কুসুম: স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » কুসুম: স্বপন চক্রবর্তী
শুক্রবার, ৯ জুলাই ২০২১



স্বপন চক্রবর্তী

(গল্পটি গত ০৩/০৭/২১ তারিখ হতে পাঁচটি পর্বে প্রকাশিত হয়েছে। পাঠকদের অনুরোধক্রমে এখন তা একত্রে দেওয়া হলো। গল্পটি প্রকাশ হতে থাকা অবস্থায় অনেকেই অনেক মূল্যবান মন্তব্য করেছেন। তাদেরকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। মূল্যবান এই মন্তব্যগুলো আমি সংরক্ষণ করে রাখতে চেষ্টা করবো।)
***************
এখন ঢাকায় থাকি। একেবারে খুপড়ি ঘর না হলেও ছোট্ট একটি বাসা। বেতন যা পাই তা দিয়ে মাসিক খরচ নির্বাহ করাই কষ্টকর হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই দুজনেই চাকুরী করছি। আমার স্ত্রীর আয় হতে অন্তত বাসা ভাড়াটা সংকুলান হয়। তাতেই বা কম কিসের।

স্ত্রী কতদিন যে অনুযোগ করেছে একটি কাজের মেয়ে রেখে দিবার জন্য । দিচ্ছি দিব বলে কাল ক্ষেপণ করেছি। অবশেষে বিরক্ত হয়ে এখন আর কোন তাগিদ দেয় না। তখনই ছোট্ট একটি কাজের মেয়ে সংগ্রহ করা গেল। সেই মেয়ে কাজকর্ম করবে কি, তাকেই বরং আমাদের দেখাশোনা করতে হয়। আমার মেয়ে শৈলী তখন ছোট। তার তখনো স্কুলে যাবার বয়স হয়নি। অর্থাৎ স্কুলে দেইনি। সে প্রতিদিনেই আমার কাছে বায়না ধরে-হয় স্কুলে নিয়ে দিয়ে আসবে, নয়তো তোমার সাথে তোমার অফিসে নিয়ে যাবে। বুঝতে পারি , একজন নিষ্ঠুরের মতো বাহির দিয়ে তালাবদ্ধ ঘরে সারাদিন ছোট্ট দুটি শিশুকে আটকে রাখা কতটা বিপদজনক, অমানবিক, কতটা মানসিক নির্যাতন। অবুজ শিশু মন তো বাহির মুখো হতেই চাবে। স্কুলে যাবার আগ্রহ নেহায়েৎপড়াশোনার তাগিদে না হলেও একাকিত্ব ও বন্ধী জীবনের পরিসমাপ্তির চিন্তা থেকেই হয়তো হবে। কি করবো কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।
এমনি ভাবে দিন কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ একদিন কাজের মেয়েটির বাবা এসে মেয়েটিকে নিয়ে গেলো। মেয়ের মায়ের নাকি আব্দার , এক নজর মেয়েকে দেখবে। পরে মেয়েকে আবার যথারীতি পৌঁছে দিয়ে যাবে। মেয়ের বাবা মেয়েকে নিয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু পরে আর নিয়ে আসলো না। বাধ্য হয়েই আমার মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করতে হলো। এখন আমার কাজ হলো প্রতিদিন মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসা । পরে এক ফাঁকে তাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসা। অথবা অফিসে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে রাখা। যেদিন আমার আগে ছুটি হয় সেদিন আমি মেয়েকে নিয়ে যাই। আর নয়তো মেয়ের মার উপর সে দায়িত্ব টুকু বর্তায়।
শৈলীকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে অফিস যেতে হয়। কিন্তু কোন দিনই সঠিক সময়ে অফিস পৌঁছাতে সমর্থ হইনি। কারন হলো ঢাকার প্রচন্ড যানজট। অফিসে এখন আর কোন অজুহাত শোনতে চায় না। তবুও উপযাচক হয়ে ব্যাখ্যা দিতে চাই। সামান্য শুনেই অসমাপ্ত বাকী কথাগুলো আমার বস অগ্রিম বলে দিতে থাকে। বলে, তারপর স্কুলে মেয়েকে দিয়ে এসে আবার কঠিন যানজটে পড়ে গেলেন, আপ্রাণ চেষ্ঠা করলেন, শেষে হেঁটেই রওয়ানা দিলেন , কিন্তু..
ঢাকার যানজট,এটাকে বলে বুঝানো যাবে না। রাজপথের লাল সিগন্যাল বাতি জ্বলে ,আবার হলুদ হয়, হয় সবুজ। তবুও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে রিক্সা। ট্রাফিক পুলিশ রাস্তা আটকে রেখেছে। কিছু যানবাহনকে ছেড়েছে, আবার বন্ধ করেছে। সিগন্যাল বাতি অন্ধের মতো তার ডিউটি করেই যাচ্ছে। কার জন্য তার এই দায়িত্ব বোধ তা সেও জানেনা।
যানবাহন থেমে থাকা অবস্থায় শুরু হয়ে যায় ভিক্ষুকদের আব্দার,,- একটা টেকা দেন স্যার। চলে উচ্চ শব্দের গাড়ীর হর্ণ, গাড়ীর কালো ধুয়া,প্রচন্ড গরম, হকারদের উৎপাত- এর মধ্যেই চলে ঢাকাবাসীর জীবন-জীবীকা । রিক্সারও আবার সকল রাস্থায় প্রবেশাধিকার নেই। তবুও ঢাকায় থাকি আমরা- কেহ বাধ্য হয়ে, আবার কেহ শখ করে।
এক সিগন্যালে এসে থেমে গেল রিক্সা। দীর্ঘক্ষণ ঠাঁয় থেমে আছি। প্রচন্ড গরম। শৈলীকে সাথে নিয়ে দ্রুত অফিসে ফেরার ইচ্ছা। কিন্তু কোন উপায় নেই। কোন সমাধান নেই। শুধু বাড়ছে টেনশন। একেবারেই অসহায়ের মতো বসে আছি। বিরক্তিতে বিষিয়ে গেছে মন। অপরদিকে আমার মেয়ের মনে অনেক আনন্দ। যেন খোলা আকাশটা এখন তার দখলে। তার ক্রমাগত অনেক প্রশ্নে বিরক্তির মাত্রা আরো বেড়ে যেতে লাগলো।
বাবা, এটা কি? -কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।
ওটা কি? -তিন নেতার মাজার।
মাজার কি? -কবরস্থান। সমাধিস্থান।
ওটা কি? -দোয়েল পাখি, দোয়েল চত্বর।
ওহ্, আমাদের জাতীয় পাখি ?
ওইযে,লাল বিল্ডিং ওটা কি ? -ওটা কার্জন হল।
কার্জন হল ? হ্যাঁ মামণি, এবার একটু চুপ কর, ভালো লাগছে না।
******************

