
বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট (এইচটিপি) ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন ধরনের তামাক পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। বয়স যাচাইয়ের ঘাটতি এবং অনলাইনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অবাধ প্রচারণা তরুণদের এসব পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট করছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের (এনএইচএফ) গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫২৪ জন তরুণ-তরুণীর ২৮ দশমিক ১ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা অন্তত একবার কোনো না কোনো উদীয়মান তামাক পণ্য ব্যবহার করেছেন। বর্তমানে এসব পণ্য ব্যবহার করছেন ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মধ্যে ই-সিগারেটের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
বৃহস্পতিবার ঢাকার সিরাজড্যাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। এতে গবেষণাটি উপস্থাপন করেন এনএইচএফের প্রোগ্রাম কোঅরডিনেটর অরুনা সরকার।
গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন তামাক পণ্যের ব্যবহার পুরুষদের মধ্যে বেশি। জরিপে অংশ নেওয়া পুরুষদের ৭ দশমিক ১ শতাংশ বর্তমানে এসব পণ্য ব্যবহার করছেন। নারীদের মধ্যে এ হার শূন্য।
সাধারণ সিগারেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে নতুন তামাক পণ্যের প্রতি আগ্রহও বেশি। তাঁদের ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ এসব পণ্য ব্যবহার করছেন। বিপরীতে, সাধারণ সিগারেট ব্যবহার করেন না এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এ হার ১ দশমিক ৬ শতাংশ।
বন্ধু ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
গবেষণায় নতুন তামাক পণ্য ব্যবহারের পেছনে বন্ধু ও সহকর্মীদের প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, বন্ধু বা সহকর্মীদের প্ররোচনা কিংবা সামাজিক প্রভাবের কারণে তাঁরা এসব পণ্য ব্যবহার শুরু করেছেন।
পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সহজলভ্যতার চিত্র পাওয়া গেছে। ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যবহারকারী ই-সিগারেট বা বিশেষায়িত দোকান থেকে এসব পণ্য কিনেছেন। আর ৩১ শতাংশ বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেছেন।
বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যবহারকারীদের মাত্র ২৪ দশমিক ১ শতাংশ জানিয়েছেন, এসব পণ্য কেনার সময় বয়সের প্রমাণ হিসেবে তাঁদের কোনো নথি বা পরিচয়পত্র দেখাতে হয়েছে।
তরুণেরা বিভিন্ন মাধ্যমেও এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার মুখোমুখি হচ্ছেন। ২৬ শতাংশ তরুণ দোকান বা বিক্রয়কেন্দ্রে এবং ২০ দশমিক ৮ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা দেখেছেন।
কঠোর নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ
গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এনএইচএফের পক্ষ থেকে বলা হয়, নতুন তামাক পণ্যকে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এগুলো তরুণদের নিকোটিনে আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। তরুণদের সুরক্ষায় তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোলের (এফসিটিসি) নির্দেশনা অনুসারে এসব পণ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ই-সিগারেট, এইচটিপি ও নিকোটিন পাউচকে কঠোর তামাক নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা, বিক্রির সময় বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা, প্যাকেটে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা যুক্ত করা এবং উচ্চহারে কর আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দোকান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন, প্রচারণা, মূল্যছাড় ও স্পনসরশিপ বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গবেষকদের আশঙ্কা, নতুন তামাক পণ্যের বিস্তার দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তরুণদের মধ্যে নিকোটিন-নির্ভরতা বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।