনে সারা দিনমান কাজে ব্যস্ত থাকার পর জগৎ সংসারের দিকে মনোযোগ দিয়ে জ্ঞান বাড়ানোর এত সময়ই বা কোথায় ছিল?

আমার কথা থাক । সেদিনের পলাতক আমিনুরের কথায় ফিরে আসি। চুপিচুপি বলে রাখি এ ঘটনায় আমিনুর শাখার সবার চোখে নায়ক বনে গেল। শুধু ম্যানেজারের চোখে খল নায়ক। আর হতভাগা সে গ্রাম্য ডাক্তার পরদিন শাখায় এসে পান্জাবীর কোণা দিয়ে রফিক সাহেবের সামনে চোখের জল মুছতে মুছতে বলতে লাগল - মূর্খ , বোকা, গাধা ,আমিনুরের দোষে তার লোনটাও বোধ হয় আর হবেনা। আমিনুর সহ অফিসের কেউই ডাক্তারের এ গালিগালাজে উত্তেজিত হবার কোন কারন খুঁজে পেলনা। আফটার অল আপদে-বিপদে সবাই তার দোকানে যেয়ে ওষুদ-বড়ি নিয়ে আসে। । কিন্তু ম্যানেজার সাহেব ডাক্তার সাহেবের পানে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আজ আবার যখন টয়লেটে ঢুকলেন –ডাক্তার সাহেব তখন হাউমাউ করে ডুকরে কেঁদে উঠল । আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেজার চেক করছিলাম। বিরুক্তির একশেষ হয়ে চেয়ারে বসে পড়লাম। যেমন ডাক্তার তেমনি তার রোগী। রফিক সাহেব ডাক্তারকে টেনে নিয়ে ব্যাংকের সামনেই পানের দোকানে গেলেন । পান আবার রফিক সাহেবের খুব প্রিয়। কিছুক্ষণ পর পর আয়েশী ভঙ্গিতে পানের পিক ফেলতেন আর মাথায় চুন মাখা পানের বোটাটা গর্ব সহকারে রাজসিক ভঙ্গিতে দুই আংগুলের মাঝখানে চেপে ধরে রাখতেন। যা হোক ডাক্তারকে বিদায় করে রফিক সাহেব অফিসে ঢুকলেন , ম্যানেজার সাহেবও বাথরুম থেকে বের হয়ে অনেকটা অনুযোগের সুরে রফিক সাহেবকে বললেন তিনি যেন এ ডাক্তার আর আমিনুরকে খামাখা পাত্তা না দেয়। আমিনুরকে কোথায় বদলী করা যায় আর ডাক্তারকে কেমনে ব্যাংক থেকে তাড়ানো যায় সে বিষয়ে তার চিন্তা ভাবনা আছে।
আচ্ছা, আমিনুর কি সহজ সরল ছিল ? নাকি বোকা ছিল ? তার এ কাহিনী লেখার সময় এ কথাটি বারবার ভাবতে ভাবতেই তাকে নিয়ে আরো দুটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। প্রথমটি আবারও বাথরুম নিয়ে তবে তা ম্যানেজার সাহেবের সাথে না স্বয়ং আমার নিজের সাথে।(ক্রমশঃ)

বাংলাদেশ সময়: ৮:০৯:৫২   ৯৪ বার পঠিত   #  #  #  #  #  #




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

ফিচার’র আরও খবর


বাংলায় কচুরিপানা-জালাল উদ্দীন মাহমুদ
জৈন ধর্ম কি (Jain) এবং কাহারা জৈন ধর্মের অনুসারী- জালাল উদদীন মাহমুদ
সুনামগঞ্জ-১ঃ এমপি রতন কে পরিবর্তনের দাবি
আওয়ামীলীগের প্রার্থী বাচাই সম্পন্ন
সুনামগঞ্জ জেলা যুবদলের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সহ-সম্পাদক এম.শহীদের প্রেস বিজ্ঞপ্তি
বি এন পি ঘটিত সহিংসতার প্রতিবাদে উত্তরায় ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল।
নয়াপল্টনে পুলিশ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষ!
বাংলার বিজয় বাঙ্গালীর হেম-যোবায়ের শামীম
“রঙ্গে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন”- জালাল উদদীন মাহমুদ
“রঙ্গে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন “-জালাল উদদীন মাহমুদ

আর্কাইভ