মেয়ে তার মতো করে কখনো গান, কখনো ছড়া, আবার কখনো প্রশ্নবাণে আমাকে জর্জড়িত করে চলছে। আমার একেবারে বাকরুদ্ধ অবস্থা। এই ভাবে চলে আমার নিত্যদিনের পথ চলা।
রিক্সায় যানজটে আটকে পড়ে একই জায়গায় দীর্ঘক্ষণ থেমে আছি। ভিক্ষুক এসে হাত পাতলো-একটা টেকা দেন স্যার,কিছু কিইন্যা খামু। হ্যাঁ বা না কোন উত্তর দিতে ইচ্ছে আর হচ্ছে না। আর উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত হাতও সরাবে না। এভাবেই একটি টাকা সাহায্য দিন, একটি চকলেট কিনুন,একটি চিরুনী,দাঁতের ব্রাশ,আধুনিক নামাজ শিক্ষা, অথবা একটি অতি মূল্যবান পুস্তক “ কি করলে কি হয়” – জেনে নিন,মাত্র বিশ টাকা ,ছোটদের সহজ ইংরেজী শিক্ষা আরো কত কি। যতক্ষণ রিক্সা থেমে থাকবে ততোক্ষণ চলতে থাকবে এই আবেদন। -তখন টেনশন ও বিরক্তিতে প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত হয়।
হঠাৎ ৯/১০ বছরের একটি মেয়ে এসে হাজির। চেহারা দেখে হঠাৎ বুঝতে অসুবিধা হবে তার প্রকৃত বয়স কতো। দারিদ্রক্লিষ্ট চেহারা তার কোন শ্রী প্রদর্শন করে না। প্রকৃত বয়স কত,তাও এক দৃষ্টিতে দেখে ঠাহর করা যায় না। অনেক মিনতী করে বলতে লাগলো , “ ফুল নেন স্যার, একটি ফুল নেন। আমি তার এই আবেদনে কোন উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করিনি। আবারও একই অনুরোধ- নেন না স্যার একটা ফুল, একটা রুডি কিইন্যা ছোড ভাইডারে খাওয়ামু। স্যার সকাল থাইক্যা কিছু খাই নাই, দেন স্যার, আল্লায় আপনার ভালা করবো “ – কথা বলতে বলতে সে তেল-চিরুনী বিরহিত বাদামী রংয়ের চুলে বার বার চুলকাচ্ছিল। একটু দুরেই ৫/৬ বছরের একটি ছেলে বসা। তার হাতে একটি চটের বস্তা। মেয়েটির বার বার অনুরোধ আমাকে ততোধিক বিরক্তিতে ফেলে দিল। আমার রাগ প্রচন্ড বাড়তে লাগলো। দু’একবার নিষেধ কাররার পরও রেহাই পাওয়া গেল না। কিন্তু এই আকুতির বিপরীতে আমার ততোধিক সন্দেহ হতে থাকলো। আমি শোনেছি ,ছোট ছোট বাচ্ছাদেরকে শহরে ভিক্ষা করানো হয়। ওদের পিছনে থাকে একদল দুষ্টচক্র। এমনকি একদম শিশু বাচ্চাদের টাকার বিনিময়ে ভাড়া করে এনে একটু বড় শিশুদের কোলে দিয়ে ভিক্ষা করানো হয়। দিন শেষে শিশুটিকে ফেরত দেওয়া হয়। ভিক্ষাকালে শিশুটির মাও অদুরে লুকিয়ে থাকে। মানুষজন প্রতারিত হয়।
আমি অন্তত একটি রাস্তারএকটি ছোট বালিকার নিকট প্রতারিত হতে রাজি নই। অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে একটা ধমক দিলাম। দেখলাম নির্বিকার বালিকাটি মুখটি ফ্যাকাশে করে আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে। ভাবলাম আপদ গেলো। আমার মেয়ে শৈলী সব কিছু পলকহীন চোখে তাকিয়ে দেখতে লাগলো। অবশেষে অনুনয়ের সাথে বলতে লাগলো- “ বাবা একটি ফুল কিনে নাওনা, আমি ফুল খুব পছন্দ করি। নাওনা বাবা একটা ফুল। না, ফুল নেব না -কেন বাবা? এমনি -নাও না বাবা একটি ফুল না নেব না, বললাম তো। -বাবা, আমাকে স্কুলে গিয়ে চকলেট কিনে দিতে হবে না। আমি চকলেটের জন্য বায়না ধরবো না। নাও না বাবা একটা ফুল। আমার শৈলীর আব্দার শুনতে পেয়ে ফুল নিয়ে মেয়েটি একটু দুরেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। চলে যায় নি। আমি দুটি ফুল কিনে নিলাম। এমন সময় পিছন দিকে হঠাৎ চীৎকার- ধর ধর ধর.। একটি মহিলা অনুরোধ করে সকলকে জানাতে লাগলো, “ ধরেন ভাই ধরেন! আমার গলার চেইনটা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। একটু ধরেন। - দেখলাম দু’একজন মহিলাটির সাথে সুর মিলালো,-ধর ধর ধর। আমার রিক্সার পাশ দিয়েই দৌড়ে চলে গেলো। একটু দুরে গিয়েই স্বাভাবিক ভাবে নির্ভীক মনে হেঁটে রাস্তা অতিক্রম করলো। ওরা ছিনতাইকারী। যানজটে এভাবেই তাদের ছিনতাই কাজ চলে। দীর্ঘদিন ধরে প্রায় একই ভাবে যাতায়াত চলছে।
আমার মেয়ের তাগিদে প্রায় প্রতিদিন ফুল কিনতে হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে এটি একটি নৈমিত্তিক কাজ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। যানজট থাক বা না থাক,রিক্সা ওয়ালাকে রিক্সা থামাতে বলে ফুল ওয়ালা মেয়েটির নিকট আমার মেয়ে চলে যায়। ফুল ওয়ালা মেয়েটিও মনে হয় এটির অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে। আমার শত বকুনি বা বাধা তাকে দমাতে পারেনা। তারা একত্রিত হয়ে মনে হয় অভূত পূর্ব এক আনন্দ সাগরে ডুবে যায়। আমি কোন উপায়ান্তর না দেখে অসহায়ের মতো শুধু রিক্সাওয়ালাকে সাইড করে দাঁড়াতে বলি। শৈলীকে ফিরয়ে আনতে কখনো কখনো আমাকেও চলে যেতে হয় তাদের সেই ত্রিরত্ন সভায়।
ক্রমে ক্রমে ফুল বিক্রেতা মেয়েটি সম্পর্কে অনেক কথা জেনেছি। তোর নাম কিরে ? -কুসুম , তোর ভাইয়ের কি নাম ? -সুরুজ স্যার। পৈতৃক প্রদত্ত এই নাম অবশ্য এখন আর নেই। আধুনিক নগর সভ্যতা তাদেরকে নতুন ভাবে নামাকরণ করেছে ইতিমধ্যেই। একটি সাধারণ নাম হয়েছে “টোকাই”। তোদের সঙ্গে আর কে কে আছে ? -আর কেউ নাই স্যার। মিথ্যা বলার আর জায়গা পাস না! -না,মিথ্যা কথা আমরা কই না স্যার। ফের মিথ্যা ? একেবারে পাকা ট্রেনিং !
********

