শুক্রবার ● ১০ জুলাই ২০২৬
আর্জেন্টিনা বনাম মিসর ম্যাচ; বিভিন্ন অভিযোগ ও সিদ্ধান্ত
Home Page » জাতীয় » আর্জেন্টিনা বনাম মিসর ম্যাচ; বিভিন্ন অভিযোগ ও সিদ্ধান্ত
বঙ্গনিউজ: গতকাল রাতে আমরা ফুটবলপ্রেমী সকল দর্শক এক অসাধারণ, ঐতিহাসিক ম্যাচের সাক্ষী হয়ে রইলাম। নক আউট পর্বে দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে ম্যাচ জেতা সহজ কোনো বিষয় নয়। তার মানে আমি এটা বলছি না যে, গতকাল রাতের আগে আর এরকম খেলা হয়নি। ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালেই তো এরকম হয়েছিল। যদিও শেষাবধি ফ্রান্স পেনাল্টি শুটআউটে প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনার কাছে হেরে গেছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ফ্রান্স খেলায় ২-০ গোলে; পরে ৩-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও বিস্ময়করভাবে ফিরে আসতে পেরেছিল বলেই খেলাটা কিন্তু পেনাল্টি শুটআউট অবধি যেতে পেরেছিল। সত্যিই সেটা অসাধারণ ছিল। স্মৃতিময় হয়ে থাকবে দর্শক হৃদয়ে।
এবার আসি গতকালের খেলা শেষে আর্জেন্টিনার বিজয় নিয়ে উত্থাপিত বিতর্কের বিষয় নিয়ে। মোটা দাগে যা বুঝতে পেরেছি, তাতে ৩টি অভিযোগ সামনে এসেছে।
প্রথম অভিযোগ: আর্জেন্টিনাকে কেন পেনাল্টি দেওয়া হলো?
দ্বিতীয় অভিযোগ: যদি আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বৈধ হয়, তাহলে সালাহকে ফাউল করা হলো যেখানে, সেখানে কেন পেনাল্টি দেওয়া হলো না?
আর সর্বশেষ অভিযোগ: মিসরের দেওয়া দ্বিতীয় গোলটি কেন বাতিল করা হলো?
যেকোনো খেলার পরে খেলা পরিচালনা নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ হতেই পারে। এটা খারাপ কিছু নয়। কিন্তু সেটা আবেগ নয়; বিধিবিদ্ধ নিয়ম অনুসরণ করে হলে বুঝতে সুবিধা হয়। কিন্তু দর্শক তো কোনো বস্তু নয়; একজন ব্যক্তি। তার তো আবেগ থাকবেই। আবেগের আতিশয্যে কখনো কখনো সেটা যুক্তিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। হয়তো সেটারই বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পাচ্ছি।
তিনটি অভিযোগ নিয়ে আলোচনা:
প্রথম অভিযোগ মূলত দ্বিতীয় অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, আর্জেন্টিনার পক্ষে দেওয়া পেনাল্টি ঠিক ছিল। কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন আসে—তাহলে সালাহর ক্ষেত্রে কেন পেনাল্টি হবে না? আসলে ফাউল কখন ধরা হবে, তা ফিফা (FIFA)-এর ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত। সেই ধারা দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়, সালাহকে ট্যাকল করার সময় কোনো নিয়ম ভঙ্গ হয়নি। তাকে সামনে থেকে ট্যাকল করা হয়েছে, বলটিতে লেগেছে এবং বল তার পায়ের ভেতর দিয়ে পেছনে চলে গেছে। অর্থাৎ বলের ওপর থেকে সালাহর নিয়ন্ত্রণ সরে গেছে। তখন তার পায়ে আঘাত লাগে, যা ইচ্ছাকৃত ছিল না। ফলে ফাউল ধরা হয়নি। আর ফাউল না হলে পেনাল্টি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
