বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষা মিশনে ৪০ বছরের সাফল্য

Home Page » প্রথমপাতা » বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষা মিশনে ৪০ বছরের সাফল্য
রবিবার ● ১৮ জানুয়ারী ২০২৬


বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষা মিশনে ৪০ বছরের সাফল্য

সমরে আমরা শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা, দেশের তরে’ এই দীপ্ত স্লোগান বুকে ধারণ করে ১৯৭১ সালে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সময়ের পরিক্রমায় এখন জাতির আশা ও আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলো থেকে শুরু করে অদ্যাবধি প্রতিটি সংকটকালে দেশ ও জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে নির্ভীকভাবে এই বাহিনী।

শুধু যুদ্ধ কিংবা দুর্যোগে নয়, দেশের প্রগতি ও উন্নয়নেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নির্মাণ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে তাদের সুশৃঙ্খল কর্মপদ্ধতি ও পেশাদারত্ব নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে তাদের সহযোগিতা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, অবকাঠামো নির্মাণে দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সেনাবাহিনী নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো-তাদের সুদৃঢ় একতা ও সংগঠনিক কাঠামো।

এই বৈশিষ্ট্য কেবল দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাদের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাহসী ও নিবেদিতপ্রাণ সদস্যদের অবদান বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা, আর্তমানবতার সেবা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাদের পেশাদারত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ এক অনন্য বা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এই বাহিনী প্রতিনিয়তই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

এ কারণে সর্বশেষ ২৮ নভেম্বর ২০২৫ জাতিসংঘ বাংলাদেশ শান্তিরক্ষীদের ভূয়সী প্রশংসা করে তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘বিশ্বজুড়ে সাতটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ৫ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা ‘সার্ভিং ফর পিস’-এ কাজ করছেন। তাঁরা তাঁদের পরিবারকে পেছনে রেখে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের রক্ষা করার কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা এই সাহসী নারী ও পুরুষদের (বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী), তাঁদের সেবা এবং ত্যাগের জন্য ধন্যবাদ জানাই।’

জাতিসংঘের এই শুভেচ্ছা বা ধন্যবাদ বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের জন্য নতুন নয়, বরং আরও নানা গৌরবোজ্জ্বল সম্মাননা, সনদসহ নানা প্রাপ্তি রয়েছে। এর পেছনের কারণ হলো- জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন গোলযোগপূর্ণ দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, সিভিল মিলিটারি কো-অপারেশন (সিমিক) কার্যক্রম এবং স্থানীয় বেকার যুবকদের আত্মনির্ভরশীলতার প্রশিক্ষণসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে অবদান রেখে চলেছে, তাতে জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশ বা এই বাহিনী এক গৌরবের নাম। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন এবং বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মানেই উজ্জ্বল-অনন্য এক অধ্যায়।

মূলত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু একটি যুদ্ধবিদ্যায় প্রশিক্ষিত বাহিনীই নয়, এটি দেশ ও জাতির সেবায় নিবেদিত এক সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান। তাদের কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত, লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী এবং দেশপ্রেম অবিচল। দেশের প্রয়োজনে সর্বদা প্রস্তুত এই বাহিনী বাংলাদেশের গর্ব এবং ভবিষ্যতের অনুপ্রেরণা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জাতিসংঘ শান্তি মিশনে অংশগ্রহণের সূচনা ১৯৮৮ সালে, যখন ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষণ দলে যোগ দেন। একই বছর, নামিবিয়ায় জাতিসংঘ ট্রানজিশনাল কর্তৃপক্ষের (ইউএনটিএজি) অধীনে শান্তিরক্ষী প্রেরণের মাধ্যমে বিশ্ব শান্তিকল্পে বাংলাদেশের বৃহত্তর অংশগ্রহণের সূত্রপাত হয়। এরপর থেকে, আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এক বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১৯৯২ সালে কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘ ট্রানজিশনাল কর্তৃপক্ষের অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বৃহৎ দলের মোতায়েন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল। এই মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পেশাদারত্ব এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়, যা বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের আরও ব্যাপক অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত করে।

