শনিবার ● ১০ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় নতুন দিগন্ত,শাহী বাঙ্গাল ইলিয়াস শাহ

Home Page » আলিফের চটি গল্প » বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় নতুন দিগন্ত,শাহী বাঙ্গাল ইলিয়াস শাহ
শনিবার ● ১০ জানুয়ারী ২০২৬


 বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় নতুন দিগন্ত,শাহী বাঙ্গাল ইলিয়াস শাহ

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে মধ্যযুগের অন্যতম অধ্যায় হলো ইলিয়াস শাহী বংশের উত্থান এবং তাদের প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সালতানাত। মধ্যযুগীয় বাংলার সুলতানদের মধ্যে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা বাংলার প্রথম স্বাধীন মুসলিম সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। তিনি শুধু ইলিয়াস শাহ বংশের প্রতিষ্ঠাতায় নয় মধ্যযুগের মুসলিম বাংলার ইতিহাসে প্রথম বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠাতা। এ কারণে তাকে জাতীয়তাবাদের জনক বলা হয়।

তিনি শুধু রাজনৈতিকভাবে বাংলাকে একত্রিত করেননি বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক কাঠামো, বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে বাংলাকে একটি শক্তিশালী স্বাধীন সালতানাতে রূপ দেন।
ইলিয়াস শাহের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো বাংলার তিনটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলকে একত্র করে প্রথমবারের মতো একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলা রাষ্ট্র গঠন করা।

ত্রয়দশ ও চতুর্দশ শতকের অস্থির রাজনীতি, দিল্লি সালতানাতের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতায় ধীরে ধীরে স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হয়।
ইলিয়াস শাহের জন্ম পূর্ব পারস্যের সিজিস্তানের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার পিতার নাম সুলতান। মোহাম্মদ বিন তুঘলক দিল্লির সুলতান থাকার সময় তার চাচাতো ভাই ফিরোজ সেখানে বেশ প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি ছিলেন। আর ফিরোজ শাহ এর একজন কর্মচারী ছিলেন আলী মোবারক। সেই কর্মচারী আলী মোবারকের একজন দুধ ভাই ছিলেন ইলিয়াস নামের একজন যুবক। আলী মোবারক তাকে ফিরোজের অধীনে একটা চাকরি দেন। গোলাম হোসেনের রিয়াজুস সালাদ্দিন থেকে জানা যায়, তিনি এ সময় একটা অপকর্ম ঘটায় ।

ফ্রান্সিস ভুকানোন এর মতে, ফিরোজ বিন রজবের কোন একজন উপপতœীর প্রেমে পড়ে যান। এই খবর জানার পর ফিরোজ মোবারককে আদেশ দেন তার ভাই ইলিয়াসকে আটক করার জন্য। এই কথা ইলিয়াসের কানে গেলে তিনি দিল্লি গোপনে ত্যাগ করেন। আলী মোবারক তাকে আটক করতে ব্যর্থ হন। তখন ফিরোজ বিন রজব আলী মোবারক কে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন।

এ সময় তিনি বাংলার লাখনৌতিতে চলে আসেন। লাখনৌতির শাসক কদরখান তাকে তার দরবারে চাকরি দেন এ সময়ে ইলিয়াস কোথায় ছিল সেরকম কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেকেই মনে করেন তার নামের সাথে যেহেতু হাজি শব্দটি ব্যবহার করেছেন সে সময় তিনি হয়তো মক্কাতে গিয়ে হজ পালন করেছেন। কয়েক বছর পর ইলিয়াস আলী মোবারক এর কাছে লাখনৌতিতে ফিরে আসেন। আলী মোবারক তাকে সাথে সাথে গ্রেফতার করেন। পরবর্তীতে ক্ষমা চাওয়ার পর ইলিয়াস কে পাশে থাকা সপ্তগ্রামে আজম অল মুলকে সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়া হয়। ইলিয়াস শুরু থেকে বুদ্ধিমান ও উচ্চাকাক্সক্ষী ছিল। এ কারণে তিনি ধীরে ধীরে উঁচু পদে চলে যান মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তিনি সপ্তগ্রামের সেনাপতিতে পরিণত হন।
১৩৩৮ সালে সুবর্ন গ্রাম থেকে ফখরুদ্দিনের বিদ্রোহের খবর জানা যায়।

আর লাখনৌতের প্রশাসক কদর খান তাকে আক্রমণ করতে গিয়ে নিহত হন। এরপর ফখরুদ্দিন লাখনৌতিতে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের একজন মানুষকে সেখানে প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন। কিন্তু আলী মোবারক এটা মেনে না নিয়ে তাকে হত্যা করেন। এর মধ্যে ফখরুদ্দিন বেশ কয়েকবার লাখনৌতি আক্রমণ করে দখল করে নিতে চায় আর সেই অবস্থায় লাখনৌতের দরবারের মানুষদের অনুরোধে সেখানকার প্রশাসক হন আলি মোবারক। তিনি ১৩৪১ সালে আলাউদ্দিন আলী শাহ নামে শাসন করা শুরু করেন। এর কয়েক বছর পরে সপ্তগ্রামের শাসক আজম অল মুলক এর মৃত্যুর পর তার প্রধান সেনাপতি হন ইলিয়াস। ইলিয়াস ফখরুদ্দিনের দেখানো পথ অনুসরণ করে সপ্তগ্রামের শাসন নিজের হাতে তুলে নেন। আর নিজেকে দিল্লির থেকে আলাদা স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সেই সাথে ইলিয়াস শাহ বংশের সূচনা করেন। আর তখন থেকে তিনি ইতিহাসে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

এরপর তিনি লাখনৌতির প্রশাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ১৩৪২ সালে কোন এক সময় ইলিয়াসের ইন্ধনে আলাউদ্দিন শাহ এর দেহরক্ষীরাই তাকে হত্যা করেন। আর এই বছরে ইলিয়াস শাহ একত্রে লাখনৌতি ও সপ্তগ্রামের শাসক হয়ে লাখনৌতির রাজধানী পান্ডুয়াকে নিজের রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর তিনি লাখনৌতির শাসন ব্যবস্থায় ও প্রশাসনে পরিবর্তন আনেন। এর আগে এ অঞ্চলের শাসকেরা তাদের সেনাবাহিনীতে শুধু মুসলিমদের নিয়োগ দিতেন। কিন্তু সুলতান ইলিয়াস শাহ সর্ব প্রথম যোগ্য হিন্দুদেরকেও নিয়োগ দেওয়া শুরু করে ন এ কারণে তার সেনাবাহিনী ও প্রশাসন খুবই দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এ সময়ে তার রাজ্যের পাইক সেনাদের সুনামের কথা অনেক জায়গা থেকে জানা যায়।

১৩৪৪ সালে তিনি উড়িষ্যার চিলকা রথ পর্যন্ত দখল করে নেন। এরপর তিনি ১৩৫০ সালে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে নেপাল আক্রমণ করেন। সুখময় মুখোপাধ্যায়ের মতে কাঠমুন্ডুতে অবস্থিত শম্ভু মন্দির আক্রমণ করেন। নেপাল পাহাড় পর্বতে ঘেরা অঞ্চল হওয়াতে ইলিয়াস শাহ আগেই ধারণা করেছিলেন তার পক্ষে নেপাল শাসন করা সম্ভব না এ কারণে তিনি এখান থেকে প্রচুর ধনসম্পদ লুট করে তার রাজধানীতে নিয়ে আসেন।
নেপাল আক্রমণের করার মাঝে সুবর্ণ গ্রামের শাসক ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানকার শাসক হন ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহ।

১৩৫১ সালে দিল্লির দিকে রওনা হন শুরুতে রাজা শক্তিসিংহ ও কামেশ্বর কে পরাজিত করে। ত্রিহুৎ দখল করেন ইলিয়াস।
দিল্লি লখনৌতের কৌশলগত কারণে ত্রিহুত ছিল গুরুত্বপূর্ণ এলাকা অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি গন্ডক নদীর তীরে হাজিপুর নামে এক শহরের নির্মাণ কাজে হাত দেন। ফিরোজ বিন রজব নতুন শাসক হিসেবে দিল্লির মসনদ সাজাতে ব্যস্ত থাকায় এদিকে নজর দিতে পারেননি।

