‘এবার দেশ গড়ার পালা ‘-তারেক রহমান

Home Page » জাতীয় » ‘এবার দেশ গড়ার পালা ‘-তারেক রহমান
রবিবার ● ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


 “এবার দেশ গড়ার পালা “-তারেক রহমান

নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর সরকার গঠনের অপেক্ষায় থাকা রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, এবার দেশ গড়ার পালা। দেশ গঠনে যেকোনো মূল্যে আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং কোনো ধরনের সহিংসতা, প্রতিশোধ বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি গতকাল শনিবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এই মন্তব্য করেন।

সূচনা বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে দলের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন। নিজের বক্তব্যের শেষে তারেক রহমান উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
তারেক রহমান দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন দুর্বলতা।

’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে সবাই সবার যোগ্যতা এবং মেধার ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। কোনো বিশেষ মহলকে সুযোগ দেওয়া হবে না। নির্বাচন-পরবর্তী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার প্রত্যয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।’
দলের নেতাকর্মীদের শান্ত ও সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে কোথাও কোথাও ভুল-বোঝাবুঝি বা উত্তেজনা তৈরি হয়ে থাকতে পারে, তবে তা যেন কোনোভাবেই প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়।

আমার বক্তব্য স্পষ্ট, যেকোনো মূল্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা ভিন্নমত যা-ই হোক কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না। ন্যায়পরায়ণতাই হবে আদর্শ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সকল প্রচেষ্টা বৃথা যেতে বাধ্য।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্নমত প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জন্যই আইন সমান। আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে গণতন্ত্র টেকসই হবে না।’
সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বলেন, ‘৩১ দফার আলোকে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছে। আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমিকভাবে বাস্তবায়ন করব ইনশাআল্লাহ।’

বিএনপিকে বিজয়ী করায় দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এই বিজয় বাংলাদেশের। এই বিজয় গণতন্ত্রের। এই বিজয় গণতন্ত্রকামী জনগণের। আজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন।’

তারেক রহমান জানান, তাঁদের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের অন্যতম হলো—দেশের অর্থনীতিকে ঠিক করা। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিগত সরকার প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকীকরণ করেছে। সে জন্য সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। আরো বেশি ব্যবসা নিয়ে আসবেন এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবেন জানিয়ে বলেন, ‘আইন সবার জন্যই সমান। আমরা চেষ্টা করব আইন যেন আইনের মতো করে চলে।’

বিগত সরকারের আমলে অলিগার্ক তৈরি করে অর্থনীতি ধ্বংস করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক অর্থনীতি হবে। সবাই সবার যোগ্যতা এবং মেধার ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। কোনো বিশেষ মহলকে সুযোগ দেওয়া হবে না।’

সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি। আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দেশে ফের জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতামূলক সংসদ এবং সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। আর কোনো অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে, দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোই মূলত গণতন্ত্রের বাতিঘর। সরকার এবং বিরোধী দল যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। সব সংশয় কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে শান্তিপূর্ণভাবে একটি অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ নির্বাচনের অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান তিনি।

দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, ‘সারা দেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থক ছাড়াও দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের সামনে আজকের এই সময়টি ভীষণ আনন্দের। এমন এক আনন্দঘন পরিবেশে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদের ভারাক্রান্ত করে। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এমন একটি গণতান্ত্রিক সময়ের প্রত্যাশায় তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়েছিলেন। স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কখনোই আপস করেননি। দেশ এবং জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বরাবরই তিনি ছিলেন অটল-অবিচল। আমরা আল্লাহর দরবারে মরহুম খালেদা জিয়ার মাগফিরাত কামনা করছি।’

তারেক রহমান আরো বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপিকে দেশের জনগণ আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছে। জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা দেখিয়েছে, এবার জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজের মাধ্যমে জনগণের এই বিশ্বাস এবং ভালোবাসার প্রতিদান দিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।’

দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের নিয়ে জনাকীর্ণ এই সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তারেক রহমান। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘জনগণকে কনভিন্স করাটাই হচ্ছে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং। আমাদের যে ইঞ্জিনিয়ারিংটা ছিল, সেটা হলো জনগণকে আমাদের পক্ষে নিয়ে আসা। সেটাতে আলহামদুলিল্লাহ আমরা সফল হয়েছি। জনগণকে কনভিন্স করে একটি সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করাটাই কঠিন ছিল। যেকোনো ভালো কাজ, গোল এচিভ (লক্ষ্য অর্জন) করতে গেলে কষ্ট তো হবেই।’

বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক খাতের পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই বিএনপি তাদের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করবে। আমরা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করব, যা কিছু বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে না, স্বাভাবিকভাবেই আমরা সেদিকে যাব না।’

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা যদি দেশের অর্থনীতির জন্য সহায়ক হয়, তখন সিদ্ধান্ত নেব।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনেকের মতো চীনও বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার। আমরা আশা করছি, ভবিষ্যতে দুই দেশই একসঙ্গে কাজ করবে।’

তরুণদের পাশাপাশি সবার গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমরা অবশ্যই তরুণদের কথা শুনব। কিন্তু সমাজে আরো অনেকে রয়েছে। সবার কথা ভাবতে হবে। আমাদের ইশতেহারেও আমরা সবার কথা বলেছি। সেখান তরুণের কথা আছে, বয়স্কদের কথা আছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কথা আছে, নারীদের কথা আছে।’

সার্ককে কার্যকর করা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘সার্ক গঠনের উদ্যোগ বাংলাদেশের ছিল। তাদের সরকার সার্ককে সক্রিয় করতে চায়। সরকার গঠনের পর তারা এ বিষয়ে আলোচনা করবেন।’

শেখ হাসিনার বিচারের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এটা আইনি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে।’

জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান তারেক রহমান। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তা-ভাবনাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথ এবং মত ভিন্ন থাকতে পারে কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।’

বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘শত নির্যাতন-নিপীড়নের পরও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অটুট-অনড় ছিলেন। এবার দেশ গড়ার পালা। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় আপনি, আমি, আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই বিজয়কে শান্তভাবে দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে উদযাপন করেছি। নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে যাতে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, এ জন্য শত উসকানির মুখেও আমি সারা দেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের শান্ত এবং সতর্ক থাকার আহবান জানাচ্ছি।’

ভারত, পাকিস্তান এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা কিভাবে হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি সরকারে পররাষ্ট্রনীতি সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। কোনো নির্দিষ্ট দেশকে কেন্দ্র করে হবে না।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আসুন, আমাদের তরুণ নেতা দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার। তারেক রহমানের হাত ধরে দেশে যে নতুন সূর্য উদয় হয়েছে, সেই সূর্যের আলোয় শান্তি, ভালোবাসার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সংবাদ সম্মেলনে সমাপনী বক্তব্য দেন।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ বিএনপি সিনিয়র নেতারা।

বাংলাদেশ সময়: ১০:৪০:০১ ● ১২ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