এমনি ভাবে কুসুমের দুভাই-বোনের সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি যে এই শহরে তাদের আর কেহ নেই। মা থেকেও এখন নেই। এই শহরে কেন, অন্য কোথাও কেহ আছে কিনা –জানা নেই। বাংলাদেশের কোন এক নিভৃত গ্রামে ছিল তাদের বসবাস। আজন্ম দারিদ্র তাদের পিছু ছাড়েনি।
তবে এক সময় স্নেহ-মায়ায় পরিপূর্ণ ছিল তাদের সংসার। কুসুমের বাবা ছিল রাজ মিস্ত্রির যোগালী। গ্রাম থেকে রোজ নিকটবর্তী কোন এক শহরে এসে রাজ মিস্ত্রির যোগালীর কাজ করতো তাদের পিতা। আবার দিন শেষে ফিরে আসতো শান্তির নীড়ে। সবে স্কুলে যেতে শুরু করেছে কুসুম । তার ভাই সুরুজ আরও ছোট। সুরুজের স্কুলে যাবার খুব সখ হলেও তাকে স্কুলে যেতে দেওয়া হয়নি তখনো। সিদ্ধান্ত ছিল, সামনের বছর সুরুজ স্কুলে যাবে। মানসিক প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। কিন্তু একদিন। হ্যাঁ সেই একদিনের কথাই বলবো এখন।
একদিন অন্তহীন কঠিন পথের যাত্রী হতে হয় তাদেরকে। দুর্ভাগ্য পিছু নেয় পরিবারটির। যোগালীর কাজ করার সময় অসাবধানতার কারণে অনেক উপর থেকে পা পিছলে নিচে পড়ে যায় চাঁন মিয়া। সাধ্যমতো চিকিৎসা তারা করিয়েছে। এই ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে শেষ সম্বল মাথা গুঁজার ঠাই টুকু শেষ হয়ে যায়। ফলে প্রাণে বেঁচে যায় বটে, কিন্তু পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় প্রাণ বিসর্জনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে চাঁন মিয়া । সুন্দরী যুবতী স্ত্রীর মুখ বিষন্ন। হাসি ম্লান হয়ে গেছে। ছেলে-মেয়ে সহ পরিবারটি দিনের পর দিন অনাহারে –অর্ধাহারে কাটায়। কেহ কোন কাজ দেয় না চাঁন মিয়াকে। কাজ দিলেই বা কি ? একবারে পঙ্গু জীবন তার। চোখের সামনে অনাহারে থাকে পরিবার। অক্ষমতার গ্লানি থেকে মুক্তির পথ খোঁজতে থাকে সে । পঙ্গুত্ব তার সুখের সংসারের সকল সুখ কেড়ে নিয়েছে। তাই সে মুক্তি নিতে চেয়েছে। আত্মগ্লানির দুর্বিসহ যন্ত্রণা তার জীবনে অভিশাপ হয়ে এলো। এর থেকে পরিত্রাণ, একমাত্র স্বেচ্চা সলিল সমাধি বলে সমীচীন মনে করে চাঁন মিয়া।

