বুধবার ● ২১ জানুয়ারী ২০২৬
নতুন বাংলাদেশ’ গড়তে ৩১ টি নীতিসংবলিত রূপরেখা ঘোষণা জামায়াতের
Home Page » জাতীয় » নতুন বাংলাদেশ’ গড়তে ৩১ টি নীতিসংবলিত রূপরেখা ঘোষণা জামায়াতেরনতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়ার স্লোগানে ৩১টি নীতিসংবলিত রূপরেখা ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে দিনব্যাপী পলিসির সামিটে তা প্রকাশ করা হয়। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, নির্বাচনে জয়ী হলে এই রূপরেখায় সরকার চলবে। নির্বাচনী ইশতেহার পৃথকভাবে ঘোষণা হবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে।
সুশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ ছয়টি ভাগে এই ৩১ দফা নীতি ঘোষণা করেছে জামায়াত। পৃথক সেমিনারে এসব বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী ও শিক্ষাবিদরা।
পলিসি সামিটের উদ্বোধন অধিবেশনে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক মর্যাদাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখা হবে। দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ টিকে থাকা নয়, বরং স্থিতিশীলতা। জামায়াতের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি বিভাজনের নয়; আশা, শান্তি এবং ঐক্যের হবে।
কী রয়েছে রূপরেখায়
রূপরেখার প্রথমে রয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। ট্যাক্স ধাপে ধাপে কমিয়ে ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশ নির্ধারণ। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু; যাতে এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা একই সঙ্গে থাকবে। তিন বছরে শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়ানো হবে না। বন্ধ কলকারখানা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে চালু করা, সেখানে শ্রমিকদের ১০ শতাংশ মালিকানা থাকবে। লাইসেন্স ব্যবস্থা সহজ করা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা থাকবে।
শিক্ষা-সংক্রান্ত ছয়টি নীতিতে বলা হয়েছে, স্নাতক শেষে পাঁচ লাখ ডিগ্রিধারীকে মাসে দুই বছর সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে। মেধার ভিত্তিতে এক লাখ শিক্ষার্থীকে মাসে ১০ হাজার টাকা করে শিক্ষাঋণ দেওয়া হবে। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার জন্য প্রতিবছর ১০০ শিক্ষার্থী সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ পাবেন।
স্বাস্থ্যসেবার নীতিতে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। ৬৪ জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল করা হবে। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও সন্তানের প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
কর্মসংস্থান ও তারুণ্যের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ এবং প্রতিটি জেলায় ‘জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে পাঁচ বছরে ৫০ লাখ চাকরি নিশ্চিত করা হবে। নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে পাঁচ লাখ উদ্যোক্তা, ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রূপরেখায় ভিশন-২০৪০ ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত। ২০৩০ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিতে ২০ লাখ চাকরি তৈরি, ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন, আইসিটিতে রপ্তানি পাঁচ বিলিয়নে উন্নীতকরণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে রূপরেখায়।
দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে আগামী সাত বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় তিন গুণ করা এবং বাংলাদেশি পেশাজীবী, গবেষক, শিক্ষকদের দেশে আনতে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ নীতি প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত।
নারীকে ছাড়া টেকসই সমৃদ্ধি সম্ভব নয়
জামায়াত আমিরের বক্তব্যে জোর ছিল নারীর কর্মসংস্থানে। তিনি বলেছেন, নারীরা এখনও কাঠামোগত বাধায় রয়েছে। কর্মে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজন। জনসংখ্যার অর্ধেককে পূর্ণাঙ্গ অন্তর্ভুক্ত না করে টেকসই সমৃদ্ধি সম্ভব নয়।
নারীদের বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ আখ্যা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেছেন, ৩৭ শতাংশ নারী আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যুক্ত, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম উচ্চহার। এই হার দ্রুত বৃদ্ধি করতে চাই। উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত নারীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
শফিকুর রহমান জানান, জামায়াতের ৪৩ শতাংশ সদস্য নারী। তিনি বলেছেন, তাই জামায়াত গর্বিত। জামায়াত এমন সুযোগ সৃষ্টিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে কোনো মেয়ে পিছিয়ে না থাকে। নতুন বাংলাদেশে সমান নাগরিক হিসেবে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশ করতে পারে।
শফিকুর রহমান বলেন, শুধু প্রবৃদ্ধি নয়; অর্থনৈতিক সাফল্য এমন হওয়া উচিত, যাতে মানুষ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনের পরিকল্পনা করতে পারে, মর্যাদার সঙ্গে পরিবার পরিচালনা করতে পারে এবং সমাজে অর্থবহভাবে অংশ নিতে পারে।
শফিকুর রহমান বলেন, লাখো প্রবাসী শ্রমিক তাদের শ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দিচ্ছেন। তারা দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে আরও বড় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।
বাজার অর্থনীতি চায় জামায়াত
জামায়াত আমির জানান, তাঁর দল চায় বাংলাদেশে আধুনিক বাজার অর্থনীতি গড়ে উঠুক, যা সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী এবং যেখানে কোনো নাগরিক পিছিয়ে থাকবে না। তিনি বলেছেন, বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠন করতে চাই। জামায়াত বিশ্বাস করে, গণতন্ত্র এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশ এগিয়ে যেতে পারে।
শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ। অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে এখানে বাণিজ্য ও পারস্পরিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ অফুরন্ত। তরুণ সমাজই হবে আমাদের প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির ইঞ্জিন।
কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেছেন, এমন প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নেব, যা কৃষকদের ক্ষমতায়িত করে। তিনি বলেছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য দরজা খুলে দেবে জামায়াত।
জামায়াতকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রক্ষক দাবি করে শফিকুর রহমান বলেছেন, সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করা বাধ্যতামূলক এবং পবিত্র কর্তব্য। জামায়াতের সঙ্গে পাঁচ লাখের বেশি অমুসলিম সদস্য ঐকবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছেন।
পলিসি সামিটে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিক, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সংগ্রাম সম্পদ আবুল আসাদ, নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, দ্য নিউ নেশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তানসহ ৩০ দেশের কূটনীতিকরা। জাতিসংঘ, ইউএনডিপি, আইআরআইসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ জ্যেষ্ঠ নেতারাও ছিলেন সামিটে।
বাংলাদেশ সময়: ১০:১৭:৪৩ ● ২৪ বার পঠিত