রবিবার ● ১১ জানুয়ারী ২০২৬

রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-১৬ স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-১৬ স্বপন চক্রবর্তী
রবিবার ● ১১ জানুয়ারী ২০২৬


স্বপন কুমার চক্রবর্তী
আমার দেখা বই মেলা-৩
পুর্বেই উল্লেখ করেছি যে, বই মেলাতে স্মরণীয় বরণীয় ব্যাক্তিগণ উপস্থিত হয়ে খাকেন। যাদের সাক্ষাৎ করা সহজসাধ্য নয়, তারাও এখানে উপস্থিত থাকেন। অটোগ্রাফ প্রেমি ছাত্রচাত্রীগণ অনেকেই তাঁদের অটোগ্রাফ সংগ্রহ করেন। অনেক সময় একটু ভিড়ও লেগে যায়। নাটকের অভিনেতাগণও বেশ জনপ্রিয় মানুষ। তাঁদেরকে এক নজর দেখার জন্য কৌতুহল থাকতো কিশোর-যুব বয়সের লোকদের। সেই সময়ে বিটিভির নাটক বেশ জনপ্রিয়তা পায়। একই ভাবে ঢাকাস্থ বেইলী রোডের মহিলা সমিতি ও গাইড হাউস ( গার্লস গাইড হাউস ) অডিটরিয়াম খুব ব্যস্ত থাকতো। টিকিটের বিনিময়ে সেখানে দর্শকগণ নাটক দেখতো। তাও প্রচন্ড ভিড় হতো। আর অডিটরিয়ামের বুকিং পাওয়া ছিল একটু দুঃসাধ্য ব্যাপার। প্রায় মাস খানেক আগে থেকে চেষ্টা করে তবেই পাওয়া যেতো অডিটরিয়াম। আমরাও এমন সমস্যা মোকাবিলা করেছি।
তখন নাটকের মান ছিল খুব উঁচু। ছিল বেশ জনপ্রিয়। বেশ কিছু নাট্যগোষ্ঠি ছিল সকলের প্রিয়। অনেক অভিনেতাও ছিলেন জনপ্রিয়। তন্মধ্যে নাগরিক নাট্যগোষ্ঠিী, ঢাকা থিয়েটার, থিয়েটার, ড্রমা সার্কেল, ঈঙ্গিত ইত্যাদি। আর অভিনেতা ছিলেন আব্দুল্লাহ আল মামুন-যিনি একাধারে ছিলেন অভিনেতা, নাট্যকার, স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং চলচ্চিত্র পরিচালক। তাছাড়া ছিলেন অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, ড. ইনামুল হক, লাকী ইনাম, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, মামুনুর রশিদ, আব্দুল কাদের, রাইসূল ইলাস আসাদ, খায়রুল আলম সবুজ, মোজাম্মেল হক, বুলবুল আহমেদ, ডলি জহুর, ত্রপা মজুমদার, লিয়াকত আলী লাকী, আলী জাকের, সারা জাকের, আসাদুজ্জামান নূর, সুবর্ণা মোস্তফা, স্ক্রিপ্ট রাইটার ও সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, হাসান ইমাম,লায়লা হাসান, মাসুদ আলী খান, আবুল হায়াত, আবুল খায়ের, তৌকির হোসেন ,বিপাশা হায়াত, আজিজুল হাকিম, জাহিদ হাসানসহ আরও অনেকে। বই মেলায় তাঁদের উপস্থিতি ছিল প্রায় নিয়মিত। থিয়েটার গ্রুপের প্রকাশনা নিয়ে একটি স্টল থাকতো। সেখানে থিয়েটার এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় সকলকেই পাওয়া যেতো। হতে পারে যে, রাজনৈতিক পছন্দ- অপছন্দের কারণে তারা কারও কাছে প্রিয় আবার কারও কাছে অপ্রিয় ভাজন হতে পারেন। তবে তখন ছিলেন সকলের কাছে প্রিয়। মোট কথা বই মেলা ছিল বিভিন্ন কারণে সকলের নিকট প্রিয় । ছিল একটা বিশেষ আকর্ষণ। মেলায় ঢুকলে বের হয়ে যাবার কথা আর মনে হতো না।