এর ধারাবাহিকতায়, ১৯৯৩-৯৪ সালে রুয়ান্ডা, সোমালিয়া ও বসনিয়ার মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বসনিয়ায় ফরাসি দলের প্রত্যাহারের পর, সেখানকার কঠিন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁদের দক্ষতা ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ পর্যন্ত চারটি মহাদেশের ৪০টি ভিন্ন এলাকায় ৫৬টি জাতিসংঘ শান্তি মিশনে অংশগ্রহণ করেছে, যা বিশ্ব শান্তির প্রতি তাদের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রমাণ। এই দীর্ঘ যাত্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৩৭ জনেরও বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী তাঁদের মূল্যবান অবদান রেখেছেন।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর ৩ হাজার ৪০ জনেরও বেশি নারী শান্তিরক্ষী বিভিন্ন মিশনে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা নারীর ক্ষমতায়ন ও শান্তি রক্ষায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং (বিপসট) নামে একটি বিশেষায়িত-আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে শান্তিরক্ষীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়, যেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যেতে হয়। এই প্রশিক্ষণ তাদের বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম করে তোলে।

বর্তমানে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, মালি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, দক্ষিণ সুদান, আবেই (সুদান), পশ্চিম সাহারা, ইয়েমেন ও লেবাননের মতো ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সক্রিয়ভাবে মোতায়েন রয়েছেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস কেবল বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদানই নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করেছে। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা তাদের পেশাদারত্ব, দৃঢ়তা, মানবিক আচরণ ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করেছেন। দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে চিকিৎসা সহায়তা প্রদান এবং স্থানীয় জনগণ ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার মাধ্যমে তারা শান্তি প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে সহায়ক ভূমিকা পলন করে।

বিশ্ব শান্তি ও মানবতা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই অসামান্য অবদান দেশের জন্য এক বিশেষ গর্বের বিষয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেছে। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন চলাকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাসদস্যরা বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা বহুমুখী প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। এর মধ্যে অন্যতম হলো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের বিপজ্জনক পরিবেশ, যেখানে অপ্রত্যাশিত হামলা ও বোমা বিস্ফোরণের ঝুঁকি সর্বদা বিদ্যমান থাকে।

ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন সংস্কৃতির স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ স্থাপন এবং তাদের আস্থা অর্জন করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব, যেমন-ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ শান্তিরক্ষীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা এবং তাদের ভিন্ন কর্মপদ্ধতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়াও একটি জটিল প্রক্রিয়া। সামগ্রিকভাবে এসব অসুবিধা মোকাবিলা করেই বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা বিশ্ব শান্তিরক্ষায় তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

দীর্ঘ চার দশকের শান্তিরক্ষার ইতিহাসে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও স্থানে জাতিসংঘ মিশন সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সর্বমোট ১৬৮ জন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন। এই চলতি বছর দুইজন আহত শান্তিরক্ষীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।

১৯৮৯ সালে নামিবিয়া মিশনে কর্মরত অবস্থায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফয়জুল করিম উইন্ডহোক নামক স্থানে মারা যান। মূলত তিনিই ছিলেন বিদেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে প্রথম শহীদ বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তা। এ ছাড়া ২০০৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বেনিনে এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের ১৫ জন শান্তিরক্ষী সেনা শাহাদাতবরণ করেন।

পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে কঙ্গোতে আরও ৯ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা বরাবরই দুঃসাহসিকতার সঙ্গে স্থানীয় জনসাধারণের জানমাল রক্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সামনে এগিয়ে গেছে। গুপ্ত মাইন বা অতর্কিত সশস্ত্র হামলার পদে পদে শঙ্কা নিয়েও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এ কারণে এখন পর্যন্ত শান্তিরক্ষা মিশনে শহীদদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শান্তিরক্ষী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য।

