শুক্রবার ● ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন

Home Page » জাতীয় » তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন
শুক্রবার ● ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


 তারেক রহমান

দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বৃহস্পতিবার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক পার করল বাংলাদেশ। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট; নারী ও তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতি গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পক্ষে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত রচনা করেছে। দলগুলোর প্রাপ্ত ফলাফল বলছে, স্থিতিশীলতা ও নতুন রাজনৈতিক পরিবেশের আকাঙ্ক্ষা এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা পর্যন্ত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক ফল অনুযায়ী ২৯৯ আসনের মধ্যে বিএনপি ১৮০টিতে জয়ী হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ৫৪, এনসিপি ২, গণঅধিকার ১, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে জয়লাভ করেছে। এ ছাড়া ৭টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। সরকারি সংস্থাগুলোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বিএনপি ২০২, জামায়াত ৬৪, এনসিপি ৫, গণঅধিকার ২, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১ এবং ১২টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ের পথে রয়েছেন। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তাদের দল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনে আত্মবিশ্বাসী। ৩০০ আসনের বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে এককভাবে সরকার গঠন করতে ১৫১ আসন প্রয়োজন। পাশাপাশি দুই শতাধিক আসন পাওয়া দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সংসদে সংবিধান পরিবর্তনসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যদিও এবারের সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে’ গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এতে ‘হ্যাঁ’ ভোট বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে এক কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে রূপান্তরের প্রস্তাব রয়েছে জুলাই সনদে। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে এবারই প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি নিজেও এবার প্রথম প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছেন। নির্বাচনের মাসখানেক আগে মায়ের মৃত্যুর পর দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে অভিষিক্ত হয়ে তাঁর নেতৃত্বেই দলের নির্বাচনী প্রচার ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগেই জানিয়েছেন, নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তারেক রহমানই হবেন প্রধানমন্ত্রী। ভোটের ফলের এই প্রবণতাকে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, ভোটার মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন এবং সংগঠনগত সক্ষমতার সমন্বিত ফল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এই নির্বাচনে মূল যে চিত্র উঠে এসেছে তা হলো একমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এর কারণ ক্ষমতার শূন্যতা। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোট ছিল কার্যত একমুখী। দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত থাকায় বিরোধী ভোট একত্রিত হয়েছে এবং বিএনপি এর বড় সুবিধা পেয়েছে। আবার জামায়াত ইতিহাসের সর্বোচ্চ ভোট ও আসন পেতে যাচ্ছে। ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে জামায়াতের এমন ফল বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক তরুণ ভোটার অংশ নেওয়ায় তা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। তরুণরা দলীয় ঐতিহ্যের চেয়ে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নীতিগত প্রতিশ্রুতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি নারীর উপস্থিতিও ছিল বরাবরের মতো ভালো, যা মোট ভোটারের ৪৯ শতাংশ। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটাররা আওয়ামী লীগহীন এই নির্বাচনে কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। সারাদেশে সংখ্যালঘু ভোটার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক ক্ষেত্রে তারা সম্ভাব্য জয়ী প্রার্থী বা স্থানীয়ভাবে নিরাপদ মনে হওয়া প্রার্থীর দিকে ঝুঁকেছেন, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। এর বাইরে বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন পর ভোটের মাঠে সংগঠিতভাবে সক্রিয় ছিল। জামায়াত আওয়ামী লীগহীন ভোটের মাঠকে তার জন্য ঐতিহাসিক করে তুলতে দলের তৃণমূলকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, সংসদ এবং গণভোটে ৬১ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। চূড়ান্ত হিসাবের পর এই সংখ্যা বাড়তে পারে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোটার উপস্থিতি কম হওয়া এবং সহিংসতার শঙ্কা ছিল। বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ছাড়াও কেন্দ্র দখলের চেষ্টা, জাল ভোটসহ নানা অনিয়মও হয়েছে কিছু স্থানে। তবে বিএনপি, জামায়াতসহ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ জানিয়ে ফলাফল মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমান অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের বিরুদ্ধে। এগিয়ে রয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা-১৫ আসনে এগিয়ে রয়েছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রাথমিক ফলাফলে হেরে গেছেন খুলনা-৫ আসনে। ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে বিএনপির প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছিল। সদস্য সচিব আখতার হোসেন কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে এগিয়ে রয়েছেন রংপুর-৪ আসনে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৫৫ শতাংশ ভোট পড়ে। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে যথাক্রমে ভোট পড়ে ৭৫ ও ৭৬ শতাংশ। ২০০৮ সালে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৭ শতাংশ। পরের তিনটি নির্বাচনে ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি দেখালেও যা নিয়ে সন্দেহ ছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে কম একজনের প্রাণহানি হয়। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের দিনে আটজন নিহত হন। অন্য নির্বাচনের দিনেও ১০ থেকে ২০ জন নিহত হয়েছিলেন। এবারই প্রথম কারও প্রাণহানি হয়নি সংঘাত-সহিংসতায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচনে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছিল। দেড় বছরে নানা ধাপ পেরিয়ে গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হয় বহুল কাঙ্ক্ষিত সংসদ নির্বাচন। একসঙ্গে চলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট। সাদা ব্যালটে সংসদ নির্বাচন এবং গোলাপি ব্যালটে গণভোট দেন ভোটাররা।

বাংলাদেশ সময়: ২৩:৪২:১৮ ● ২১ বার পঠিত