
আমার দেখা বই মেলা-৬
২০০৮ সালে প্রকাশকের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির কারণে বই মেলাটিকে বাংলা একাডেমির পাশাপাশি সন্নিকটের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারিত করা হয়।
২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী বিজ্ঞান মনষ্ক লেখক অভিজিৎ রায়কে বই মেলা থেকে ফেরার পথে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সঙ্গে তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকেও মারাত্মক ভাবে আহত করা হয়। বন্যা নিজেও একজন ভালো লেখক। তারা দুজনেই আমেরিকার নাগরিক। অভিজিতের কয়েটি বই , “ আলো হাতে চলিয়াছি আঁধারের যাত্রী”, মহা বিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে,স্বতন্ত্র ভাবনা,মুক্ত চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি, একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ –মনস্তাত্বিক অনুসন্ধান, অবিশ্বাসের দর্শন, বিশ্বাস ও বিজ্ঞান, ভালোবাসা কারে কয়, শূন্য থেকে মহাবিশ্ব, বিশ্বাসের ভাইরাস এবং ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, এক রবি, বিদেশিনীর খোঁজে। অভিজিৎ রায় বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত মার্কিন নাগরিক ও লেখক। রাফিদা আহমেদ বন্যার একটি বই “ বিবর্তনের পথ ধরে”- যা বিবর্তনবাদ নিয়ে লেখা একটি জনপ্রিয় বই।
২০২১ সালে একুশে বই মেলা কোভিড-১৯ সঙ্কটে পড়ে। সেবছর বই মেলা ফেব্রুয়ারীর পরিবর্তে মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বই মেলায় দর্শক উপস্থিতি ছিল খুব কম এবং প্রকাশকের অংশগ্রহনও ছিল কম। ফলে মেলাটি হয়েছিল সংক্ষিপ্ত।
২০২২ সালে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ অনেক বেড়ে যায়। ফলে বইমেলাটি আর ফেব্রুয়ারীর প্রথম দিন থেকে শুরু করার সাহস হয়নি। মেলাটি শুরু হয়েছিল ১৫ ফেব্রুয়ারী এবং ১৭ মার্চ পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে ছিল।
২০২৪ সালের বই মেলা মার্চ মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত চলেছিল। মেলায় মোট ৩,৭৫১টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল। সে বছর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কাল্পনিক বই বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। আয়োজকরা ৬৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে ১৩৭টি স্টল বরাদ্দ করেছিলেন। সমাপনী অনুষ্ঠানে একটি পুরষ্কার বিতরণী পর্বও ছিল।
২০২৫ সালের বই মেলা যথসময়ে শুরু হয়েছিল। মেলাটি উদ্বোধন করে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রতিপাদ্য ছিল “ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ” । এ বছর বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অংশ নিয়েছিল ৭০৮ টি প্রতিষ্ঠান। বরাদ্দ হয়েছিল ১০৮৪ ইউনিটের স্টল, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি ছিল। বই মেলায় নতুন বইয়ের সংখ্যা এসেছিল ৩,২৯৯টি।
একই বছরে ১০ ফেব্রুয়ারী, নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ইসলাম বিদ্বেষী বই বিক্রয়ের অভিযোগে সব্যসাচী প্রকাশনীর স্টলে কতিপয় জনতা উপস্থিত হয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ফলে স্টলটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তওহীদি জনতার পরিচয়ে ঘটনাটি ঘটেছিল। তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন বলে জানিয়ে ছিলেন।
বই মেলা সম্পর্কে আমার এতো কিছু লিখার উদ্দেশ্য একটাই, দেখাতে চেয়েছি যে এই ইন্টারনেট, গুগল, মোবাইল, ইউটিউব,টুইটার, টিকটকের যুগে এসেও বই মেলার আকর্ষণ কমেনি মোটেও। বরং ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ক্রম সম্প্রসারণশীল বই মেলা থেকে অনুমান করা যায় যে, বই পড়ার প্রতি পাঠকের চাহিদা কমেনি বরং বেড়েই চলেছে। তাই রঙলেপার পাঠকদের হতাশ হবার কোন কারণ দেখছি না। বরং আশান্বিত হওয়া যায়। হ্যাঁ, তবে অনেকে হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, মেলার কলেবর বৃদ্ধির কারণ বইয়ের প্রতি আকর্ষণ নয়, মেলায় বিনোদনের জন্য এমন বিকাশ ঘটে চলেছে। তাহলে আসুন একটু দেখি মানুষ বই কেনার প্রতি নিষ্পৃহ কিনা।
ক্রমবর্ধমান বই বিক্রি ও প্রকাশনা-যা পত্রপত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে-
• ২০০৮ সালে বই বিক্রয় হয়েছিল প্রায় ২০০ মিলিয়ন টাকা, যা আগেই উল্লেখ করেছি। আর বই প্রকাশিত হয়ে ছিল রেকর্ড সংখ্যক, ২৫৭৮ টি।
• ২০১৩ সালে ১০ কোটি ১৪ লক্ষ টাকা।
• ২০১৪ সারে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা।
• ২০১৫ সারে ২১ কোটি ৯৫ লক্ষ টাকা।
• ২০১৬ সালে ৪০কোটি ৫০ লক্ষ টাকা।
• ২০১৭ সালে ৬৫ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে ৩ হাজার ৬৬৬টি।
• ২০১৮ সালে বই বিক্রি হয়েছে মোট ৭০ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে ৪ হাজার ৫৯১ টি।
• ২০১৯ সালে মেলায় বই বিক্রি হয়েছে ৮০ কোটি টাকা।
• ২০২০ সালে মেলায় বই বিক্রি হয়েছে ