“রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন “ -জালাল উদদীন মাহমুদ

Home Page » বিনোদন » “রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন “ -জালাল উদদীন মাহমুদ
বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০১৯



 

জালাল উদদীন মাহমুদ

৭৬তম পর্ব–
ডেমাজানি শাখা ,বগুড়া -৩৫ , মোহাম্মদ হোসেন স্যার -১

মোহাম্মদ হোসেন নামক একজন নামকরা আমলাকে ১৯৮৩ সালে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। উনি তখন বাংলাদেশ সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারী ছিলেন। মোগল আমলে কে দিল্লীর বাদশা হলো তা নিয়ে সে সময় গ্রামের সাধারণ জনগনের নিশ্চয় মাথাব্যথা ছিলনা। ডেমাজানী শাখা গ্রামীণ শাখা । আমরা থাকতামও গ্রাম এলাকায়। ব্যাংকের কে এমডি হলো তা নিয়ে জোনাল হেডের মাথাব্যথা থাকলেও সে সময়ে আমাদের মাথা ব্যথা একদমই ছিল না। তবে মোহাম্মাদ হোসেন স্যার এম ডি হবার কয়েক মাস পর তাকে নিয়ে গ্রামীণ শাখাসমূহেও মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেল । স্যার সরাসরি দুরদুরান্তের শাখাসমূহ ভিজিট করতেন। সামান্য ত্রুটি পেলেই দুরের কোন জেলায় বদলী কনফার্ম। এ কথাটা তড়িৎ বেগে সারা দেশে চাউর হয়ে গিয়েছিল। তবে আমাদের ডেমাজানী শাখায় স্যারের যে সিদ্ধান্ত নগদে আলোড়ন তুললো –তা হলো বেশী কৃষিঋণ রয়েছে-এমন শাখা সমূহে উনি একজন করে প্রধান কার্যালয় থেকে কর্মকর্তা নিয়োজিত করে দিলেন তার একমাত্র কাজ হলো কৃষি ঋণ আদায়। সে সব কাহিনী তো পূর্বেই বলেছি।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭১ থেকে ১৯৭৬- এ কয়েক বছর বাংলাদেশে কৃষিঋণ বিতরণের প্রধান প্রতিষ্ঠান ছিল বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং সমবায় সমিতিসমূহ।
কৃষিঋণের সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কৃষিঋণ দেয়ার কাজে সম্পৃক্ত করে সরকার। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রায় সবক’টি গ্রামীণ শাখা কৃষিঋণ বিতরণে নিয়োজিত হয়ে পড়ে। এতে অবশ্য প্রসার ঘটে কৃষিঋণের। ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গ্রামীণ শাখার মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণের মোট পরিমাণ ছিল ৮৬ কোটি টাকা। নয় বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৮৪-৮৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকায় (২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকায়।)। মোহাম্মদ হোসেন স্যার যখন অগ্রণী ব্যাংকে এমডি হিসেবে যোগদান করেন। তখন রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কৃষি খাতে নিঃসন্দেহে অনেক খেলাপী ঋণের সৃষ্টি হয়েছিল। তাছাড়া হঠাৎ এসব ব্যাংকগুলোকে কৃষিঋণের দ্বায়িত্ব দেয়া হলেও এ বিষয়ে পযার্প্ত ট্রেণিং , নির্দেশিকা ও লোকবল ছিল না। কৃষি ঋণ আদায় করতে পি ডি আর অ্যাক্ট নামক আইনের সহায়তা নিয়ে সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করতে হয়। এছাড়া জামানতবিহীন এ সব ঋণ খুব দ্রুত তামাদি আইনে বারিত হয়ে পড়তো। তামাদি আইনে বারিত হয়ে পড়লে তা আর আইনের আওতায় আদায় যোগ্য থাকেনা। সব দায়- দায়িত্ব পড়ে ম্যানেজারের উপর। ম্যানেজারের পেনশন থেকে তার আমলে সৃষ্ট তামাদি ঋণের টাকা কেটে রাখা হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যাংকারদের কৃষিঋণ বিষয়ে তেমন জ্ঞান ও পূর্ব অভিজ্ঞতা সে সময় ছিল না। মোহাম্মদ হোসেন স্যার এমডি হিসেবে যোগদান করে এ সব বিষয়ের উপর পুস্তিকা রচনা করে সারা দেশের ব্যাংক শাখা সমূহে পাঠিয়ে দেন। খয়েরী রংয়ের এসব পুস্তিকা খুঁজলে এখনও শাখা সমূহে পাওয়া যাবে। রুরাল ক্রেডিট সুপারভাইজার ও মাঠ সহকারী নিয়োগ দেয়া হয়। স্যার সম্ভবতঃরাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে হঠাৎ সৃষ্ট বিপুল পরিমান খেলাপী কৃষিঋণ নিয়ে উদ্বিগ্ণ ছিলেন। তাই হয়তো তিনি বেশী খেলাপী কৃষিঋণ রয়েছে-এমন শাখা সমূহে একজন করে প্রধান কার্যালয় থেকে কর্মকর্তা নিয়োজিত করে দিয়েছিলেন। এ সব কথা অবশ্য আগেই আমি উল্লেখ করেছি ।