এক রাতে গলায় কলসী বেঁধে নদীর জলে ডুবে প্রাণ জুড়ালো চাঁন মিয়া। কুসুমের মা কাজের সন্ধ্যানে গ্রামময় ঘুরে বেড়ায়। সাহায্যের জন্য লোকের কোন অভাব হয়না। কিন্তু অন্য প্রস্তাব পায়। দিন শেষে আদরের সন্তানদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে। কোন ভাবেই দিন আর চলতে ছিল না । দুবেলা খাবার নিশ্চিত তো অন্তত করতে হবে। কিন্তু কুসুমের মা আম্বিয়া খাতুনের সামনে কোন পথ আর খোলা ছিল না।
লোক মুখে সে শোনে, ঢাকা শহরে টাকা নাকি বাতাসে উড়ে বেড়ায়। কোন অভাব হয়না কাজ কর্মের। একদিন সন্তান দুটোকে নিয়ে পাড়ি জমায় স্বপ্নের শহর ঢাকায়। রাস্তা-ঘাট জানা নেই চেনা নেই এই শহরে। তার উপর বড় বিপদ হলো তার রূপ-যৌবন। যেখানেই যায় লোকে শুধু পরখ করে তার গতর। কেহ আবার কোন কাজ নেই বলে বিদায় করে দেয়। কেহ প্রস্তাব দেয় অন্য রকমের। এই অক্ষমতার আত্মগ্লানি আম্বিয়াকেও খুব ব্যাথাতুর করে।

সাত কথায় নাকি সতীর মনও গলে। ছোট বেলায় দেখেছি গ্রামের টিউবওয়েল। তার নিচের কংক্রিটও ক্ষয় হয়ে যায় একটি মাটির কলসের ঘর্ষণে। তাছাড়া নিজের রূপ-যৌবনের একটু নিরাপত্তা এবং সন্তানদের দুটো খাইয়ে পড়িয়ে মানুষ করা, এই সব চিন্তায় কোন একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় আম্বিয়া। সন্তানের মুখে দুটো খাবার তুলে দিবার চিন্তায় মন পরিবর্তন করে। ইচ্ছায় হোক বা বাধ্য হয়েই হোক, একদিন এক কসাইকে বিয়ে করে ফেলে সে। এখানেই শেষ নয়। বিবাহের পরের বাস্তবতা আরো কঠিন, আরো অসহনীয়। প্রথমে শর্ত থাকলেও পরে কসাই লোকটি আর শর্ত রক্ষা করেনি। আদরের সন্তান দুটিকে সাথে রাখার অবলম্বন টুকুও হারায় সে। বাস্তব জগতে প্রবেশ করে তার ভুল ভাঙ্গতে থাকে এক এক করে। কিন্তু তখন আর কোন উপায় খোঁজে পায়নি। কথায় বলে, “ অতি বড় ঘরণী না পায় ঘর, আর অতি বড় রূপসীর না জোটে বর।
একদিন কুসুম ও তার আদরের অবুঝ ভাইয়ের ঠিকানা হয় ফুটপাতে। কিশোরী কুসুম ফুল বিক্রি করে দিনান্তে যা পায়, তাই দিয়ে রাতে দুইজনে আহার করে। চটের একটি বস্তা গায়ে জড়িয়ে দুই ভাইবোন জড়াজড়ি করে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ে।
*************