বিহারের দিল্লির প্রশাসক ইব্রাহিম বাইয়ু ইলিয়াসকে থামাতে এসে নিহত হন। টর্নেডোর বেঁগে ছুটতে থাকে ইলিয়াস। স্বাধিকারপ্রমত্ত ইলিয়াস পশ্চিমে এগিয়ে উত্তর প্রদেশের চম্পারন, গোরখপুর, বেনারস পর্যন্ত জয় করলেন। বিহার অভিযান থেকে ফিরে তিনি ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে তিনি যখন পূর্ব বাংলার রাজধানী সোনারগাঁও আক্রমণ করে ফখরুদ্দিনের পুত্র ইখতিয়ার উদ্দিন কে পরাজিত করে সুবর্ণ গ্রামের সিংহাসন থেকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ফলের লখনৌতি পান্ডুয়া সপ্তগ্রাম সুবর্ণগ্রাম এসে পড়ল তার ক্ষমতার ছায়াতলে। এভাবে তিনি বাংলা তিনটা প্রদেশ সাতগাও, লখনৌতি ও সোনারগাঁও দখল করে স্বাধীন রাজ্য গঠন করেন। এ কারণে তার রাজ্যসীমা আসাম হতে বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। পরবর্তীতে ১৩৫৩ সালে বিহার আক্রমণ করেন ইলিয়াস শাহ। বিহারের পরেও তিনি তার কর্তৃত্ব চম্পারন গ্রহপুর এবং বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। শামস ই সিরাজ আফিফ তাকে শাহ ই বাঙ্গালা শাহ ই বাঙালিয়ান ভূষিত করেন। দিল্লির কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে নিজেকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করেন। সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক এর দমন করার জন্য বাংলার অভিমুখে অভিযান করেন। যদিও এই অভিজানে তিনি সফল হতে পারেন নি। বরং ইলিয়াস শাহের সাথে তুঘলক সন্ধি আপন করে তুঘলক দিল্লি ফিরে যান। পরে সুলতানি ইলিয়াস শাহ বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসেবে শাসন করতে থাকেন। সুলতান ইলিয়াস শাহ সকল গুণের অধিকারী ছিলেন। লখনৌতির শাসক হিসেবে বাংলা অধিকার করলেও তিনি বাংলা ভাষাভাষীদের সমন্বয়ে ১৩৫২ সালে গৌর ও বঙ্গ রাজ্য একত্রিত করে এই ভূখ-ের নাম রাখেন বাঙ্গালা।

তবে এই বাঙ্গালা ছিল বঙ্গ থেকে আলাদা। বঙ্গ ছিল এক জনপদের নাম যা গড়ে উঠেছিল বৃহত্তর ঢাকা ময়মনসিংহ ফরিদপুর যশোর কুষ্টিয়া এবং নদিয়া অঞ্চল নিয়ে। বঙ্গসহ হরিকেল সমতল রাঢ় তাম্রলিপ্ত চন্দ্রদিপ্ত গৌর নামক যেমন জনপদ ছিল এই বাংলার অংশ। পরবর্তীতে মুঘল শাসনামলে একে সুবা বাংলা ইংরেজিতে বেঙ্গল নামে নামকরণ করা হয়।
এই ভূখ-ে তিনিই প্রথম একই ভাষাভাষী মৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে বাঙালি নামে নামকরণ করেন। বাঙালি পরিচয় ঐক্যবদ্ধ করেন মূলত এর সময় থেকে বাংলার সকল অঞ্চলের অধিবাসীরা বাঙালি জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এবং বাংলার বাইরের দেশগুলো তাকে বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করেন। আর এ কারণেই তাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা হিসেবে অভিহিত করা হয়। এছাড়া প্রথম ফারসির পাশাপাশি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার কৃতিত্ব ইলিয়াস শাহের। তিনি বাঙালি জাতিকে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চার জন্য উৎসাহিত করেন। এভাবেই একজন মুসলিম শাসকের হাত ধরে বাঙালি জাতি এবং বাংলা ভাষা বিকশিত হওয়া শুরু করেন। এর আগে হিন্দুরা সংস্কৃত ভাষা চর্চা করতো এবং বাংলা ভাষাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্ল করত। এমনকি হিন্দু ব্রাহ্মণরা বলেছিল বাংলা ভাষার চর্চা করলে রৌরব নামক নরকে গমন করতে হবে।

মুসলিম, হিন্দু এবং বৌদ্ধ—সব সম্প্রদায়ই তাঁর শাসনে নিরাপদ ছিল। পারসিক সাহিত্য, আরবি শিক্ষা এবং বাংলা সংস্কৃতির সমন্বয়ে নতুন এক মধ্যযুগীয় বাঙালি মুসলিম পরিচয় গড়ে ওঠে।
শাহ্ ই বাঙ্গাল ইলিয়াস শাহ বাংলা ইতিহাসের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত বাংলাকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন এবং সমৃদ্ধ সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা শুধু স্বাধীনতাই অর্জন করেনি, বরং অর্থনীতি, সংস্কৃতি, কূটনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ইলিয়াস শাহের গড়ে দেওয়া সেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আজও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক আত্মপরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।

বাংলাদেশ সময়: ১৩:০২:৪৫ ● ৩৫ বার পঠিত