একদিন হঠাৎ শোনা গেল ব্যাংকের তৎকালীন এমডি মোহাম্মদ হোসেন স্যার বগুড়ায় আসবেন। শাখা পরিদর্শনের সময় কোনও ক্রটি পেলে সাথে সাথে ম্যানেজারের সাত সমুদ্র তের নদী পারে পোস্টিং। সাত সমুদ্র তের নদী বললাম এজন্য যে, সে সময় যমুনা নদীর উপর ব্রীজ ছিলনা। ভাল পরিবহন ব্যবস্থাও গড়ে উঠে নাই। সে যুগে বৌয়ের ভালবাসা সহজে মিললেও যাতায়াতের জন্য ভাল বাস মিলতো না সহজে। উত্তরবঙ্গ বাসীর কাছে ঢাকাই ছিল তাই সুদুর। আর চিটাগাং -বরিশাল তো আন্দামান। যাহোক অবশেষে স্যারের বগুড়া আসার সেই তারিখ এসে গেল। আগে থেকেই আমাদের জানিয়ে দেয়া হলো সেদিন একটু রাত হলেও আমরা যেন শাখা ত্যাগ না করি। উনি কোন কোন শাখায় যাবেন তা হয়তো জোনাল অফিসও জানতো না ।
ডেমাজানী শাখায় আমরা সেদিন রাত ৮/৯ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে যখন বুঝলাম স্যার আর এ দিকে আসবেন না তখন ব্যাংক ত্যাগ করলাম। মোবাইল নাই-ফোন নাই- সেদিনের স্যারের বগুড়া সফরের সব খবর আমার শাখায় আসতে আসতে ২/৩ দিন পার হয়ে গেলো। তবে পাশের মাঝিড়া শাখার খবর পরদিনই পেলাম। মাঝিড়া শাখার ক্যাশিয়ারের সাথে দেখা হয়েছিল রাস্তায়। সে বিশদ বর্ননা দিল।