অনেক দিন চেষ্টা করেছি কুসুমকে কিছু টাকা দিব। তার প্রতি কেমন যেন একটা দুর্বলতা এসে গেল। তাকে বলি-
কুসুম !
-জ্বী স্যার,
তোকে যদি কিছু টাকা দেই ,তাহলে তো তোর কষ্টটা একটু কমবে। ফুলের ব্যবসাটা আর একটু বড় করতে পারবি। নাকি ?
না স্যার, কুসুম তৎক্ষনাৎ উত্তর দেয়। কেন ? আমি জানতে চাই।
বলে - রাতে মাস্তানরা আইসা চুলের মুঠি ধইরা সব কাইড়া লইয়া যাইবো। আর মাইরও খাওন লাগবো। ভেবে দেখলাম, সত্যিই তো, টাকা-পয়সার সঞ্চয় তাদের বরং জীবন বিপন্ন করতে পারে। তাদের নেই কোন সিন্ধুক, নেই কোন ভল্ট,নেই কোন ব্যাংক হিসাব।
বৃষ্টি আসলে থাকিস কোথায় ?
-ওই গোদাম ঘরের বারান্দায়।
তোর মা আর কোন দিন আসে নি ?
-একদিন পলাইয়া আইছিল।
তারপর ?
-তারপরে আমারে আর ভাইডারে খুব আদর করলো। খাবার নিয়া আইছিল স্যার। পাশে আয়ল্যান্ডে চটের মধ্যে বহাইয়া আদর কইরা খাওয়াইছে। পরে সুন্দর কইরা আমার চুলে বেনী বাইন্দ্যা দিছে।
তারপর ?
-তারপর স্যার, বলেই চোখের জল মুছতে লাগলো। অনেক্ষণ পর কান্না থামিয়ে বলতে লাগলো-আল্লায় আমাগরে হতভাগা বানাইছে স্যার। আম্মায় কি করবো ?
কেন, কি হয়েছিল কুসুম ?
-আমাগো কাছে আওনের বারণ করছিল আমার মায়েরে। মায় তাও পলাইয়া আইছে- হেই বেডায় টের পাইয়া পাছে পাছে আইয়া চুলের মুঠি ধইরা আমাগো সামনে মায়েরে একটা বাঁশের লাঠি দিয়া খুব মারছে। ( কুসুম ”চুলের মুঠি ধইরা “ শব্দটা অহরহই বলে)। মায় তাও আমারে আর ভাইডারে জড়াইয়া ধইরা রাখছে। মাইরের চোডে মার কপাল থাইক্যা রক্ত বাইর অইল। সব তো স্যার আমাগো কপালেরই দোষ। বলে চোখের জল মুছতে লাগলো। পরে একটু শান্ত হয়ে আবার বললো, আমরা ডুকরাইয়া কানতাছি। তাও মায়েরে ছাড়ে না। কত মাইনষেরে বাঁচাইতে কইলাম, কেউ আইলো না। ফিইরাও কেউ তাকাইলো না। তখন আমাগো মায়েরে কইলাম, মারে তুই আর কোন দিন আমাগোরে দেখবার আইবি না। আমরা খুব ভালা আছি রে মা ,খুব ভালা আছি- বলেই উচ্চ স্বরে কাঁদতে লাগল ।
এই ব্যস্ততম নাগরিক জীবনে কুসুমদের মতো ভাগ্য বিড়ম্বিতদের আটপৌরে জীবনের সুখ-দুঃখ কাহিনী শোনার মতো ফুসরতৎ নগর বাসীর কোথায়? যানজট ছাড়া মানুষের ভীড়ে হেঁটেও চলা সহজ নয় এই শহরে। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলতে থাকলে দুই মিনিটের রাস্তা দশ মিনিটেও অতিক্রম করার সাধ্য কারো নেই। গায়ে গায়ে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে রাস্তা এগুতে হবে। কেউ কারো পরিচিত নয়, নয় আপনজন। কেউ কারো বিপদে আপদে ফিরেও তাকায় না। সবাই যেন জনারণ্যে একা।

আমি নিজেকে খুব অপরাধী ভাবতে লাগলাম। ভাবলাম, এইভাবে তাদের ক্ষতকে দগদগে ঘা না করাই ভালো ছিল। কষ্টের সুপ্ত ভিসুভিয়াস যেন জাগ্রত হয়ে গেলো। কষ্টটা যেন তাদের একমাত্র পাওনা, এমন ধারণা তাদের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। কুসুমরা ধরেই নিয়েছে যে, দুঃখ দুর্দশা শুধু তাদের মতো অভাগাদের জন্যই তৈরী করা হয়েছে। কাজেই এই কষ্ট একমাত্র তাদের প্রাপ্য। সেইদিন আর কোন কথা তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে মন সায় দিলো না।
তবে আর একদিন অনেক কথা জানতে চেয়েছিলাম।
আচ্ছা কুসুম, ফুল বিক্রির টাকায়তে তোদের পেট চলে না। তার চেয়ে কোন বাসায় গিয়ে কাজের মেয়ে হিসাবে কাজ করিস না কেন ?
-করছিলাম স্যার। তয় ওইহানে আরও কষ্ট। খালি মারে। আমার ভাইডারে একেবারে সহ্য করবার পারে না। কয়, তোর ভাইডারে অন্য কোনহানে রাইখ্যা আয়। সারাদিন কাম করি। আর আমারে দুইডা খাওন দেয়,ভাইডারে কিছু দেয় না। আমি আমার খাওন ভাইডারে দিয়া দিতাম। অনেক সময় রাইতে আমি খালি একটু পানি খাইয়া ঘুমাইতাম। এই দেহেন স্যার- বলেই তার গায়ের শত ছিন্ন জামাটা একটু উঠিয়ে পিট দেখালো। দেখলাম ,শরীরের কোথাও এক তিল জায়গা খালি নেই শুধু নিষ্ঠুরতম আঘাতের চিন্হ ছাড়া। আঘাতে আঘাতে সমস্ত শরীর কেমন যেন কালো কালো দাগে ভরে গিয়েছে।
কুসুম জীবীকার তাগিদে আরও একটি কাজ করতো। কারণ ফুল বিক্রির টাকায় তেমন খাওয়া জুটতো না। রাজনৈতিক দলগুলো যখন হরতাল আহ্বান করতো,তখন তাকে দিয়ে ককটেল,বোমা ইত্যাদি বহন করাতো। পুলিশ তাদেরকে সন্দেহ করতো না, ছোট শিশু বলে। বিনিময়ে পাঁচ টাকা-দশ টাকা পারিশ্রমিক পেতো। ন্যায় কি অন্যায় সেটা কুসুমের বিবেকে খেলতো না। কুসুম ভাবতো, শিক্ষিত মানুষ বলছে ,তাই হাসি মুখে তা পালন করতো। ভাবতো নিশ্চয় কোন ভালো কাজ। বিনিময়ে কিছু টাকা পেতো। এই টাকাটা ছিল তার জন্য একটা বোনাস পাওনা। তাছাড়াও বলা হতো,বোমা ফাটালে পঞ্চাশ টাকা পাবি। রিক্সায় আগুন দিলে একশত টাকা, কারে আগুন দিলে দুশ টাকা,বাসে আগুন দিলে আরও বেশী বখশিস দেওয়া হবে। এমনি ভাবে প্রলোভন দেখানো হতো। মিছিলে গিয়ে শ্লোগান দিলে বিশ টাকা করে পেতো। ব্যানার ফেস্টুন বহন করা অথবা দেয়ালে পোস্টার লাগানো ইত্যাদিতে আরও কিছু বাড়তি আয় হতো। তবে পোস্টার উল্টো করে লাগালে কোন পয়সা তো পেতোই না, বরং জুটতো গালি। অনেক সময় মারপিটও হতো।
***************