দ্বিতীয় অভিযোগ: দ্বিতীয় গোল বাতিল করা নিয়ে। গোল কখন বাতিল হতে পারে তা বলা আছে ১০ নম্বর ধারায়। নিয়মবহির্ভূতভাবে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিপক্ষ যদি গোল করে তবে তা বাতিল হতে পারে। এছাড়া হাত দিয়ে গোল, ফাউল করে গোল—এসব হলে গোল বাতিল হয়, যা আমরা সবাই জানি। নিয়মবহির্ভূতভাবে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিপক্ষ গোল দেওয়ার ফলে সেটাও বাতিল হয়ে গেছে ওই ধারা অনুসারেই।
তৃতীয় অভিযোগ: আর্জেন্টিনা যে তিনটি গোল দিয়েছে, সেগুলো ছিল দুর্দান্ত। সেখানে কোনো পক্ষপাতিত্ব হয়েছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তবে ফিফার গোপন এজেন্ডা, দুর্নীতি বা বিশ্বব্যাপী ব্যবসা নিয়ে কিছু বলার মতো ব্যক্তি আমি নই। এগুলো নিয়ে প্রত্যেকে নিজের মতো করে ভাবতে পারে। স্বাধীনতা তো আছেই।
পরিশিষ্ট:
ব্রাজিল, জার্মানি, পর্তুগাল—এদের তো বিদায় হয়ে গেছে। ষড়যন্ত্র করে কি তাদের ধরে রাখা যেত? ইউএসএ-এর বালোগানকে লাল কার্ড দেওয়ার পরও ট্রাম্প সাহেবের চাপের কারণে ফিরিয়ে আনা হলো। তাতে কি তারা জিততে পেরেছে? যদি বলা হয়, বিশ্বকাপে বালোগানকে লাল কার্ড পাওয়ার পর খেলতে দেওয়া অন্যায় ছিল—সেটা নিয়ে আমরা কিছু বলিনি। কোনো দল বা দেশও মুখ খোলেনি। কিন্তু যদি এটা আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় হতো, আমরা কি চুপ থাকতাম?
বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে এসে আসলে খেলেই জিততে হয়। বড় দলগুলোর প্রতি ফিফার দুর্বলতা থাকলেও তা ফল নির্ধারণ করে না। ভিএআর (VAR) প্রযুক্তি আসার আগে অফসাইডের সিদ্ধান্ত রেফারির হাতে থাকত। চাইলে রেফারি কিছুটা ছাড় দিতে পারতেন। কিন্তু ভিএআর আসার পর সেটা আর সম্ভব নয়। অফসাইড নিয়ে কোনো বিতর্ক দেখেছেন? আমি অন্তত দেখিনি। ভিএআর-এর আগে অফসাইড গোল নিয়ে অনেক সময় তীব্র বিতর্ক হতো। কিন্তু ভিএআর প্রযুক্তি আসার পর সেই বিতর্কের সমাধান হয়ে গেছে। এর সঙ্গে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রিভিউ নেওয়ার সুযোগ থাকায় পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই বললেই চলে।
চার বছর পরপর বিশ্বকাপ আসে। দেখতে দেখতে তা শেষ হয়ে যায়। আসুন খেলাটিকে মন থেকে উপভোগ করি। আমরা যে দলকেই সমর্থন করি না কেন, আসল আনন্দটা হলো খেলাটিকে মন থেকে উপভোগ করা। জয়–পরাজয় খেলাধুলার অংশ, কিন্তু সম্পর্ক নষ্ট করা বা ক্ষতি করা কখনোই উচিত নয়। প্রিয় দলের প্রতি আবেগ থাকুক, তবে সেই আবেগ যেন আমাদের মানবিকতা ও সৌহার্দ্যকে আঘাত না করে। মারামারি যেন না হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেকেই প্রিয় দল হেরে গেলে আত্মহত্যা করে ফেলে। এমন আবেগ থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। প্রিয় দলের বিজয় চাই ঠিকই, কিন্তু নিজের বা অন্যের ক্ষতি না করে। এটাই হোক আমাদের চাওয়া।
বাংলাদেশ সময়: ৮:০৫:৪১ ● ২১ বার পঠিত