মাঝিড়া শাখার ম্যানেজার মুনছুর ভাই। তালোড়া শাখা নিয়ে লেখার সময় তার নাম আমার লেখায় এসেছিল। ঐ যে ক্লোজিং এ নির্ধারিত সময়ের আগেই হিসাবে সুদ দিয়ে টেনশনে ভুগতেন। মুনসুর ভাই স্কুল শিক্ষক থেকে ব্যাংকার হয়েছেন। কিন্তু সব সময় নার্ভাস আর ভয়ে ভয়ে থাকতেন। শাখার সামনে একটা লাল পাজেরো জীপ থামতেই উনি বুঝলেন এমডি মোহাম্মদ হোসেন স্যার এসেছেন। উনি নাকি এত জোরে চিৎকার করে ”এমডি এসেছে -এমডি এসেছে” বলে ছিলেন যে শাখার সবাই লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। মুনছুর ভাই তখন প্রিন্সিপাল অফিসার। কিন্তু এম ডি স্যার যখন জিজ্ঞেস করলেন আপনি কোন গ্রেডের অফিসার- তখন নাকি উনি ভয় পেয়েই হোক আর অন্য কোন কারনেই হোক ফস করে বলে বসলেন আমি সিনিয়র অফিসার। পাশ থেকে সেকেন্ড অফিসার শহিদুল্লাহ ভাই বলে বসেছিলেন যে আপনি তো প্রিন্সিপাল অফিসার। ভাগ্যিস এম ডি স্যার তা শুনতে পাননি। মুনছুর ভাইয়ের কাজকর্ম পরিষ্কার। কোন ভুল পাওয়া যায়নি। তারপর নাকি এমডি স্যার বলেছিলেন ডেমাজানি শাখা কতদূর আর মাদলা শাখা কতদূর। দুটোই সমান দূরে। তবে মাদলা শাখা শহরের দিকে। স্যার নাকি প্রথমে ডেমাজানির দিকে গাড়ি নিতে বলেছিলেন পরে সিদ্ধান্ত বদলে যান মাদলা শাখার দিকে।
এ ঘটনার কয়েকদিন পরেই মুনছুর ভাইয়ের সাথে দেখা । বললাম , মুনছুর ভাই আপনি নাকি এমডি স্যারকে দেখে নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন ? মুনছুর ভাই আমার হাত ধরে বললেন –হ ভাই , হ ভাই। আমি সব সময় নার্ভাসনেসে ভুগি , কি করি বলোতো ? আমি বললাম –আমার মত ডায়েরি লেখার অভ্যাস করেন। মুনছুর ভাই বললেন আমি তো কখনোই ডায়েরি লেখি নি।
আমি বললাম এখন থেকে লেখার চেষ্টা করুন। যে বিষয় আপনাকে কষ্ট দেয়, মানসিক চাপের কারণ হয়, সেটি ডায়রিতে লেখেন। আপনি কী চান বা কী করলে আপনার ভালো লাগত সেই গুলিও লেখেন। ডায়রি লেখার অভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
মুনছুর ভাই বললেন – ডায়েরি লিখলে আসলেই মানসিক চাপ কমে না কি তুমি মশকরা করছো ?
আমি বললাম- দেখেন মুনছুর ভাই সব কথা সবাইকে তো আর বলা যায় না। আবার কিছু কিছু কথা কাউকে না কাউকে না বলেও থাকা যায় না। আশেপাশের সবাইকে কি আর ভরসা করা যায়? চিন্তা করে দেখেন আপনার সবচেয়ে ভরসাযোগ্য ব্যক্তি কিন্তু আপনি নিজেই! ডায়েরি লেখা মানে নিজের কাছে নিজের স্বীকারোক্তি, নিজের সাথে নিজে নিজে নিজেই কথা বলা। নিয়মিতভাবে ডায়েরি লিখলে মানসিক চাপ কমতে বাধ্য। মনের চাপা উদ্বেগ নিজের জন্য লিখে ফেলা ডায়েরি কথাগুলোতে বন্দি হয়ে থাকে।
মুনছুর ভাই গভীর মনোযোগের সাথে আমার কথা গুলো শুনলেন । মান্য করেছিলেন কিনা জানিনা। তবে এখনও আমি বিশেষ করে ছাত্রদের এ ডিজিটাল যুগেও ডায়েরি লেখার পরামর্শ দিয়ে থাকি। ডায়েরি লেখার অভ্যাস না থাকলে এসব স্মৃতিকথা লেখা দুরূহ হয়ে পড়তো।
সেদিন এমডি স্যারের মাদলা ও নিশিন্দারা শাখা পরিদর্শনের বিয়োগান্তক ঘটনাও মুনছুর ভাইয়ের কাছ থেকেই শুনতে পারলাম। তার কাছ থেকে সেদিনের শোনা ঘটনাগুলি আমার মত করে এখন লিখবো।(ক্রমশঃ)

বাংলাদেশ সময়: ৯:২৪:২৮   ৭৮ বার পঠিত   #  #  #  #  #  #




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

বিনোদন’র আরও খবর


ধর্ষণের মহোৎসব : রনজিত চাঙমা (১৯/৪/২০১৯ইং)
মার্কিন সাময়িকী টাইমের ১০০ প্রভাবশালীর তালিকায় মাহাথির, ইমরান ও জেসিন্ডা
আম্র-পালী আমের নামকরণের ইতিহাস -১১ ( বিম্বিসার ও আম্র-পালীর প্রেম –কাহিনী-৪):জালাল উদদীন মাহমুদ
ভারতের অমিত রায়ের সাথে প্রিমা
নির্বাচনী রোডশোতে অংশ নেয়ায় ভারতীয় ভিসা বাতিল ফেরদৌসের,ঢাকায় পৌঁছেছেন তিনি
আম্র-পালী আমের নামকরণের ইতিহাস -১০( বিম্বিসার ও আম্রপালীর প্রেম –কাহিনী-৩) :জালাল উদদীন মাহমুদ
নূসরাত, মাগো ক্ষমা করো -ইফতেখার আলম
জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী সুবীর নন্দী অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তি
যৌন হেনস্তা নিয়ে এই প্রথম মুখ খুললেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া
আজ চৈত্র সংক্রান্তি

আর্কাইভ