ফারহানা আকতার এর কলাম – “ নতুন প্রজণ্মের চোখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ – পর্ব- ২১”

Home Page » সাহিত্য » ফারহানা আকতার এর কলাম – “ নতুন প্রজণ্মের চোখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ – পর্ব- ২১”
সোমবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১



নতুন প্রজন্মের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি…………..”!
বাঙ্গালির ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এক রক্তরঞ্জিত ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দয়িে বাঙ্গালি জাতির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। মূলতঃ ‘বাঙালি-জাতীয়তাবাদ’ বিকাশে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন এর গুরুত্ব অপরিসীম ও সুদূরপ্রসারী। এ আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ আন্দোলনের সাথে মিশে আছে শহীদের রক্ত। এ আন্দোলন কেড়ে নিয়েছে বহু বাঙালির প্রাণ। আমাদরে বাঙালি-জাতীয়তাবাদ বিকাশের মূল ভিত্তি হচ্ছে -বাংলা ভাষা- আন্দোলন ৷ বাঙালি-জাতীয়তাবাদ বিকাশে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ভূমিকা নিম্নরূপ:
১)জাতীয় চেতনা সৃষ্টি:
জাতীয় চেতনা সৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও অবদান অপরিসীম। এ আন্দোলন বাঙালি জাতির ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায়। নিপীড়িত ও গর্বিত বাঙালি জাতির মনে রাজনৈতিক সচেতনতা তীব্র থেকে তীব্রতর করে।
২)দাবি আদায়:
বাঙালিদের দাবি আদায়ের একটি বিশেষ পদক্ষেপ হল এ আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বহু ত্যাগের বিনিময়ে জাতীয়তাবাদী দাবি আদায়ের শিক্ষা পায়। তারা ধীরে ধীরে দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। তারা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার কায়েমের সংগ্রাম চালিয়ে যাবার লক্ষে ̈ দৃঢ় সংকল্প পোষণ করে।
৩)একাত্বতা ঘোষণা:
একাত্বতা ঘোষণায় ভাষা আন্দোলনের ভূমকিা অনস্বীর্কায৷ এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী সমাজ জনগণের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে। ছাত্র,শিক্ষক,ব্যবসায়ী, কৃষক, জনতা, শ্রমিক ও বুদ্ধিজীবী তথা সকল শ্রনেী-পশোর মানুষ একই কাতারে শামিল হয়। ফলে সকলের মধ্যে জাতীয়তাবাদী বন্ধন সৃষ্টি হয়। আর এ একাত্বতাবোধ জাতীয়তাবাদ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪)শহীদ দিবসের মর্যাদা:
শহীদ দিবসের মর্যাদা ভাষা আন্দোলনের একটি সফল দিক। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি শহীদ দিবসের মর্যাদা উপলব্ধি করতে শিখেছে। এ উপলব্ধি বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।
৫)সাম্প্রদায়িকতা রোধ:
সাম্প্রদায়িকতা রোধকল্পে ভাষা আন্দোলনের অবদান কম নয়। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালিদের মনে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী মনোভাব গড়েওঠে। এ সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী মনোভাব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে আরও গতিশীল করে তোলে।
৬)পরবর্তী আন্দোলনের ডাক:
ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি পরবর্তী আন্দোলনের ডাক দেয়। এ আন্দোলন পরবর্তী আন্দোলনকে আরও জোরদার করে তোলে। ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের পথ ও এর অধকিার আদায়রে পথ আরও সুগম হয় !
আমরা জানি,
দীর্ঘ দু’শত বছর শাসনের পর এ উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ১৯৪৭ সালে কেবলমাত্র ধর্মীয় চেতনাকে পুঁজি করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর হতে পাকস্তিানরিা বাঙালি জাতিকে কখনও সুনজরে দেখে নি। তারা চেয়েছিল বাঙালি জাতিকে তাদের সকল প্রকার অধিকার হতে বঞ্চিত করে আজীবনের জন্য তাদের গোলাম বানিয়ে রাখতে কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জণগণের একতাবদ্ধ সংগ্রামের কারনে শেষ পর্যন্ত তারা সফল হতে পারেনি৷ পূর্ব পাকিস্তানের জণগণ তাদের রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্হানের কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট প্রায়ই তাদের নৈতিক দাবীগুলো বিভিন্ন দফা আকারে পেশ করতেন এবং এই দফাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দফা হচ্ছে-১৯৫৪ এর ২১ দফা ( আওয়ামী মুসলীম লীগ ও যুক্তফ্রন্টসহ পূর্ব পাকিস্হানের সকল রাজনৈতিক দলগুলো তখন এক হয়ে এই দাবীর প্রতি একাত্বতা ঘোষনা করেছিল), ১৯৬৬ এর ৬দফা (পূর্ব পাকিস্তানের অধিকংশ জণগণ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সম্মতিতে আওয়ামী মুসলীম লীগ অরফে আওয়ামী লীগের সভপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কর্তৃক উথ্থাপিত ) ও ১৯৬৯ এর ১১দফা (পূর্ব পাকিস্তানের অধিকংশ জণগণ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সম্মতিতে আওয়ামী মুসলীম লীগ অরফে আওয়ামী লীগের সভপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কর্তৃক উথ্থাপিত ) ইত্যাদি ৷আমরা ইতিমধ্যে উপরোক্ত সবগুলো দফা সম্পর্কে আমরা এই কলামের ১০,১১ ও ১২ পর্বের আলোচনা থেকে বিস্তারিত জেনে নিয়েছি ৷ সত্যিকার অর্থে, নতুন প্রজণ্মের চোখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমার এই দীর্ঘ ধারাবাহিক আলোচনায় বার বার উঠে এসেছে কিভাবে পশ্চিম পাকিস্হান (বর্তমান পাকিস্তান) কেন্দ্রীয় সরকারকে ব্যবহার করে শাসন-শোষন ও নির্যাতনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) কে অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তথা সবরকম অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল ৷ যার বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পূর্ব পাকিস্তানের সকল স্তরের ও সকল পেশার জণসাধারন ৷

