শনিবার ● ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

প্রথমবার একসঙ্গে বসল রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র

Home Page » বিশ্ব » প্রথমবার একসঙ্গে বসল রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র
শনিবার ● ২৪ জানুয়ারী ২০২৬


 প্রথমবার একসঙ্গে বসল রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র

ইউক্রেনে ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণ আগ্রাসনের পর প্রথমবারের মতো ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসলো ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। আবুধাবিতে এই বৈঠকটি হয়েছে। যদিও বৈঠকের ধরণ পরিবর্তিত হলেও তাদের মধ্যকার মতপার্থক্যের মূল জায়গাগুলোতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখানে প্রত্যাশা সীমিত বলেই মনে করা হচ্ছে। খবর-বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন শান্তি চুক্তি নিয়ে চাপ দিচ্ছেন। চলতি সপ্তাহে তিনি বলেছেন একমত না হতে পারলে দুই পক্ষ হবে ‘স্টুপিড’। তবে তার দূতদের জোরালে কূটনীতি সত্ত্বেও, কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অমীমাংসিত রেখেই ইউক্রেন ও রাশিয়াকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে আয়োজন করা হচ্ছে। ইউক্রেন এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে কারণ তারা সবচেয়ে বেশি শান্তি চাইছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে রাখার প্রয়োজন তাদের।

গত বছর তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলছেন যে দাভোসে মি. ট্রাম্পের সাথে তার আলোচনা ছিল ‘সত্যিকার অর্থেই ইতিবাচক’। এর ফল হিসেবে তিনি রাশিয়ার ক্রমাগত হামলার বিরুদ্ধে আরও আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা পাবার আশা করছেন। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাতে হওয়া আলোচনার ফলাফল নিয়ে তিনি বেশ সতর্ক।

তিনি বৈঠকটিকে একটি ‘পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে একে ইতিবাচক হিসেবে আখ্যায়িত করেননি। ‘আমাদের আশা করতে হবে যে এটি আমাদের শান্তির কাছে নিয়ে যাবে,’ বলেছেন তিনি।

জেলেনস্কি কিছুদিন ধরেই বলে আসছেন যে শান্তির জন্য একটি চুক্তির দিকে তারা ৯০ ভাগ এগিয়ে গেছেন। তবে শেষ ১০ শতাংশই কঠিন কারণ রাশিয়া পুরো প্রস্তাবটিই প্রত্যাখ্যান করতে পারে। ‘এটি আমাদের পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে। এটা ভূখণ্ডের বিষয়। এটির এখনো মীমাংসা হয়নি,’ বলেছেন তিনি।

রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের দনবাস অঞ্চলের একটি বড় অংশ তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য বলে আসছে। তবে ইউক্রেন তা প্রত্যাখ্যান করেছে। রাজনীতিকরা প্রায়শই ‘রেড লাইন’ এর কথা বলে থাকেন। কিন্তু দনবাসের সেই রেড লাইন টানা হয়েছে ইউক্রেনের সৈন্যদের রক্তের বিনিময়ে। জেলেনস্কি চাইলেই সেই সীমাটি অতিক্রম করতে পারেন না।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল রাশিয়া যদি ইউক্রেনে আবারো সামরিক হামলা চালায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে কী করবে। ইউক্রেন বলছে এই ‘নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ তাদের দরকার। জেলেনস্কি বলছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে চুক্তি হয়ে গেছে। যদিও এর বিস্তারিত আমাদের জানা নেই। এক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া কী হবে তাও একটি বড় প্রশ্ন।

আবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া কোনো নিশ্চয়তা আসলে কতটা নির্ভরযোগ্য তা নিয়েও বড় ধরনের সন্দেহ আছে: গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ নিয়ে তার অবস্থান নেটোকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে। তিনি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল নীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। অথচ এই নীতিই ইউক্রেনে পশ্চিমা সহায়তার ভিত্তি। সুতরাং কিয়েভ কী ভবিষ্যৎ সংকটে তার কাছে থেকে সহায়তা আশা করতে পারে। তবে আপাতত, ইউক্রেনের হাতে কোনো বিকল্প নেই।

আর ভ্লাদিমির পুতিনকে বিশ্বাস করার বিষয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই যে তার লক্ষ্য এখন বদলে গেছে। ‘তিনি আসলেই এটি চাইছেন না,’ দাভোসে জেলেনস্কি বলেছেন শান্তি ও পুতিনের বিষয়ে।

