সোমবার ● ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
রাজস্ব আয় কমছে, বিনিয়োগ নেই: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা
Home Page » অর্থ ও বানিজ্য » রাজস্ব আয় কমছে, বিনিয়োগ নেই: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা
অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা চলছে। বিনিয়োগ নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও স্লথগতি। সরকার অনেকটা কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে চলছে। ফলে টান পড়েছে সরকারের কোষাগারে। কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় হচ্ছে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব ঘাটতি ছুঁয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এনবিআরের তথ্য-উপাত্ত বলছে, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। অথচ এ সময় রাজস্ব আয়ের তিনটি খাতে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ৪৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। এ খাতে ঘাটতি ২৩ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। আমদানি পর্যায়ে ঘাটতি হয়েছে ১২ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। ভ্যাট খাতে ঘাটতি হয়েছে ১০ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব আয়ের এমন চিত্র ভোগাবে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারকেও। আলোচ্য সময়ে আয়কর খাতের লক্ষ্য ছিল ৮৫ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা।
অথচ আদায়ের পাল্লায় যোগ হয়েছে মাত্র ৬১ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। কম্পানি শ্রেণির করদাতারা অগ্রিম আয়কর, উৎসর করসহ সারা বছরই বিভিন্ন ধরনের কর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেন। এ ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ের করদাতারাও আয়কর জমা দেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। আয়ের খাত সংকুচিত হওয়ায় বড় পতনের মুখে পড়েছে আয়কর খাত।
ব্যবসায়ীরা অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে খুব একটা এগিয়ে আসেননি। ফলে বিনিয়োগও আসেনি। এ ছাড়া সরকারি প্রকল্পও স্থবির। ফলে শিল্প ও প্রকল্পের কাঁচামাল আমদানি অনেকাংশে কমে যায়। এতে আমদানি খাতে শুল্ক পায় না সরকার। তাই ৬৫ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে মাত্র ৫২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা।
আমদানি, উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই পরিশোধ করতে হয় ভ্যাট। এই ভ্যাটের আদায়ই সবচেয়ে বেশি। আলোচ্য সময়ে ৭০ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা আদায় করেছে এনবিআর। অথচ এ সময় লক্ষ্য ছিল ৮০ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মানুষের আয় কমে যাওয়ার কারণে ভোগের পরিমাণ কমায় তার প্রভাব পড়েছে ভ্যাট খাতে।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বলছেন, সার্বিক অর্থনীতির গতিই মন্থর। এখানে প্রবৃদ্ধি কমবে, রাজস্ব কমবে এটাই স্বাভাবিক। একটি অস্থির সময়ের অর্থনীতি স্বাভাবিক সময়ের মতো উচ্চ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটবে—এটা ভাবা বোকামি। তাঁরা জানান, সামনেই নির্বাচন। ওই সময় পর্যন্ত সবাই অপেক্ষা করছে। রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সার্বিক ব্যবসা ও অর্থনীতিতে একটা গতি আসতে পারে। তখন রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ‘দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের টার্নওভার বাড়বে, রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। আয় না বাড়লে ট্যাক্স আসবে কিভাবে? দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে বিনিয়োগ হয় না। নতুন রাজনৈতিক সরকার এলে ব্যবসার ক্ষেত্রে করনীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সব বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় সে বিবেচনায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ হবে। পরিস্থিতি ভালো না হলে ব্যবসায়ী বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করবেন কেন?’
তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও তাতে স্বল্প মেয়াদে কোনো পরিবর্তন আসবে না উল্লেখ করে আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘নতুন সরকার এলেও কিছু করতে পারবে না। এখন আমরা শীতের ফল, শাক-সবজি খাচ্ছি। কিন্তু কলিফ্লাওয়ার (ফুলকপি), শালগমসহ এসবের বীজ বপন করা হয়েছিল প্রায় চার থেকে ছয় মাস আগে। উপদেষ্টারা এমন কোনো বীজ বপন করে যাননি। তাই আগামী সরকার রাতারাতি কোনো ম্যাজিক দেখাতে পারবে না।’
বিটিএমএ সভাপতি বলেন, ‘নতুন নতুন শিল্পায়ন করতে না পারলে কর্মসংস্থান, টার্নওভার ট্যাক্স আসবে না। পুরনো খাতগুলোর করপোরেট কর ও উপকরণের ওপর কর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কোনো পদ্ধতি নয়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৩১ হাজার কোটি টাকা আয় করে আশিক চৌধুরী গর্ব করে বলছেন। কিন্তু নিজের লোকের ওপর কর আরোপ করা হয়েছে। সিঙ্গাপুর শিপমেন্ট ও কার্গো হ্যান্ডেলের মাধ্যমে অন্যদের থেকে আয় করে। অন্যদিকে আমাদের সরকার নিজেদের থেকে আয় করছে। প্রতিটি জায়গায় ছিনতাই-রাহাজানি-লুটপাট হচ্ছে। কারণ কর্মসংস্থান নেই, মানুষ চলবে কিভাবে?’
তথ্য-উপাত্ত বলছে, মানুষের আয় বাড়ছে না। সরকারি হিসাবে বিদায়ি বছরের ডিসেম্বর মাসেও মূল্যস্ফীতি আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। নভেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশ ছিল, ডিসেম্বরে যা আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে। অর্থাৎ মাসিক ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। তথ্য-উপাত্ত দেখায় যে বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার বহাল রেখে মূল্যস্ফীতি কমানোর নীতির কাঙ্ক্ষিত ফল এখনো আসেনি।
ব্যবসা-অর্থনীতিতে মন্দা থাকলে কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন হয় না। ২০২৫ সালের সাময়িক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশের কম। এই হার আগের কয়েক বছরের ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের তুলনায় বেশ কম। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এটি বড়জোর ৪.৮ শতাংশ হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিস্থিতি বদলের কথা বলেছেন এনবিআরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব। অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিলে রাজস্ব আদায়ে তার একটা প্রভাব পড়ে। ব্যবসায় মন্দা থাকায় কোথাও কর আদায়ের জন্য জোরালো পদক্ষেপও নেওয়া যাচ্ছে না। একটি প্রতিষ্ঠান যদি বেঁচে থাকে তাহলে রাজস্ব আদায় হবে। আর এখন চাপাচাপি করে যদি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়, তাহলে রাজস্ব আদায়ের একটি দরজাই বন্ধ হয়ে যাবে। সামনে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতির একটা উন্নতি দেখা যেতে পারে।’
বাংলাদেশ সময়: ১১:৪৩:৩৪ ● ২০ বার পঠিত