ভাইটাকে অত্যন্ত স্নেহ করতো কুসুম। জীবনে আপন বলতে এখন সুরুজ। আপন বলতে এখন এই ভাই। তার জন্যই জীবন বাজি রেখে সে কাজ করে।

সে বছরে পূজা আসন্ন। প্রকৃতির সর্বত্রই তার আগমণী বার্তা বইছে। গাছে গাছে শেফালি ফুল ফোটতে দেখা যাচ্ছে। যদিও শহরে কালে-ভদ্রে দুএকটি মাত্র শেফালি গাছ চোখে পড়ে, কিন্তু গ্রামে গাছে গাছে শেফালী ফুল ফুটতে দেখা যাচ্ছে অনেক। ভোরে দুর্বা ঘাসের ডগায় দু’এক বিন্দু করে শিশির জমতে দেখা যায়। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা একপ্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে উড়ে উড়ে বুঝিবা পূজার বার্তাই প্রচার করছে। ভোরের দিকে সামান্য শীত শীত অনুভুত হয়। আমার স্ত্রী দীর্ঘ একটি তালিকা ধরিয়ে দিয়ে বললো, এবারের পূজায় একবারেই যা না হলে নয়, তারই একটি লিস্ট তৈরি করলাম। পরে আরও কিছু মনে পড়লে তাও লিখে নিতে হবে। এখানে বলে রাখা ভালো যে, প্রায় প্রতি বছরই কোন একটি সার্বজনীন দুর্গা পূজায় অংশ গ্রহন করে থাকি।

পূজায় সাধ্যমত কিছু খরচ করতে হয়। দুর্গাপূজা আমাদের মতো মধ্যবিত্ত লোকদের একার পক্ষে করা প্রায় অসম্ভব ব্যপার। তাই অন্য কোন পূজায় অংশ গ্রহন করি মাত্র। তাতে ছেলে-মেয়েরাও আনন্দ উপভোগ করে থাকে। সারা বছরের আনন্দ উৎসবের এটি একমাত্র উপলক্ষ্য। তার জন্য বিশাল অপেক্ষা। চাকুরীতে উৎসব বোনাস পেয়ে থাকি। সেটা পূজা উপলক্ষ্যে নয়,দুই ঈদে দুটি। সেই বোনাস আমাদেরকে একত্রেই পূজায় অথবা ঈদে প্রদান করা হয়। বোনাসের টাকা আবার সঞ্চয় করে রাখতে হয় পূজা পর্যন্ত, যে কাজটা খুব সহজ বলে আমি মনে করিনা। সঞ্চয় রাখাকে টাকা কামানোর চেয়েও বেশ কঠিন কাজ বলে আমার কাছে মনে হয়।

বাজারে যাবার পথে পকেট থেকে বের করে গিন্নীর দেওয়া ফর্দ খানাতে চোখ বুলাচ্ছিলাম। পূজার জন্য আতপ চাল,কলা, ধূপ,দ্বীপ, ঘৃত,মধু, লাড়ু-মোয়া তৈরীর উপকরণ,দধি,মিষ্টি, ফলমুল,পূজার জন্য শাড়ী,পুরোহিতের জন্য ধূতি গামছা এমনকি পূজার খরচের একাংশ, ইত্যাদি। এর সাথে যুক্ত হবে ছেলেমেয়ের নতুন জামা-কাপড়, নিজেদের জন্য কাপড় ,পরবর্তীতে মনে পড়লে যুক্ত হবে বাদ যাওয়া জিনিস ইত্যাদি । প্রতি বছরের অভ্যাস অনুযায়ী সেটা করতে অভ্যস্থ হয়েছি। এই সব কারণেই বোনাসের টাকাটা যত কষ্টই হোক জমা রাখতে হয়।
জমানো টাকার প্রায় সমস্তটাই সাথে করে নিয়ে চলেছি। বাজার করতে হবে। সাথে করে তালিকাটি নিয়েছি কিনা গিন্নী এসে পুনর্বার জিজ্ঞেস করে গেল। সহযাত্রী হয়েছে কন্যা শৈলী। তার জামা কিনতে হবে তারই পছন্দ মতো,তাই সাথী হয়েছে। আজকে আর অফিস নয়,স্কুলেও পাঠাবো না শৈলীকে। শুধুই পূজার বাজার নিয়ে সময় কাটাবো।