দীপ্ত পদক্ষেপ, মানবিক দায়িত্ববোধ ও উচ্চ পেশাদারত্বের কারণে বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অসামান্য অবদানকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলস্বরূপ বাংলাদেশের অনেক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের উচ্চ পদে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্তব্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাফল্য ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘বিবিসি’ বাংলাদেশকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর ‘মজ্জা’ বা মূল অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিভিন্ন ধরনের অপারেশন পরিচালনা করে থাকে, যার মূল লক্ষ্য হলো শান্তি প্রতিষ্ঠা ও শান্তি রক্ষা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। এটি সবচেয়ে পরিচিত শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, যেখানে সশস্ত্র শান্তিরক্ষীরা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় জাতিসংঘের ম্যান্ডেট অনুযায়ী মোতায়েন হন। তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে থাকে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, অস্ত্র সমর্পণ পর্যবেক্ষণ, মানবতাবাদী সহায়তা প্রদান এবং শান্তি প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নে সহায়তা করা।

কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা, সোমালিয়া, বসনিয়া, কঙ্গো, মালি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, দক্ষিণ সুদানসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশাল কন্টিনজেন্ট এ ধরনের অপারেশনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা তাদের পেশাদারত্ব ও মানবিক আচরণের জন্য বিশেষভাবে প্রশংসিত।

সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ল্যান্ডমাইন ও অন্যান্য বিস্ফোরক দ্রব্য নিষ্ক্রিয় করা এই অপারেশনের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এর মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকদের জীবন রক্ষা করা এবং নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষিত প্রকৌশলীরা বিভিন্ন মিশনে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মাইন অপসারণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন এবং বহু মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন।

এ ছাড়া সংঘাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা প্রদান করা এই অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য। অনেক সময় শান্তিরক্ষীরা আটকে পড়া বা বিপদগ্রস্ত মানুষকে উদ্ধারকাজেও অংশ নেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা বিভিন্ন মিশনে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান, খাদ্য ও পানীয়জলের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগকালীন সহায়তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এই কার্যক্রমে সামরিক শান্তিরক্ষীরা স্থানীয় পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করে এবং নিরাপত্তা সেক্টরের সংস্কারে ভূমিকা রাখে।

পাশাপাশি সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতিতে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনে সহায়তা করা, নির্বচনি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন মিশনে এ ধরনের কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ রয়েছে, যা শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অসংখ্য পুরস্কার ও স্বীকৃতি লাভ করেছে, যা তাদের অসামান্য অবদান ও পেশাদারত্বের সাক্ষ্য বহন করে।

জাতিসংঘের বিশেষ মেডেল (ইউএন মেডেল), এটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অসামান্য অবদান, সাহস ও কর্তব্যনিষ্ঠার জন্য ব্যক্তিগত ও দলগতভাবে প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বহু সদস্য বিভিন্ন মিশনে এই মেডেল লাভ করেছেন। জাতিসংঘের প্রশংসাপত্র বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা প্রায়শই তাঁদের মানবিক কার্যক্রম ও পেশাদারত্বের জন্য এই প্রশংসাপত্র অর্জন করেছেন।

‘ড্যাগ হামারশোল্ড মেডেল’ শান্তিরক্ষা মিশনে জীবন উৎসর্গকারী শান্তিরক্ষীদের মরণোত্তর এই পদক দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

জাতিসংঘের ফোর্স কমান্ডারের প্রশংসায় বিভিন্ন মিশনের ফোর্স কমান্ডাররা বাংলাদেশি কন্টিনজেন্টের কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্কের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশংসা করেছেন। এর কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকা না থাকলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। এ ছাড়াও মিশন এলাকায় স্থানীয় জনগণের কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা কোনো আনুষ্ঠানিক পুরস্কার না হলেও স্থানীয় জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসা বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের একটি বড় অর্জন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রশংসা বিবিসি ছাড়াও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মানবিক কার্যক্রম ও পেশাদারত্বের প্রশংসা করেছে।

এভাবেই পেশাদারত্বের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে। নিজেদের দক্ষতা ও পেশাদারির ছাপ রেখে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘ শান্তি মিশনের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৪:৫০:৩৭ ● ৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