যা হোক, মেলার ঘটনা বহুল তথ্য সম্পর্কে আবারও বলি। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ক্রমান্বয়ে অন্যান্য উদ্যোক্তাগণ অনুপ্রাণিত হতে থাকেন। মেলার চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। জনপ্রয়িতাও বেড়েই চলে। তখন ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক ড. আশরাফ সিদ্দীকি বাংলা একাডেমিকে বই মেলার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে চিত্তরঞ্জন সাহার প্রতিষ্ঠিত “ বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা সমিতি” নামীয় প্রতিষ্ঠানটি মেলার সাথে যুক্ত হয়। ১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। তাঁর সময়েই “ অমর একুশে গ্রন্থমেলার” আয়োজন হয়। দুঃখজনক ভাবে তখন স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলতে থাকে। ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিল তখন চলতে থাকলে তার উপর ট্রাক তুলে দিয়ে দু;জন ছাত্রকে হত্যা করা হয়। সুরের আগুনে অসুরের অপকর্ম ছড়িয়ে যায় সবখানে। আন্দোলন খুব চাঙ্গা হয়ে যায়। এই সময়ে আন্দোলনে নেমে পড়ে সংস্কৃতি কর্মীগণও। তাদের আন্দোলন ছিল খুব ব্যতিক্রম ধর্মী। প্রতিবাদের ভাষা ছিল নান্দনিক ও একটু ভিন্ন। ফলে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়ে জোড়ালো হয়। তখন এরশাদ এটাকে মোকাবিলা করার জন্য অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনের চিন্তা করতে থাকে। উক্ত আইনটিকে হাল নাগাদ সংশোধন করে কি ভাবে প্রয়োগ করা যায় এমন একটা চিন্তা এরশাদ সরকারকে পেয়ে বসে। ফলে হিতে বিপরীত হয়ে যায়। উল্লেখ প্রয়োজন যে, এই অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনটি তৈরি হয়ে ছিল ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে।( এই আইন সম্পর্কে পরে না হয় কিছুটা আলোচনা করবো ) প্রতিদিন মিছিল মিটিং আার সঙ্গীত শিল্পীদের আগুন ঝড়া সব বিদ্রোহের গান এবং বিপ্লবী চেতা সমৃদ্ধ কবিতা পাঠ গুটা দেশকে উত্তপ্ত করে তুলে। এসময়েই নতুন ধারার নাটক পরিলক্ষিত হয়। মুক্ত মঞ্চ নাটক। পথ নাটকও বলা হতো। তখন সৃষ্ট হলো ”গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন” নামে একটি গ্রুপের। বলাবাহুল্য যে, আমরাও সুযোগ মতো কিছুটা জড়িয়ে পড়ি। কিছুটা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তাগিদে কিছুটা ব্যাংকার হিসেবে। ব্যাংকারদের তখন রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারি প্রতিষ্ঠানের বিরাষ্ট্রীয় করণ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে একটি আন্তঃ ব্যাংক ফেডারেশন গঠিত হয়। তারাও তখন আন্দোলনে শরীক হয়। এ আন্দোলনে কর্মকর্তা-কর্মচারী সকলে এসে সামিল হয়েছিলেন। প্রচ্ছন্ন সহযোগীতা করেছেন নির্বাহীগণ। এসময়ে আমার লেখা একটি নাটক বার কয়েক আমরা পথে পথে মঞ্চস্থ করি। নাম ছিল “ একুশের কবিতা”। সেটি এখন আর আমার হাতে নেই, হারিয়ে গেছে। স্বৈরাচার পতনের পরপর তার চাহিদাও আর থাকেনি। এ ধরনের নাটক আগেও হতো। ব্যঙ্গাত্মক নাটক। নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র সহ অনেকেই শাসকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রহসন রচনা করেছেন। যা হোক, এই ঘটনার প্রতিবাদে সেই বছর আর বই মেলা অনুষ্ঠিত হয়নি। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সাড়ম্বরে অমর একুশে গ্রন্থ মেলার সূচনা হয়। উল্লেখ্য যে, এরশাদের শাসনামলে দেলোয়ার হোসেন, তাজুল ইসলাম, দীপালী সাহা, রাওফুন বসূনীয়া, ডা: মিলন, নুর হোসেন সহ অনেকেই শহীদ হয়েছিলেন। ( চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ২০:৩৭:৫৩ ● ২৯১ বার পঠিত