সোমবার ● ১১ মে ২০২৬

রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২৩: স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২৩: স্বপন চক্রবর্তী
সোমবার ● ১১ মে ২০২৬


স্বপন কুমার চক্রবর্তী
( পূর্ব প্রকাশের পর)

জ্ঞানপিপাসু ও বই প্রেমী মানুষের গল্প-১
এমন কোন ছাত্র পাওয়া হয়তো কঠিন যে জীবনে স্কুল ফাঁকি দেয়নি। অনেক খ্যাতিমানদের জীবনী পড়লেও দেখা যায় যে, স্কুল কামাই দিয়ে খেলায় সময় কাটিয়েছেন। অভিভাবকের চাপে স্কুলে যেতে বাধ্য হয়েছেন যদিও। অথবা দৈনিক ক্যালেন্ডারের পাতায় ছুটি খোঁজা এবং কবে ছুটি আসবে তার জন্য নিদারুন অপেক্ষা করে দিন গুনেছেন। আবার অনেকে আছেন স্কুলে যেতে পারেনি বলে সারাজীবন আক্ষেপ করেছেন। তেমনি একজন, পিতার কাছে ক্লাস সিক্সে পড়ার একসেট বই কিনতে টাকা চেয়ে ছিলেন। অভাবি পিতার সামর্থ ছিল না এই দাবি পূরণ করার। অক্ষম পিতা তার আদরের সন্তানের কপালে হাত বুলিয়ে একটু আদর করলেন। আর বললেন, বাবারে, এক টাকা দুই আনা খরচ হবে তোমার এক সেট বই কিনে দিতে। এই টাকাটা যদি তোমার বই কিনার পিছনে ব্যয় করি তাহলে গোটা পরিবারকে দুই দিন অনাহারে থাকতে হবে। তথাপী ছাত্রটির পড়ার অদম্য ইচ্ছা ও জ্ঞান লাভের পিপাসা তাকে তাড়া করেছে আজীবন। বই পড়ার কি পিপাসা । তাকে ইদানিং অনেকেই চিনেন। তিনি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার “ একুশে পদক” বিজয়ী জনাব জিয়াউল হক। তার জীবনী পড়লে শ্রদ্ধায় আনত হয় মাথা। স্যালুট দিতে ইচ্ছে করে তাকে। অথচ সামর্থবান মানুষেরা তার অবদানের নিকট অনেকেই সমকক্ষ নন। তিনি কোন কিছুর লোভে নয়, জীবনে শিক্ষার অপূর্ণতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই কিছু জনহিতকর কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু যারা জনগনের সেবক হিসেবে পরিচয় দিয়ে নির্বাচনে ভোট ভিক্ষা করেন, তারা এই মহতীপ্রাণ জিয়াউল হকের সমকক্ষ নন। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন না। কিন্তু জিয়াউল হক মাদ্রমা ও এতিম খানাতেও বই,খাতা কলম এবং পোশাক পর্যন্ত দিয়ে থাকেন।
চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার ভোলারহাট উপজেলাস্থ চামা মুশরিভুজা গ্রামের বাসিন্দা এই জিয়াউল হক। আজন্ম দারিদ্র তাদের নিত্যসঙ্গী। এই জিয়াউল হকের অবস্থার এখনও তেমন পরিবর্তন হয়নি। তবে মনের দিক থেকে তিনি বিশাল ধনী ব্যক্তি। তার মনটির উচ্চতা আকাশ ছোঁয়া। তিনি নিজ হাতে দই প্রস্তুত করেন এবং পার্শ্ববর্তী বাজারে অথবা রেল স্টেশনে গিয়ে দই বিক্রি করেন। বিক্রয়লব্ধ অর্থে বই কিনে লাইব্রেরী পরিচালনা করেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই দিয়ে আসেন পড়ার জন্য। এতেই তার নিজের পড়তে না পাড়ার অতৃপ্ত বাসনা সান্ত্বনা পায়। জিয়াউল হকের শ্লোগান “ বেচি দই কিনি বই” । ১৯৬৯ সালে তিনি নিজের বাড়িতে একটি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেন। যে দীপশিখা তিনি জ্বালিয়ে রেখেছেন, তার উজ্জ্বল আলো নিজ এলাকাকে অতিক্রম করে দুরে বহু দুরে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
তার পাঠাগারে রয়েছে অনেক বিরল পুস্তক। তাছাড়াও তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বহু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাকে বই দান করেছেন। তিনি ২০০৬ সালে ইউনিলিভার প্রদত্ত ”সাদা মনের মানুষ” পদকে ভূষিত হন। জিয়াউল হক ঝরে পড়া দরিদ্র অসহায় ছেলেমেয়েদের মাঝে বই দিয়ে সহায়তা করে থাকেন। অসহায়দের শীতবস্ত্র দিয়ে সহায়তা দেন। এমন কি সামর্থহীনদের সাধ্য মতো ঘরবাড়ি বিনির্মাণ এবং পানীয় জলের সংকট সমাধানের জন্য টিউবওয়েল দিয়ে থাকেন। বিনিময়ে তিনি ভোট প্রার্থনা করেন না। তিনি সমাজ সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ২০২৪ সালে “ মহান “ একুশে পদক” লাভ করেন। তিনি বলেন, “ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একুশে পদক প্রদানের পর আমাকে বলেছেন যে, তিনি আমাকে স্থায়ীভাবে এবং বড় আকারে পাঠাগার নির্মাণ করে দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী এবং জনগনের যে ভালোবাসা পেয়েছি তাতে আমার জীবদ্দশায় আমার পাঠাগার দেখে যেতে না পারলেও আর কোন আফসোস নেই। ইসলামিক ফাউন্ডেশনও তাকে বই প্রদান করেছেন। নিঃস্বার্থ বই প্রেম ও সামাজিক দায় থেকে তিনি যে কাজ করে চলেছেন তাতে কবি রজনীকান্তের ”দ্বাদশ দান “ কবিতার কথা মনে পড়ে। কবিতাটির শেষাংশে কবি বলেছেন, “ স্বার্থশূন্য হয় যদি এ দ্বাদশ দান , স্বর্গের দেবতা নহে দাতার সমান” ।
জেলা প্রশাসক একেএম গালিব খান বলেছেন, “ জিয়াউল হকের মতো মানুষ ভবিষৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার সকল সামাজিক ও সেবামূলক কাজে জেলা প্রশাসক তার পাশে থাকবে”। তার লাইব্রেরীতে ১৪ হাজারেরও অধিক বই রয়েছে, যাকে কোন অংশেই অপ্রতুল বলা যায় না।
দরিদ্রতার কারনে পড়তে না পারার অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা তাকে মহৎ করেছে। তাই কবি নজরুলের কবিতাটির উদ্ধৃতি দিতে ইচ্ছে হয়, “ হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছ মহান” । ( চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ১৯:০৫:৩৭ ● ৫৩ বার পঠিত