
*আমার দেখা বই মেলা*
আমি আশির দশকের প্রায় প্রথম থেকে এই বই মেলার প্রতি আসক্ত একজন ক্ষুদ্র পাঠক ও মেলা প্রেমি। বই মেলার একটা আকর্ষণ আমাকে দারুণ ভাবে পেয়ে বসে। তখন থাকি ঢাকার চকবাজারের পার্শ্বে ৯ নাম্বার দেবীদাস ঘাট লেনের বাসায়। পাশেই অফিস। মেসের জীবন। বিকেলে মেসে গিয়ে কোন কাজ নেই। তাই মেলায় যাওয়া। তবে এটা শুধু যে বিনোদন এবং সময় কাটানোর জন্য ছিল তা নয়। মেলার প্রতি আকৃষ্ট হবার বিভিন্ন কারণ ছিল। এতো আনন্দ এতো লোকের সমাগম যে বলে শেষ করা যাবে না। নানান বয়েসী মানুষ, বৃদ্ধ যুবা, শিশু কিশোর সবার উপস্থিতিতে জমে উঠতো মেলা। নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইনশৃংখলা বাহিনীর হুসেল, বাঁশির শব্দ কানে তালা লেগে যেতো। অপ্রশস্ত গেট দিয়ে হুমরি খেয়ে পড়া মানুষের চাপে প্রাণ ওষ্ঠাগত হবার উপক্রম হতো। তবে ভিতরে ঢুকতে পারলে সমস্যা কমে যেতো, একটু খোলা জায়গা ছিল। তখন ভালো লাগতো। বিকেলের দিকে ভীড় হতো প্রচুর।
তখন শুধু মাত্র বাংলা একাডেমির চার দেয়ালের ভিতরে সীমাব্ধ ছিল মেলা। কিন্তু লোক হতো প্রচুর, উপচে পড়া। তারপর ভিতরে গেলে বিখ্যাত সব শিল্পীদের দেখা পাওয়া যেতো। বটতলায় চলতো গানের আসর। শিল্পী ফকির আলমগীর, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, সুবীর নন্দী, বিপুল ভট্টাচার্য, রথীন্দ্রনাথ রায়, মলয় গাঙ্গুলী, মমতাজ বেগম, আব্দুর রহমান বয়াতী, ফাতেমা-তুজ- জোহরা, কাদেরী কিবরিয়া, সাদী মোহাম্মদ প্রভৃতি ছাড়াও বহু বাউল শিল্পী, আধুনিক গানের শিল্পী, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী, রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী, পুরনো দিনের গানের শিল্পী সবার উপস্থিতিতে মেলার একটা আনন্দ ঘন পরিবেশ চলতো। উঠে আসার ইচ্ছে হতো না। এভাবে রাত প্রায় দশটাও বেজে যেতো। পালাক্রমে শিল্পীদের জন্য স্টেজ বরাদ্ধ হতো অথবা ভিন্ন কোন ষ্টেজে তাঁরা পাফরমেন্স করতেন। বইয়ের ষ্টল গুলোতে বসে থাকতেন নামী-দামী লেখকগণ। থাকতেন সৈয়দ শামসুল হক, কবি শামসুর রাহমান, কবি আল মাহমুদ, আহমেদ ছফা, আকতারুজ্জামান ইলিয়াশ, হুমায়ুন আহমেদ, নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ুন আজাদ, রফিক আজাদ, শাহরিয়ার কবির, আমজাদ হোসেন, প্রমূখ। থাকতেন অভিনয় শিল্পী, নৃত্যশিল্পী, আরও অনেকে। টিভি ব্যক্তিত্বগণও সময়ে সময়ে উপস্থিত থাকতেন। বই মেলার উদ্বোধন করতেন প্রধানমন্ত্রী অথবা সরকার প্রধান। ড. আনিসুজ্জামান, শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার প্রমূখ উপস্থিত থাকতেন। মোট কথা বিখ্যাত সব গুণীদের একটা আড্ডা থাকতো মেলায়। বই কিনলে তাতে অটোগ্রাফ মিলতো লেখকগনের। তারপর আলোচনা চলতে থাকতো নির্ধারিত প্যান্ডেলে। তবুও মনে হতো অনুষ্ঠান শেষ না করে বাসায় ফেরা ঠিক না। তারপর সমস্যা দেখা দিতো কোন অনুষ্ঠান উপভোগ করবো তা নিয়ে। একই সাথে অনুষ্ঠান হতো বিভিন্ন জায়গায়। দেখা হতো অনেকের সাথে। আলাপ হতো বিস্তর। তবে মোবাইল ফোনের কোন ব্যবস্থা তখনও হয়নি, তাই অন্যদের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে কালেভদ্রে মেলাতে দেখা মিলতো। এখন যেমন দশ মিনিটের জন্য মোবাইল বিহীন জীবন চলে না, তখন কিন্তু তার অভাব কল্পনাতেও মনে হতো না। ছোট ছোট বাচ্চাদের কেহ হারিয়ে গেলে অফিস ভবনের মাইকে ঘোষণা দিয়ে প্রচার করা হতো। এমনি করেই চলে আসতো একুশে ফ্রেব্রুয়ারী। মহান শহীদ দিবস। সেদিন প্রভাত ফেরীতে যোগদানের জন্য সবাই নগ্ন পায়ে হেঁটে হেঁটে দীর্ঘ পথ পারি দিয়ে শহীদ মিনারের বেদীর কাছে পৌঁছে যেতাম। সেখানেও সুশৃংখল ভাবে লাইন ধরে এগিয়ে যেতে হতো। শহীদ মিনার তখন নিয়ন্ত্রিত হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকগন দ্বারা। দুপুরেই শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ হয়ে যেতো। কিন্তু কি যেন কি মোহে পড়ে বিকেলেও পৌঁছাতাম শহীদ মিনারে। তখন কোলাহল নেই, জনগনের উপস্থিতি নেই, শুধু শূন্য বেদী। আমাদের মতো জনাকয়েক মানুষ বিষন্ন মনে নিরবে চেয়ে চেয়ে তাকিয়ে দেখেছি শহীদ মিনারটি। তবে শূন্য বেদী থেকে ফুল ও ফুলের তোড়ার যে একটা সুগন্ধ নাকে এসে লাগতো, তা যেন আজও অম্লান আছে। যদিও ফুলগুলো সাথে সাথে সরিয়ে নেয়া হতো। মনে হতো যেন মন্দিরের দেবতা বিসর্জন দেয়ার পরও ফুল বেলপাতার যেমন একটা গন্ধ ভেসে আসে ঠিক সেই রকম। বই মেলাও তখন শেষ হয়ে যেতো। প্রথমে এক সপ্তাহ পরে একুশে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত চলতো মেলা। কিন্তু পরে বই ব্যবসায়ীদের আবেদন নিবেদনের কারণে সেটা ফেব্রুয়ারীর শেষ দিন পর্যন্ত অনুমতি পায়। তাও আবার কখনও কখনও সেটা বিশেষ অনুরোধে মার্চ মাসের দিকেও চলে যায়। সেটা অবশ্য বিশেষ কারণে হয়েছে। চেষ্টা করবো কিঞ্চিৎ সেসব একটু তুলে ধরতে। ( চলবে )