সেদিনও চলছিল হরতাল। বিরোধী দলের ডাকা হরতাল। ঢাকা শহরের আর এক দুর্ভোগের নাম হরতাল। কথায় কথায় হরতাল। যার সাথে নগরবাসী অতি অভ্যস্থ। গণতন্ত্র রক্ষা, দুর্নীতি অপসারণ, শান্তি আনয়ন ও জনহিতকর কাজের পূর্ব শর্ত হিসাবে এই হরতাল নাকি অত্যাবশ্যক। দোকানপাট বন্ধ। গাড়ি চলছে না। চুপি চুপি কেহ দোকান সামান্য খোলে রেখেছে, আবার হরতাল আহ্বানকারী লোকজন এসে বন্ধ করে দিচ্ছে। আবার খুলছে । এই ভাবে চলে হরতাল। কিন্তু আমার মার্কেটিংয়ে যাওয়া জরুরী । তাই আমাকে বের হতে হয়েছিল। রাস্তায় খন্ড খন্ড মিছিল চলছে। - ”চলবে না,চলবে না, জবাব চাই জবাব চাই “ ইত্যাদি শ্লোগান, যা প্রায় সব সময়েই ব্যবহৃত হয়।

মিছিলের ফাঁকে ফাঁকে রিক্সা নিয়ে চলছি। সেদিন যদিও গতিপথ পরিবর্তন করা যেতো, তবুও শৈলীকে আনন্দ দিতে বরাবরের রাস্তা ধরেই যাচ্ছি। কুসুমের অবস্থানের দিক দিয়েই যাচ্ছি। শৈলীর সেদিনও প্রশ্নবাণে আমাকে জর্জরিত করা বন্ধ ছিল না। তার মনে খুব আনন্দ। যেন-
” আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে”। হঠাৎ অনতি দুরে দেখা গেল বড় বেষ্ঠনি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একদল পুলিশ। বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পায়ের কাছে মাটিতে কি যেন একটা পড়ে আছে। এমন সময় আমার মেয়ের আর্তচীৎকার!! বাবা, এই দেখ!! ,এইযে কুসুম!! কাল বিলম্ব না করে চলন্ত রিক্সা থেকেই এক লাফ দিয়ে নেমে গেল সে। চলে গেল পুলিশের পায়ের কাছে পড়ে থাকা বস্তুটির দিকে। পুলিশ তাকে কাছে ভিড়তে দিতে রাজি ছিল না,তবুও আটকাতে পারে নি। নিকটে এসে নিশ্চিত হলাম, এটা কুসুমই বটে। তার রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে গেলো। রক্ত তখনও গড়িয়ে যাচ্ছে। দেখলাম হতভাগাদের রক্তও লাল। তাই রাজপথ লাল হয়েছে। মনে হলো অল্প কিছুক্ষণ পূর্বেই ঘটনাটি ঘটে গেছে। একটু আগেও এখানে মিছিল চলছিল। একটু দুর থেকে শ্লোগানের আওয়াজ, ককটেল বিষ্ফোরণ এবং গুলির শব্দ শোনেছি। হায়! শেষ হয়ে গেলো কুসুমের, সুরুজকে মানুষ করার স্বপ্ন। বোমার আঘাতে নাকি গুলাগুলিতে জীবন প্রদীপ নিভে গেলো কুসুমের ? প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই কেন ঝড়ে গেল কুসুম ? এভাবেই কত কুসম যে অকালে ঝড়ে যায় কে তার খোঁজ রাখে। এই কুসুমরা কোনদিন কোন পূজায় লাগে না , না হয় মালা গাঁথার উপকরণ। গন্ধহীন, বর্ণহীন ওরা। কানে বাজতে থাকলো একটি গানের দুটি কলি-”এই পৃথিবীর পরে, কত ফুল ফোটে আর ঝড়ে,সে কথা কি কোন দিন, কখনো কারো মনে পড়ে”।

পুলিশ খুব তৎপর। বলছে লাশের পোস্টমর্টেম হবে,কারণ উদঘাটন করতে হবে। বোমার আঘাতে নাকি গুলিতে শিশুটির মৃত্যূ হলো ,সব উদঘাটন করা হবে। থানায় মোকদ্দমা হবে ইত্যাদি। সাংবাদিকদেরকেও তৎপর হতে দেখা গেলো। হয়তো খবর হবে,অনেক ছবি সংবাদ মাধ্যমে আসবে। জীবনে কোন দিন যার একটি ছবি উঠেনি, আজ তার ছবি আসবে পত্রিকায়। শিরোনাম হবে কুসুম।
দূরে রাজনৈতিক দল মিছিল করছে। প্রত্যেকেই শ্লোগান দিচ্ছে, “ আমাদের কর্মী মরলো কেন ? –জবাব চাই ,জবাব চাই। কার কর্মী ঠাহর করা গেলো না। রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকেই লাশ নিয়ে মিছিল করতে চেষ্টা করলো। কিন্তু পুলিশ বাধা দেয়, আর তাতে ব্যাপক সংঘর্ষও হয়।

হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, বেশ একটু দুরে সুরুজ। খুব ছটফট করছে আর এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। মুখে কোন কথা নেই। একেবারে বোবা হয়ে গিয়েছে। শুধু কবুতরের মতো কাঁপছে। শেষ আশ্রয় টুকুও হারিয়ে ফেলেছে সে। হয়তো ভাবছে, কোনও অপরাধে তাকেও হয়তো জড়িত করা হতে পারে।
শৈলী বলতে লাগলো- বাবা আমার পূজার জামা লাগবে না। সুরুজকে টাকাগুলো দিয়ে দাও। কিন্তু সুরুজ তো টাকা রাখা বা খরচ করারও কোন সামর্থ রাখে না। শৈলীর এই কথা শোনে আমার কান্না এসেছিল বটে, বহু কষ্টে তা সংবরণ করেছি। কেউ দেখে ফেললে বলে বসবে, ”শহরে কি নতুন আইছে নাহি” ? সত্যিই তো এই শহরে চোখের সামনে কত মৃত্যু দেখলাম। সেলিম,দেলোয়ার,তাজুল, রাওফুন বসুনিয়া, নুর হোসেন, ডাঃ মিলন আরও কত নাম। দেখলাম বীভৎস একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, কত মৃত্যু! দেখেছি শাহবাগের মোরে একটি চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা দিয়ে আগুন। একেবারে ১০/১২ জন যাত্রী পুরে কয়লা হবার দৃশ্য। দেখেছি থামানো একটি ট্রাকে ঘুমন্ত ড্রাইভার ও তার হেলপারকে পুড়ে ভষ্ম করে দেবার ঘটনা। দেখলাম পল্টন ময়দানে বাম দলের জনসভায় বোমা বিষ্ফোরণ,দেখেছি রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের জমায়েতে বোমা মেরে ৮/১০ জন লোককে একটি মাত্র মাংসপিণ্ড করে নিথর করে ফেলতে। নিজের চোখেইতো সব দেখেছি। শরৎবাবু বেঁচে থাকলে হয়তো এবারও বলতেন, “ হে ভগবান! এই চোখ-দুটি যেমন তুমিই দিয়াছিলে, আজ তুমিই তাদের সার্থক করিলে” ।

কে জানে,সবই হয়তো বৃহত্তর সার্থে এবং জনহিতকর কাজের জন্যই করা হয়ে থাকবে। এই শহরে কে কার খবর রাখে। কিছু মরে রাজনৈতিক কারনে ,কিছু বা মরে দুর্ঘটনায়। শত্রুর অস্ত্রের আঘাতেও মরে অনেকে। কাজেই শোক করে ‍কি হবে?

আমারও ইচ্ছা জেগেছিল , সাথে থাকা কয়টা টাকা ওদেরকে দিয়ে দেই। মায়ের পূজার জন্য রাখা সঞ্চয় মানুষের পূজায় লাগিয়ে দেই। কিন্তু কাকে দিব? কুসুমকে কোন দিনই কোন টাকা দিতে পারিনি। তার আত্মসম্মান বোধ ছিল প্রখর। আজও পারিনি। আজ সে সকল লেন-দেনের উর্ধে। তার কাছে পরাজিত হলাম। রিক্সাটি ফিরিয়ে নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। ভাবতে থাকলাম, সুরুজ হয়তো বেঁচে থাকবে, হয়তো মধ্য গগনে একদিন আলোও ছড়াবে। হয়তো কুসুমের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রকৃত মানুষ হবে। হয়তো কিছুই হবে না। তবে তার অপরাধ জগতের একজন সম্রাট হয়ে আবির্ভুত হবার সম্ভাবনাই বেশী। কি হয়েছিল,আমরা তা জানিনা।
************

বাংলাদেশ সময়: ১০:০৮:১১   ৪৫ বার পঠিত   #  #  #  #




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

সাহিত্য’র আরও খবর


ফারহানা আকতার এর কলাম : নতুন প্রজণ্মের চোখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্ব- ৪৪
নূরুল ইসলাম বিপিএম এর কবিতা ‘মহাবিশ্বপ্রেমিক যুগল’
ইমাম শিকদারের কবিতা ‘জীবনটা অনেক ছোট’
ফারহানা আকতার এর কলাম : নতুন প্রজণ্মের চোখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ; পর্ব- ৪৩ :
বউয়ের নেশা
ফারহানা আকতার এর কলাম –“ নতুন প্রজণ্মের চোখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ –পর্ব- ৪২”
কুসুম: স্বপন চক্রবর্তী
কুসুম: পর্ব-৫: স্বপন চক্রবর্তী
কুসুম: পর্ব-৪ -স্বপন চক্রবর্তী
ফারহানা আকতার এর কলাম –“ নতুন প্রজণ্মের চোখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ –পর্ব- ৪১”

আর্কাইভ

16. HOMEPAGE - Archive Bottom Advertisement