উল্লেখিত কারনেই,১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর অর্থাৎ ১৯৫৩ সাল থেকে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ দিন প্রত্যুষে সর্বস্তরের মানুষ খালি পায়ে প্রভাতফেরীতে অংশগ্রহণ করে এবং শহীদ মিনারে গিয়ে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। সারাদিন ধরে হাজার হাজার মানুষ শোকের চিহ্নস্বরূপ কালো ব্যাজ ধারণ করে শোক রেলীতে অংশগ্রহন করে। এছাড়া আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি তর্পণ করা হয় এবং ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করা হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দিনটি কখনো জাতীয় শোক দিবস, কখনোবা জাতীয় শহীদ দিবস হিসাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হয়ে আসছে। ২০০১ সাল থেকে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে। বাংলাদেশে এদিনে সরকারি ছুটি। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়। দৈনিক সংবাদপত্রসমূহে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়। বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হয় পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে। বাংলাদেশ সরকার বাংলা ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একুশে পদক প্রদান করে।তাই আসুন, ভাষা-শহীদদের রক্তে রঞ্জিত ‘বাংলা- ভাষা আন্দোলন’ এর এই স্মরণীয় ফেব্রুয়ারী মাসে দাড়িয়ে বাঙালি জাতি হিসেবে ও স্বাধীন বাংলাদেশের সচেতন ও দেশপ্রেমী সুনাগরিক হিসেবে আমরা সকলে শপথ নেই যে,
“আমরা কখনও বিজাতীয় ভাষা বা সংস্কৃতিকে অন্ধের মতো অনুকরণ করে চলবো না এবং নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি সংস্কৃতি,ইতিহাস,ঐতিহ্যকে মনে-প্রানে ধারন করে চলবো এবং সর্বোপরি, বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে একটি আত্মনির্ভরশীল, সংস্কারমুক্ত, স্বশিক্ষিত, মেধাবী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে আমরা আমাদের জাতিসত্ত্বার সকল মূল অস্ত্রসমূহ (তথা-আমাদের কৃষ্টি,সংস্কৃতি,ইতিহাস,ঐতিহ্য,ভাষা ও অন্যান্য সকল জাতীয় অর্জনসমূহ ও একইসঙ্গে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি) কে কাজে লাগিয়ে নির্মান করবো আমাদের পাঠযবই, গল্পের বই, উপন্যাস,গল্প, কবিতা, গান,নাটক,বিজ্ঞাপন,চলচ্চিত্র-ইত্যকার সবকিছু ” ৷
যা কিনা একসময় আমাদের উপহার দেবে মায়া-মমতায় পরিপূর্ন পরিবার, দুর্নীতিমুক্ত –উন্নত মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ তথা একটি আদর্শ রাষ্ট্রের৷ (চলবে)৷

ফারহানা আকতার

তথ্যসূত্র : বুকস্,ইন্টারনেট ।
লেখক: ফারহানা আকতার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক, গবেষক এবং কলামিস্ট ৷

লেখকের অন্যান্য বই

বাংলাদেশ সময়: ১৩:২৮:৪৪   ৭৯৮ বার পঠিত   #  #  #  #  #




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

সাহিত্য’র আরও খবর


ড. গোলসান আরা বেগমের কবিতা “আমি তো গাঁয়ের মেয়ে ”
৫০ বছরের গৌরব নিয়ে জাবির বাংলা বিভাগ বিশাল ‘সুবর্ণ জয়ন্তী’ উৎসব আয়োজন করেছে
অধ্যক্ষ ড. গোলসান আরা বেগমের কবিতা- ‘তোমার খোঁজে ‘
অতুলপ্রসাদ সেন: ৩য় (শেষ ) পর্ব-স্বপন চক্রবর্তী
অতুলপ্রসাদ সেন;পর্ব ২-স্বপন চক্রবর্তী
অতুলপ্রসাদ সেন-স্বপন চক্রবর্তী
অধ্যক্ষ ড. গোলসান আরা বেগমের কবিতা ” যাবে দাদু ভাই ?”
বাদল দিনে- হাসান মিয়া
ইমাম শিকদারের কবিতা ‘ছোট্ট শিশু’
প্রাণ বায়ু - গুলশান আরা রুবী

আর্কাইভ

16. HOMEPAGE - Archive Bottom Advertisement