শুক্রবার ● ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-১৮ স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-১৮ স্বপন চক্রবর্তী
শুক্রবার ● ১৬ জানুয়ারী ২০২৬


বঙ্গনিউজের ষ্টুডিওতে অধ্যাপক পবিত্র সরকারের সাথে লেখক
আমার দেখা বই মেলা-৫
২০০৪ সালের ঘটনা। বই মেলাতে যাই যথারীতি। তখন ষ্টলে বসা অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ। প্রথা বিরোধী লেখক খ্যাত তাঁর একটি বই ভালো বিক্রী চলছে। অটোগ্রাফ সহ সেই বইটি কিনে নিয়ে ছিলাম। তার আগেই অবশ্য বইটি একটি দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছিল। আমি সেই দৈনিক থেকেই পড়ে ফেলে ছিলাম। তবুও অটোগ্রাফের লোভে বইটি কিনতে হয়ে ছিল। তখন সাভারে থাকি। বাসায় এসেছি মাত্র। বিটিভিতে খবর চলছে। একটি মাত্র চ্যানেলই ছিল তখন। দেখতে পেলাম রক্তাক্ত লেখক। হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর দু’একজন সাথে। জঙ্গী আক্রমণের শিকার হন ড. হুমায়ুন আজাদ। আক্রমণকারীরা ওই এলাকায় বোমার বিষ্ফোরণও ঘটায়। মারাত্মকভাবে তিনি আহত হয়ে ছিলেন। তবে বেঁচে গিয়ে ছিলেন। কিন্তু সেই বছরই ১২ আগষ্ট গবেষণার কাজে জার্মানীর মিউনিখে গেলে সেখানে হোটেলে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যূর জন্য বই মেলায় আক্রমণকারী জেএমবির মতো চরম পন্থী একটি দলকে দায়ী করা হয়।

২০০৮ সালে ১ ফেব্রুয়ারী থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত বই মেলা চলেছিল। এতে ২৮৮ জন প্রকাশক অংশ গ্রহণ করে ছিলেন। সে বছর বেই মেলায় রেকর্ড সংখ্যক বই প্রকাশিত হয়ে ছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী বই মেলায় প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছিল ২৫৭৮ । বই বিক্রি হয়ে ছিল টাকার অংকে প্রায় ২০০ মিলিয়ন টাকা। অবস্থা দেখে তখন কর্তৃপক্ষ প্রবেশ মূল্য নির্ধারনের জন্য চিন্তা করে ছিল।
২০১০ সাল থেকে এই বই মেলায় মেলার প্রবর্তক চিত্তরঞ্জন সাহার নামে একটি স্বর্ণপদক প্রবর্তন করা হয়। পূর্ববর্তী বছরের প্রকাশিত বইগুলোর গুণগত মান বিচার করে সেরা বইয়ের জন্য প্রকাশককে এই পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। এই পুরস্কারটির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় “ চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার। সর্বাধিক গ্রন্থ ক্রয়ের জন্য দেওয়া হয় “ পলান পুরস্কার” । আর স্টল ও অঙ্গ সজ্জার জন্য দেওয়া হয় “ সরদার জয়েনউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার।
২০১১ সাল
বই মেলায় খ্যাতিমানদের আগমণ ঘটে। গুণী জনেরা নির্ধারিত মঞ্চে আলোচনায় অংশ গ্রহণ করে থাকেন। দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা থেকে জ্ঞানগর্ব আলোচনা শুনে ঋদ্ধ হওয়ার সুযোগ থাকে। ২০১১ সালে অনেকের সংগে আলোচনায় অংশ নিয়ে ছিলেন অধ্যাপক ড. পবিত্র সরকার। পবিত্র সরকার একজন বহু বিশ্রুত মানুষ। তাঁর জ্ঞানের পরিধি সম্পর্কে যতই লিখি না কেন, তবুও তিনি অনন্য। আমি এক্ষেত্রেও গুগল উইকিপিডিয়ার সহায়তা এবং ইতি পূর্বে যা জেনেছি তা থেকে কিছু লিখার চেষ্টা করছি।
অধ্যাপক পবিত্র সরকার জন্ম সুত্রে একান্তই আমাদের লোক বলে মনে হয়। তিনি প্রায়শই বাংলাদেশে পদার্পণ করেন। ঢাকার অদূরে সাভারস্থ বলিয়ার পুর নামক স্থানে তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মার্চ তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি একাধারে বাঙ্গালি ভাষাতত্ববিধ পন্ডিত সুসাহিত্যিক,নাট্যসমালোচক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক। বিভিন্ন বিষয়ে মননশীল প্রবন্ধ রচনার খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। শিশু সাহিত্য, রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী, ও নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবেও তিনি খ্যাতিমান। গদ্য রচনার জন্য ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম বঙ্গের বাংলা একাডেমি প্রদত্ত বিদ্যাসাগর পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়োও জাতীয় সংহতির জন্য ইন্দিরা গান্ধী অ্যাওয়ার্ড ফর ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন লাভ করেন। এছাড়াও ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে জাপানের তৃতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান “ দ্য অর্ডার অফ দ্য রাইজিং সান , গোল্ড এন্ড সিলভার রে রোজ ‘ শিরোপায় ভূষিত হন।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হবার পর অনেকের মতোই তিনিও কোলকাতায় চলে যান। কোলকাতাতেই তিনি লেখাপড়া করেন এবং উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মেধাবী ও কৃতি ছাত্র ছিলেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষাতেই তিনি সর্বোচ্চ স্থান লাভ করেন। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের পর তিনি কিছু দিন কোলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে অধ্যাপনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে অধ্যাপনা করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুলব্রাইট স্কলারশীপ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ভাষা বিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।
দেশে ফিরে এসে পুনরায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তারপর পদোন্নতি প্রাপ্ত হবার পর ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ হতে টানা সাত বৎসর রবীন্দ্র বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকেন। পরবর্তীতে তিনি ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট কাউন্সিল অফ হায়ার এডুকেশন তথা পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ শিক্ষা সংসদের সহ-সভাপতি হন। ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে এই বর্ণাঢ্য শিক্ষা জীবন থেকে তিনি অবসর গ্রহন করেন। এখনও তিনি দেশের বিভিন্ন সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর বাংলা ও ইংরেজিতে রয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ। তার মধ্যে দু;একটির নাম এখানে উল্লেখ করা যায়:

