শনিবার ● ২৩ মে ২০২৬

রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩৩ স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩৩ স্বপন চক্রবর্তী
শনিবার ● ২৩ মে ২০২৬


স্বপন কুমার চক্রবর্তী
জ্ঞান পিপাসু ও বই প্রেমী মানুষের গল্প-৩
তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করা লোকটি আমন্ত্রণ পেলেন তাঁকে প্রদানকৃত ”পদ্মশ্রী” পুরষ্কারটি গ্রহণ করার জন্য। পদ্মশ্রী হলো ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরষ্কার। তিনি যেন মহা বিপদে পড়লেন। তাঁর যে পুরস্কার গ্রহণ করার মতো সামর্থ নেই। সামর্থ বলতে শারীরিক সক্ষমতা নয়, আর্থিক সক্ষমতা। তিনি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানালেন যেন পুরস্কারটি তাঁকে ডাকযোগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তিনি জানালেন, ”সাহেব, দিল্লী যাওয়ার ভাড়া নেই, দয়া করে ডাক যোগে পুরস্কারটা পাঠিয়ে দিন”। হলধর নাগের নামটির পূর্বে তিনি কখনও “শ্রী” শব্দটি যুক্ত করেননি। এবার যুক্ত হলো “পদ্মশ্রী” নামক বহুল সম্মানিত খেতাব।
সাদা পোশাক, সাদা ধুতি, গামছা ও গেঞ্জি পরিহিত হলধর নাগ বলতে গেলে প্রায় খালি পায়েই থাকেন সব সময়। ১০ বছর বয়সে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর তৃতীয় শ্রেণীতেই পড়ালেখার ইতি ঘটে। অনাথ জীবনে তিনি বহু বছর ধরে ধাবায় বাসনপত্র পরিষ্কার করে কাটিয়েছেন। পরে কারও সহায়তায় চাকুরি জুটে একটি স্কুলে। না পড়াশোনা সংশ্লিষ্ট কোন কাজ নয়, কাজ পেয়ে যান স্কুলে রান্নাঘর দেখাশোনার। ১৬ বছর যাবৎ তিনি রান্নার কাজ করেন। কৃষ্ণকায় ছিপছিপে গড়নের লোকটির পিঠ পর্যন্ত লম্বা তেল চুপচুপা চুল । সম্বলপুরের রাস্তায় রাস্তায় চানা-ঘুগনি বিক্রয় করতেন এক সময়। তাঁর জীবন সংগ্রামের গল্প রীতিমতো অবাক করে ।
ওড়িষার সম্বলপুর থেকে প্রায় ৭৬ কিলোমিটার দূরে বরগড় জেলা। সেই জেলাতেই ১৯৫০ সালে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। একটি মিষ্টির দোকানে বাসন ধুয়েও জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে জীবন যাপনের কিছুটা সামঞ্জস্য এখানে পাওয়া যায়। কবি নজরুল ইসলাম আসানসোলের এক রুটির দোকানে মাসিক পাঁচ টাকা বেতনে চাকুরি নিয়ে ছিলেন। যাক সে কথা, ওই এলাকায় যখন আরও স্কুল খুলতে শুরু হয় তখন হলধর নাগ এক হাজার টাকা ঋণ নিয়ে স্কুল প্রাঙ্গনে একটি স্কুল-সামগ্রীর দোকান দেন।
১৯৯০ সালে হলধর নাগ প্রথম কবিতা লেখার জন্য কলম ধরেন। তাঁর লেখা প্রথম কবিতা ”ধোড়ো বড়গাছ”( ( বুড়ো বটগাছ )।
হলধর নাগ ওড়িষ্যার একজন সম্বলপুরি কবি ও লেখক। তিনি “ লোককবি রত্ন” নামে সুপরিচিত। তাঁর রচিত কাব্যঞ্জলির জন্য সবচেয়ে বেশি খ্যাত। তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদের একটি সংকলন ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর প্রকাশিত হয়। কাব্যঞ্জলির তৃতীয় খন্ডের কাজও তিনি ইতিমধ্যে শেষ করেছেন । ২০১৯ সালে হলধর নাগকে সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয় ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেন। দীনেশ কুমার মালি তাঁর কবিতা হিন্দিতে অনুবাদ করেছেন। আরও বিস্ময়কর বিষয় যে, সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয় হলধর নাগের সংকলন গ্রন্থ “ হলধর গ্রন্থাবলী -২” বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত করেছেন।
তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করা এই হলধর নাগের কবিতা পাঁচজন ডক্টরেট ডিগ্রির গবেষকের জন্য গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আরও চৌদ্দজন স্কলার এখনও তাঁর লেখার উপর গবেষণা করছেন। সম্বলপুরী রচনার জন্য তাঁকে গঙ্গাধর মেহেরের সাথে তুলনা করা হয়। বিবিসির একটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে। কবিতা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যে বার বার উঠে এসেছে একটি শিক্ষণীয় বিষয়, সেটি হলো-, “ কবিতায় অবশ্যই বাস্তব জীবনের সংযোগ এবং মানুষের জন্য একটি বার্তা থাকতে হবে”।
১৯৯৫ সালের দিকে তিনি স্থানীয় ওড়িষা ভাষায় “ রাম-শবরীর মতো কিছু হিন্দু ধর্মীয় পর্বের উপর লেখালেখি শুরু করেন। শুধু তাই নয়, সেই লেখাগুলো তিনি মানুষের মধ্যে সুন্দর ভাবে আবৃত্তি করে শুনাতে থাকেন। আবেগ মিশ্রিত তাঁর সেই উপস্থাপন মানুষকে খুব আকৃষ্ট করে। খুব জনপ্রিয় হয় তাঁর সেই আবৃত্তি। তিনি তাঁর কবিতার সকল কিছুই মুখস্থ বলতে পারেন। ফলশ্রুতিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী কর্তৃক বহুল সম্মানিত সেই “ পদ্মশ্রী” পুরষ্কারটি তিনি লাভ করেন। সংগৃহীত ছবি- কবি হলধর নাগ
( চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ২০:৩০:৫২ ● ৩৯ বার পঠিত