বুধবার ● ২৮ অক্টোবর ২০২৬

রঙলেপা- ( রঙে ভরা লেখক-পাঠক ফোরাম ) ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৪৭ স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ( রঙে ভরা লেখক-পাঠক ফোরাম ) ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৪৭ স্বপন চক্রবর্তী
বুধবার ● ২৮ অক্টোবর ২০২৬


স্বপন চক্রবর্তী

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে-৪

লালনের ধর্মগত জাতি-পরিচয়, ও প্রকৃত জন্মস্থান ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর বিতর্ক ছিল, এখনও তা বিদ্যমান আছে। কেহ ইচ্ছে করে,আবার কেহ বা অজ্ঞতা বসত এ বিতর্কের অবতারণা করে থাকেন। যখন লালনের খ্যাতি প্রবহমান থাকে, তথন অনেকে নিজেদের লোক বলে পরিচয় দিতে সচেষ্ট হয়। আবার যখন বিরূপ সমালোচনা চলতে থাকে তখন তাঁকে বিরূপভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলে। লালনের মাজারে আক্রমণ অথবা লালন-পূজা দুটোই চলে সমান্তরাল। এটাই বোধ হয় ইতিহাসের বৈশিষ্ট। আমাদের জাতীয় ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে ”লালন সমগ্র ” গ্রন্থের কিছু অংশ উধৃত করতে চাই।
“লালনের জীবনী সম্পর্কে বিশেষ করে জন্মস্থান ও ধর্মগত জাতি-পরিচয় নিয়ে পূর্বোক্ত মতের বিরোধী একটি ভিন্ন ধারনাও প্রচলিত আছে। মৌলভী আবদুল ওয়ালী তাঁর এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হরিশপুর গ্রামে বলে উল্লেখ করেন। তবে ওয়ালী সাহেব লালনের ধর্মপরিচয় প্রসঙ্গে তাঁকে “ Known as Kayastha” বলে অভিহিত করেছেন।
কাঙাল হরিনাথ মজুমদার তাঁর ”ব্রহ্মান্ডবেদ” –এর দ্বিতীয় ভাগ প্রথম সংখ্যায় যোগতত্ত্বের আলোচনা-প্রসঙ্গে এক উপ-পাদটীকায় লালনকে মুসলমান কুলোদ্ভব “ পরম ভক্ত যোগী” এবং তাঁর গুরু সিরাজ সাঁইকে “সিদ্ধ যোগী” বলে উল্লেখ করেছেন।
এ, কে, এস, নূর মোহাম্মদ মাসিক “ মোহাম্মদী” ( আষাঢ় ১৩৪৮) –তে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে ( লালন ফকির হিন্দু না মুসলমান? ) লালনকে যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামের এক মুসলমান তন্তুবায় পরিবারের সন্তান বলে ধারণা করেছেন। হরিশপুর নিবাসী সাধক কবি পাঞ্জ শাহের পুত্র খোন্দকার রফিউদ্দীনও লালন মুসলিম-সন্ততি ও তাঁর জন্ম হরিণাকুন্ডু থানার হরিশপুর গ্রামে বলে মত পোষণ করেন। এই মতকে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য “ বিশ্বাসযোগ্য নয়” বলে মত পোষণ করেন।
মুহম্মদ আবু তালিব, এস এম, লুৎফর রহমান ও খোন্দকার রিয়াজুল হক এই তিন লালন গবেষক লালনের জন্ম হরিশপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারে বলে মত পোষণ করেন। তাঁদের মতে লালনের পিতার নাম দরিবুল্লাহ দেওয়ান ও মাতার নাম আমিনা খাতুন। এই মতের সমর্থনে তাঁরা প্রমাণ হিসেবে দাখিল করেছেন লালন-শিষ্য দুদ্দু শাহ রচিত লালনজীবনীর একটি কলমি পুথি।
অধিকাংশ লালন-গবেষক ও পুথি-বিশেষজ্ঞ দুদ্দু শাহ রচিত লালনজীবনীর এই পুথির অকৃত্রিমতা সম্বন্ধে সংশয় পোষণ করে একে বাতিল করে দিয়েছেন।
এই পুথি সম্পর্কে আহমেদ শরীফ মন্তব্য করেছেন, “ লালনচরিত-এর অকৃত্রিমতা নানা কারণে বিশ্বাসযোগ্য নয়।” লেখককে লিখিত এক পত্রে এই পুথি যে জাল সে-সম্পর্কে তিনি সরাসরি এই সিদ্ধান্তে এসে বলেছেন-
”…. নানা কারণে দুদ্দুর নামে একালের কোনো স্বল্পবুদ্ধি যশোহরী ও ইসলামগৌরবগর্বী গবেষকই এ জীবনী তৈরি করেছেন বলে আমার ধারণা। এতে ছেঁউড়িয়ার, হিন্দুর ও বাউলের দাবী বাতিল করে ঝিনাইদহের, হরিশপুরের ও সূফীর দাবী প্রতিষ্ঠা সম্ভব ও সহজ বলে মনে করা হয়েছে।”