প্রবন্ধ সংকলন-
• ভাষা নিয়ে ভাবছেন তো –( ২০০০) সংবাদ, কোলকাতা
• লোকভাষা লোকসংস্কৃতি ( ২০০৪ ) চিরায়ত, কোলকাতা
• বাংলা ব্যাকরণ প্রসঙ্গ ( ২০০৬ ) দে’জ পাবলিশার্স, কোলকাতা ।
• গদ্যরীতি পদ্যরীতি ( ২০০৬ ) সাহিত্যলোক।
• নাট্যমঞ্চ নাট্যরূপ ( ২০০৮ ) দে’জ পাবলিশার্স কোরকাতা।
• নাটকের সন্ধানে ( ২০০৮ ) প্রতিভাস, কোলকাতা।
• শিক্ষা ও চেতনা ( ২০০৯ ) প্রগতিশীল প্রকাশক, কোলকাতা।
• শিক্ষা ও চেতনা ( ২০০৯ ) প্রগতিশীল প্রকাশক, কোলকাতা।
• ভাষা দেশ কাল - মিত্র ও ঘোষ ,কোলকাতা।
• ভাষাপ্রেম ভাষা বিরোধ - দে’জ পাবলিশার্স।
• ভাষা মনন: বাংলা মনীষা- পুনশ্চ ।
• হীরের আংটি- আজকাল পাবলিশার্স্
• কথাসূত্র- মিত্র ও ঘোষ কোলকাতা।

প্রকরণ তথা মনোগ্রাফ-
• লোকসংস্কৃতির নন্দন তত্ব ( ১৯৯৬ ) পশ্চিমবাংলা একাডেমি
• বাংলা লেখার সহজ পথ ( ২০০১ ) সৃষ্টি।
• বাংলা বলো- দে’জ পবলিশার্স, কোলকাতা।
• বাংলা বানান সংস্কার: সমস্যা ও সম্ভাবনা- দে’জ পাবলিশার্স ,কোলকাতা।
• ধর্ম, কুসংস্কার, শিক্ষা- ন্যাশনাল বুক এজেন্সি।
• শিক্ষায় সাম্প্রদায়িক আক্রমণ- ন্যাশনাল বুক এজেন্সি।
• ছন্দতত্ব ছন্দরূপক- চিরায়ত, কোলকাতা।
( চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ২০:২০:১৬ ● ৪৮ বার পঠিত