বুধবার ● ১৩ মে ২০২৬
রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২৫ স্বপন চক্রবর্তী
Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২৫ স্বপন চক্রবর্তী
জ্ঞান পিপাসু ও বই প্রেমী মানুষের গল্প-২
( পূর্বে প্রকাশিতের পর )
তার জীবনের কিছু কথা তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন। দেনার দায়ে ভূসম্পত্তি হারা আরজ আলী বলেছেন-”আমাদের গ্রামে নিয়মিত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকলেও –মুর্দা জানাজা, ফাতেফা ও মৌলুদ পাঠ, বিবাহের কলেমা , তালাক পড়ানো ইত্যাদি কাজের জন্য কেহ কেহ বাড়ীতে মুন্সি ধরনের বিদেশী আলেম রাখতেন। তাঁরা সকাল-বিকাল কর্তার ছেলে-মেয়েদের বাংলা ও আরবী পড়াতেন বা মুখে মুখে –কলেমা, ছুরা –কেরাত ও নামাজ শিক্ষা দিতেন। এ জন্য কাউকে নিয়মিত বেতন দিতে হত না। কেননা তাঁরা ওপরী যা পেতেন, তাতেই তাঁদের চলত। বিবাহ-তালাকটা কচিৎ শহরে হলেও শরীয়তের অন্যান্য কাজগুলোতে ছিল তাঁদের একচেটিয়া অধিকার. অধিকন্তু কলেরা, বসন্তাদি মহামারীতে বেশী সংখ্যক লোক মারা গেলে ত কথাই ছিল না” । তার এই লেখা থেকে পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক একটা চিত্র ফুটে উঠে।
কাজেম আলী সরদার তার বাড়িতে মুন্সি তাহের নামক একজনকে রেখে একটি মক্তব খুললে তার মাকেও সেখানে সন্তান পাঠাতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু বিত্ত ও গৃহহীনা মাতা রবেজান বিবি যেখানে তাকে অতিকষ্টে প্রতিপালন করছেন, তিনি তখন তার অপারগতার কথা জানান। এ প্রসঙ্গে আরজ আলী মাতুব্বর লিখেন, “মক্তবের বেতন ও পুস্তকাদি কিনে দিতে মা অপারগ বলে জানালে সরদার সা’ব বল্লেন যে, তিনি আমার বেতন নিবেন না এবং এ বছর বই পুস্তকও আবশ্যক হবে না। কেননা এ বছর তালপাতা ও কলা পাতায়ই চলবে। সিদ্ধ তালপাতা ও খাগের কলম নিয়ে মক্তবে যেতে শুরু কর ।
প্রথম দিনে মুন্সি সা’ব একটা ছুঁচালো লোহা দ্বারা তালপাতায় স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণ এঁকে দিলেন এবং পড়া বলে দিতে লাগলেন। আমি অন্যান্য ছেলেদের সাথে পড়তে শুরু করলাম। স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণ পড়তে-লেখতে বছর খানেক কেটে গেল।
মুন্সি তাহের আলী সা’ব ছিলেন মূলাদীর বাসীন্দা। মক্তব বন্ধ দিয়ে একদা তিনি দেশে গেলেন, আর ফিরলেন না। পরে শোনা গেল যে, তিনি মারা গেছেন। মক্তবটি বন্ধই রইল” ।
পরে পার্শ্ববর্তী আব্দুল মল্লিকের বাড়িতে একটি মক্তব খোলা হলে মাথাপিছু চার আনা বেতন দিতে হবে শুনে তার মা সন্তানকে পড়াতে এবারেও অপারগতা প্রকাশ করলে মুন্সি সা’ব বাড়িতে এসে বেতন না নেবার আশ্বাস দিলে আবার আরজ আলী মক্তবে যেতে শুরু করেন। কিন্তু মক্তবের বই কেনার পয়সা ছিল না তার মায়ের।