বাউল-গবেষক এ, এইচ, এম ইমামউদ্দীনও নানা যুক্তি প্রদর্শন করে দুদ্দু শাহের এই পুথিকে “অতি আধুনিককালের কোনো অজ্ঞাত কবির রচিত” বলে মন্তব্য করেছেন। এ প্রসঙ্গে আনোয়ারুল করীম বলেছেন, “ নানা কারণে এই পান্ডুলিপি দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। সনৎকুমার মিত্রও দুদ্দু শাহের পুথিকে “ জাল ‘ বলে পরিত্যাগ করার কথা বলেছেন। মাগুরার লালনপন্থি সাধক মনোরঞ্জন গোঁসাইও বর্তমান গ্রন্থের লেখককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, নারিকেল বাড়িয়ায় লালনভক্ত শাহ আবদুল লতীফ আফীআনহু এই জাল পুথির উদ্ভাবক ও রচয়িতা।
মরমী সাধনার ঐতিহ্যমন্ডিত হরিশপুরকে লালনের জন্মস্থান হিসেবে দাবি করার পেছনে আঞ্চলিকতা ও জাতিগত গৌরববোধের ভূমিকাই প্রধানত কাজ করেছে।
উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ধারণাঃ
লালনের পরে বিখ্যাত ফকির পাঞ্চ শাহও এই হরিশপুরেই বাস করেন এবং বিংশ শতাব্দির প্রথম পাদ পর্যন্ত এই মতাবলম্বী বহু মুসলমান ফকিরের আস্তানা এই গ্রামে বর্তমান দেখিয়াছি। সুতরাং লালনের বাস, এমন কি লালন-গুরু সিরাজ সাঁই-এর বাস এখানে কল্পনা করা অস্বাভাবিক নয়।
লালন তথা লোকসংস্কৃতিচর্চার প্রবাদ-পুরুস মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন লালনের জাতধর্ম ও জন্মস্থান সম্পর্কে নতুন মত-প্রতিষ্ঠা প্রয়াসের বিষয়ে মন্তব্য করেছেন:
“ ইদানিং এখানে দেখা যাইতেছে অনেকেই প্রাণান্ত পরিশ্রম করিয়া লালন শাহকে জন্মকাল হইতে মুসলমান বলিয়া পরিচয় দিতে চেষ্টা করিতেছেন ও লালন শাহের জন্মস্থান যশোহরে বলিয়া উল্লেখ করিতেছেন। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার সুদীর্ঘ চল্লিশ বৎসরকাল ইহারা সকলেই তুষ্ণীভাব অবলম্বন করিয়া ছিলেন। “
( চলবে

বাংলাদেশ সময়: ২০:০৫:১৭ ● ৫৫ বার পঠিত