ক্রেমলিন বলছে, তারা যা চাইছে সেটি আলোচনার টেবিলে না এলে যুদ্ধক্ষেত্রেই নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করবে। যদিও বিপুল সংখ্যক সৈন্য হারিয়েও তারা সেখানে সফলতা অর্জন করতে পারেনি এখনো। সে কারণে তারা আবারো দেশজুড়ে বেসামরিক অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যা আগের চেয়ে বেশি পরিকল্পিত ও ধ্বংসাত্মক। ওদিকে তীব্র শীতে মানুষজন কাঁপছে এখন।

কিয়েভের মেয়র আবারো বলেছেন যে যাদের যাবার মতো জায়গা আছে তারা যেন শহর ছাড়েন। ‘শত্রুপক্ষ সম্ভবত শহর ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা অব্যাহত রাখবে,’ ভিটালি ক্লিটসকো বলেছেন। বারংবার হামলার কারণে শহরের পুরো ব্যবস্থাপনা নাজুক হয়ে গেছে। আমি শহরবাসীকে সততার সাথে বলছি, পরিস্থিতি খুবই কঠিন এবং হয়তো সবচেয়ে কঠিন সময় এখনো আসেনি’ বলেছেন তিনি।

আলোচনায় নতুন মুখ
গত বৃহস্পতিবার রাতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তিন মার্কিন দূতের মধ্যে বৈঠকের পর মস্কো সতর্ক করে বলেছে, ভূমি-সংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধান না হলে টেকসই শান্তি সম্ভব হবে না। ক্রেমলিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ সাংবাদিকদের জানান, মধ্যরাতের কিছুক্ষণ আগে শুরু হওয়া আলোচনা স্থায়ী হয় প্রায় চার ঘণ্টা। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ কর্মকর্তারা ‘গঠনমূলক ও অত্যন্ত স্পষ্ট’ আলোচনা করেছেন। আলোচনায় পুতিন ছাড়াও উশাকভ ও দিমিত্রিভ রাশিয়ার পক্ষ থেকে অংশ নেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ছিলেন। গত ডিসেম্বরের শুরুতে ক্রেমলিনে পুতিনের সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাৎ করেন কুশনার। তাদের সঙ্গে এবার নতুন মুখ হিসেবে ছিলেন জশ গ্রুয়েনবাউম। তিনি ট্রাম্পের নবগঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। কথিত ওই শান্তি পর্ষদ গাজা পুনর্গঠনের জন্য তৈরি করা হলেও এখন তা বিশ্বব্যাপী নানা সংঘাত মোকাবিলার চেষ্টা করছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপে সবচেয়ে ব্যাপক সংঘাতের অবসান ঘটাতে ট্রাম্পের প্রচেষ্টার সর্বশেষ পর্যায় ছিল এ আলোচনা। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে এ রুশ আগ্রাসন পঞ্চম বর্ষে পা দেবে। গত বুধবার ট্রাম্প বলেন, পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যদি একসঙ্গে এসে একটি চুক্তি করতে ব্যর্থ হন, তবে তারা ‘বোকা’র মতো কাজ করবেন। বিবিসি জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে আশাবাদী জেলেনস্কিও। তিনি বলেন, এটা যুদ্ধ বন্ধের দিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

মস্কোতে পুতিনের সঙ্গে সর্বশেষ আলোচনার আগে উইটকফ জানিয়েছিলেন, বেশ কয়েক মাসের আলোচনায় ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে চুক্তির মতানৈক্য অনেক কমে মাত্র একটি ইস্যুতে নেমে এসেছে। তবে ইস্যুটি কী, তা তিনি ব্যাখ্যা করেননি। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হলো– পুতিনের দাবি, ইউক্রেন যেন মস্কোর দখলে থাকা দোনেৎস্কের পূর্বাঞ্চলের ২০ শতাংশ এলাকা তাদের হাতে ছেড়ে দেয়। জেলেনস্কি তা ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

বার্তা সংস্থা তাস জানায়, গতকাল শুক্রবার ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, দোনবাসের দাবি ছাড়বে না রাশিয়া। ইউক্রেনকে অঞ্চলটি ছেড়ে যেতে হবে।

রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগদানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করুক এবং শান্তিচুক্তির পর ইউক্রেনের মাটিতে ন্যাটো সেনার উপস্থিতি প্রত্যাখ্যান করুক। গত বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের পর জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার শর্তাবলি চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু ভূখণ্ডের সমস্যাটি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ সময়: ১২:৪১:৫৯ ● ৭ বার পঠিত