শুক্রবার ● ২৯ মে ২০২৬
রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩৮ স্বপন চক্রবর্তী
Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩৮ স্বপন চক্রবর্তী
রঙলেপার জন্মদিন কেন ১ অগ্রহায়ণ?
( পূর্বে প্রকাশিতের পর)
অগ্রহায়ণ এলেই কৃষকের দিন যায় প্রচন্ড ব্যস্ততায়। ধানকাটার ধুম পড়ে যায় তখন। আর কিষাণীরাও সমানভাবে পাল্লা দিয়ে বিরামহীন কর্মচঞ্চল হয়ে পড়ে। মাঠে কৃষকের গান, আর বাড়ির আঙ্গিনায় কিষাণীদের চলে ঢেঁকিতে ধান ভানার গান। রাতে চলে বাউল গান, জারি সারি ভাটিয়ালী ও ভাওয়াইয়া গান। প্রকৃতিতে তখন আবহাওয়াও থাকে চমৎকার, মৃদুভাবাপন্ন। এ অপরূপ দৃশ্য যারা দেখেনি তারা বড় সম্পদ দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবে যান্ত্রিকতার আগ্রাসনের কৃত্রিমতায় প্রাণের ছোঁয়া মিশানো নবান্ন আর তেমনটি নেই। এখন সব কিছু হয় মেশিনের মতো শক্ত সব যন্ত্রপাতির কষাঘাতে। হৃদয়ের পরশহীন সে সময় কখন এলো কখন চলে গেলো তা জানা যায় না।
বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে নবান্ন উৎসব ঘটা করে পালনের রেওয়াজ কম বেশি এখনও দেখা যায়। তাছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী , গারো সাঁওতাল বা উপজাতিদের মধ্যে এই নবান্ন উৎসব পালন করতে দেখা যায়। তবে ফসলের ঋতুবৈচিত্রের কারনেও এর অনেকটা আগের মতো আর ঠিক অগ্রহায়ণে করা হয়ে উঠে না। তবুও এখনও অনেক স্থানে ফসল ঘরে আসাতে ”নবান্ন” নামক উৎসবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মনোভাব থেকে দেবতাকে তুষ্ট করতে ”ক্ষেত্রব্রত” নামক ব্রত পালন করা হয়। তাছাড়াও পিতৃপুরুষ, অন্যান্য দেবতা, কাক, ইত্যাদি প্রাণীকেও অন্নভাগ উৎসর্গ করা হয়ে থাকে। তারপর নিজ আত্মীয় স্বজনের মধ্যে তা পরিবেশন করা হয়। প্রচলিত কিছু লোকবিশ্বাস থেকে নতুন চালের তৈরি খাদ্যসামগ্রী কাককেও নিবেদন করা হয়। লৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী কাকের মাধ্যমে পরম অন্ন মৃত ব্যক্তির আত্মার কাছে পৌঁছে। আবার কেহ কেহ বিশ্বাস করেন যে, মৃতের আত্মা স্বর্গে স্থায়ী অধিষ্ঠান হবার আগে কাকের রূপ ধরে আত্মীয়দের মাঝে বিরাজ করে। স্বর্গীয় পিতৃপুরুষদের বঞ্চিত করে ভোগ বিলাস অশোভন, তাই যথার্থ মাধ্যম একমাত্র কাকই এর ভরসা। অনেকে আবার পুরোহিতের মাধ্যমে অথবা যথারীতি আচার করে এই ” কাকবলী” নামক নৈবেদ্য নিবেদন করে থাকেন। এভাবেই একদা অত্যন্ত সাড়ম্বরে নবান্ন উৎসব পালিত হতো। সকল মানুষের সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে সমাদৃত ছিল এই নবান্ন উৎসব। বলতে গেলে আগে বাংগালীর সার্বিক মনোভাব ছিল অসাম্প্রদায়িক ও উৎসব প্রিয়। মেলা বসতো বহু স্থানে।
অতি সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন মেলার নগর কেন্দ্রীকতার কারনে রাজধানী ঢাকাতেও নবান্ন উৎসব পালিত হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে সেই নবান্ন উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। যদিও বিপরীত মনোভাবাপন্ন অংশও যথেষ্ঠ তৎপর। ”জাতীয় নবান্ন উৎসব উদযাপন” নামে একটি পরিষদ আছে। পহেলা অগ্রহায়ণ তারিখে এই পরিষদের পরিচর্যায় ৩ দিন ব্যপি জাতীয় নবান্ন উৎসবের আয়োজন করে আসছেন। ঢাকার রমনা বটমূলে এ উৎসব হয়ে থাকে। এছাড়া ”শোবিজ এন্টারটেইনমেন্ট” নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন বিগত এক যুগ ধরে রাজধানীর ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরে নবান্ন উৎসব ও পিঠা মেলা আয়োজন করে থাকে। উৎসবে প্রায় ৩৩টি স্টলে ২০০ ধরনের পিঠার ব্যবস্থা রাখা হয়। উৎসব প্রাঙ্গনের উন্মুক্ত মঞ্চে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত আয়োজন থাকে নবান্নের নাচ, নবান্নের গান, লোকগীতি, লালনগীতি, বাউল গান, সাপ খেলা, বানর খেলা, লাঠি খেলা, নাগর দোলা, পুতুল নাচ, পালকি , পথ নাটক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। উৎসবের সমাপ্তি দিনে সেরা পিঠা শিল্পীদের পুরস্কার প্রদান করা হয়। নবান্ন তাই উৎসব প্রিয় বাংলার একটি অন্যতম উৎসব।
সৌভাগ্য যে, এই ১ অগ্রহায়ণে আমাদের প্রাণপ্রিয় সাহিত্য সংগঠন ”রঙ-লেপার” জন্মদিন। আসুন রঙলেপার জন্মদিনটি নিয়েও আমরা গর্বিত হই। আর কবি ও লেখক জালাল উদ্দিন মাহমুদের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে বলি- ১ অগ্রহায়ণ হোক আমাদের শুভ নববর্ষ নববর্ষ দিবস। ( চলবে )
বাংলাদেশ সময়: ২০:৩৮:০৫ ● ৪৪ বার পঠিত