শনিবার ● ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ডিজিটাল দিগন্তে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ

Home Page » জাতীয় » ডিজিটাল দিগন্তে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ
শনিবার ● ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


 ডিজিটাল দিগন্তে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ

ব্রিটিশ আমলের লণ্ঠন আর ধাবমান রানারের স্মৃতি পেছনে ফেলে একবিংশ শতাব্দীর ‘স্মার্ট’ ডিজিটাল দিগন্তে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। দীর্ঘ ১২৭ বছরের ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামো ভেঙে ‘ডাকসেবা অধ্যাদেশ, ২০২৬’ অনুমোদনের মধ্য দিয়ে দেশের লজিস্টিকস ও যোগাযোগ খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।

এখন ডাক বিভাগ কেবল চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। আধুনিক ঠিকানা ব্যবস্থাপনা, ই-কমার্সের নিরাপদ লেনদেন এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিযুক্ত আর্থিক সেবার সমন্বয়ে এটি রূপ নিচ্ছে একটি শক্তিশালী ‘ন্যাশনাল ইনফ্রা-নেটওয়ার্ক’ বা জাতীয় অবকাঠামোতে। ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন ডাকসেবাকে দিচ্ছে নতুন প্রাণ, যা আগামীর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠছে।

১৮৯৮ সালের ‘পোস্ট অফিস অ্যাক্ট’ বাতিল করে সম্পূর্ণ আধুনিক ও সময়োপযোগী ‘ডাকসেবা অধ্যাদেশ, ২০২৬’ গত বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। ডিজিটাল রূপান্তর, ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা- এই চারটি বিষয়কে নতুন আইনের মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

কুরিয়ার ও ই-কমার্সে আসছে শৃঙ্খলা

নতুন অধ্যাদেশের আওতায় গঠন করা হচ্ছে একটি শক্তিশালী লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ। এখন থেকে অনুমতি ছাড়া কেউ পার্সেল বা কুরিয়ার ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে না। অবৈধভাবে ব্যবসা চালালে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রশাসনিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

ই-কমার্স গ্রাহকদের প্রতারণা থেকে সুরক্ষায় চালু হচ্ছে ‘সেন্ট্রাল লজিস্টিকস ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম’ (সিএলটিপি)। এই প্ল্যাটফর্ম পেমেন্ট গেটওয়ে ও এসক্রো মেকানিজমের মাধ্যমে অনলাইন কেনাকাটাকে আরও নিরাপদ করবে।

নদী ভাঙলেও হারাবে না পরিচয়

আইনটির অন্যতম ব্যতিক্রমী দিক হলো আধুনিক ঠিকানা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা। বাড়ি নম্বরের পাশাপাশি এরিয়া কোড ও স্ট্রিট কোডভিত্তিক জিও-ফেন্সিং চালু করা হবে। নদীভাঙন বা জলবায়ু পরিবর্তনে কোনো এলাকা বিলীন হয়ে গেলেও ডিজিটাল আর্কাইভে সেই এলাকার তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ তাদের ভৌগোলিক পরিচয় পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবেন। ভাসমান মানুষ ও বস্তিবাসীদের জন্য থাকবে কালেক্টিভ ঠিকানা ও পোস্ট বক্স সুবিধা।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে নিয়োজিত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘বাংলাদেশ ডাকের এই ডিজিটাল রূপান্তর শুধু একটি সরকারি দপ্তরের আধুনিকায়ন নয়। এটি দেশের জাতীয় নেটওয়ার্ককে একটি শক্তিশালী ‘ন্যাশনাল ইনফ্রা-নেটওয়ার্ক’-এ রূপ দেওয়ারও বৈপ্লবিক উদ্যোগ। ২০২৬ সালের অধ্যাদেশ কার্যকর হলে ডাক বিভাগ দেশের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম মেরুদণ্ড হয়ে উঠবে।’

আর্থিক খাতে বাড়ছে আস্থা

ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক ও ডাক জীবন বীমাকে নতুন আইনে ‘অধিকারী ডাকসেবা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এখানে রাখা সাধারণ মানুষের প্রতিটি টাকা সরাসরি রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির আওতায় থাকবে। সরকারি বিনিয়োগ থেকে আসা লভ্যাংশ গ্রাহকদের আর্থিক নিরাপত্তা আরও জোরদার করবে।

লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ ও নীতি বিশ্লেষক ড. মনিরুজ্জামান আহমেদ বলেন, ‘১৮৯৮ সালের আইনে ই-কমার্স বা ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের কোনো ধারণাই ছিল না। নতুন এই অধ্যাদেশ বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবে। বিশেষ করে ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের মানদণ্ড অনুযায়ী কুরিয়ার ও ই-কমার্সকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা সময়োপযোগী পদক্ষেপ।’

ই-কমার্স উদ্যোক্তা কামরুন নাহার বলেন, ‘এতদিন কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর ওপর আমাদের কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পার্সেল হারালে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিকার পাওয়া কঠিন ছিল। এখন কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ও এসক্রো ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি পাওয়ায় উদ্যোক্তা ও গ্রাহক-দুই পক্ষেরই আস্থা বাড়বে।’

একজন সাধারণ গ্রাহক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. আব্দুল হাই জানান, ‘পোস্ট অফিসে সঞ্চয় মানেই ছিল কাগজপত্রের ঝামেলা। এখন ডিজিটাল স্টাম্পিং ও অনলাইন পেমেন্টের কথা শুনে ভালো লাগছে। আর সরকার যখন সরাসরি আমার আমানতের গ্যারান্টি দিচ্ছে, তখন ডাকঘরই বেশি ভরসার জায়গা।’

ডিজিটাল ও নিরাপদ আগামীর ডাক

নতুন আইনে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এনক্রিপশন প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য সুরক্ষা এবং অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুছে ফেলা অপারেটরদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ডাক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক অগ্রিম তথ্য (ইএডি) প্রদান বাধ্যতামূলক হওয়ায় বিদেশের সঙ্গে পণ্য আদান-প্রদান আরও দ্রুত ও নিরাপদ হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৬:২৯:৫০ ● ১৯ বার পঠিত