অনেকের ”আদর্শ লিপি” ও বই শ্লেট, পেন্সিল ছিল, ছিলনা কেবল আরজ আলীর। মক্তবে তার মেধা ও আকর্ষণীয় ফলাফল দেখে তার জ্ঞাতি চাচা মহব্বত আলী মাতুব্বর দু আনা দিয়ে তাকে সীতানাথ বসাক কৃত একখানা “ আদর্শ লিপি” কিনে দিলেন। আর এক জ্ঞাতি ভাই হামজে আলী মাতুব্বর তাকে একখানা ভাঙ্গা শ্লেটের আধখানা দিয়েছিলেন। পেন্সিল বানিয়ে ছিলেন মেটে পাত্র-ভাঙ্গা চাড়া কেটে। এরপর রামসুন্দর বসু প্রণীত একখানা “বাল্যশিক্ষা” ও একখানা ধারাপাত বই কিনে দিয়ে ছিলেন তার তা ভগ্নিপতি আঃ হামিদ মোল্লা। সাথে কোন এক মুন্সি সা’ব কিনে দিলেন আরবী কায়দা সম্বলিত একখানা আমপারা”। এভাবেই তার বিদ্যা শিক্ষালাভ শুরু হলেও বেশিদুর আগায়নি। শুধু প্রতিকূলতা আর অভাব তার স্বাভাবিক পড়ালেখার অন্তরায় হয়েছে। মা তাকে পড়ার খরচ দিতে অক্ষম। তখন পিতৃহীন এই বালক একদিন ঘর থেকে চাল চুরি করে বিক্রি করেন। সেই পয়সা দিয়ে “ চিনা কাগজ” কিনে ঘুড়ি বানাতেন এবং পাড়ার ছেলেদের কাছে বিক্রী করতেন। তাতে কিছু লাভ হয়েছিল। বিক্রয়লব্ধ পয়সা দিয়ে তিনি “চিত্রাঙ্কন” শিক্ষার বই ও কাগজ কিনে নানাবিধ ছবি এঁকেছেন। গ্রামের লোক তার মায়ের কাছে নালিশ দিল এবং ছবি আঁকা গুনার কাজ বলে তার মাকে বুঝালো। তার মা ছেলে আরজ আলীকে তিরষ্কার করলেন এবং আফসোস করে বললেন, “আল্লাহ ! তুমি সকলেরে দেলা পূত, আর আমারে দেলা ভূত”। এই চুরি করা পয়সায় কিনা বই ও ছবিগুলো তার ভগ্নিপতি পুড়িয়ে দিয়েছিল।
একদিন তার ঘরজামাই ভগ্নিপতি কৃষিকাজ না করে জলের কল বানানো, ছবি আঁকা, প্রভৃতি করার দায়ে আরজ আলীকে প্রহার করে। একই সাথে তার আঁকা বহু ছবি নষ্ট করে দেন। আর তার প্রিয় বইপুস্তক গুলো পুড়িয়ে দেন। অত্যন্ত মনোকষ্ট নিয়ে আরজ আলী তখন কাঁদতে কাঁদতে প্রতিজ্ঞাও করে যে, তিনি আর ছবিও আঁকবেন না, জলের কলও বানাবেন না। হয়তো পড়বেন, নয়তো মরবেন।
আরজ আলী বলেন, “ বেলা ১২টা। একখানা ছেড়া লুঙ্গি পরে ও একটি ময়লা জামার পকেটে চৌদ্দ আনা পয়সা গুঁজে অভুক্ত অবস্থায় লুকিয়ে ঘর হতে বের হলাম পশ্চিম দিকে। বেলা দুটোয় বরিশাল পুঁছে কিছু খেয়ে লক্ষহীন ভাবে চলতে লাগলাম পশ্চিমে” । এভাবে তিনি সতের মাইল পশ্চিমে বাকপুর পৌঁছালেন রাত বারোটায় । পরে বানারীপাড়া , স্বরূপকাঠি হয়ে মাগুরা পৌঁছালেন। এই মাগুরাই হালে সর্ষিণা নামে খ্যাত। সেখানে মাদ্রাসায় ভর্তি হতে ইচ্ছে প্রকাশ করলে কর্তৃপক্ষ অভিভাবকের সম্মতি পত্র দেখতে চাইলেন। কিন্তু তা না থাকায় আরজ আলীকে চিঠি লিখে সেটা সংগ্রহ করতে বললেন। আরজ আলী কপর্দক হীন হওয়ায় তাকে দুই আনা পয়সা দিয়ে পোস্টকার্ড কিনে চিঠি লিখে অভিভাবকের সম্মতি আনতে বলা হলো। কিন্তু চিঠি লিখলে ফল হবে বিপরীত, তাই তিনি আবার বাড়ির দিকে ফিরে আসতে লাগলেন। পকেটে ছিল মাত্র তাকে দেয়া দুই আনা পয়সা। তাও তিনি ফেরৎ পাঠালেন। তিনি লিখলেন- “ ৫ই চৈত্র। বেলা ১০টায় আমরা গাবখান পুঁছলাম। আমার পথের সম্বল ১৪ আনা পয়সা বরিশালের হোটেল ও ( বানরীপাড়া-স্বরূপকাঠি ) ষ্টিমারেই খরচ হয়েছিল। এখন পকেটে আছে মাত্র মাস্টার সা’বের দেওয়া দুটি পয়সা। পয়সা দুটি বাবুর্চি সা’বের হাতে দিলাম আর বল্লাম, এ পয়সা দুটি মাস্টার সা’বের হাতে দেবেন। ( চলবে )
বাংলাদেশ সময়: ২০:৪৩:২৮ ● ৪৩ বার পঠিত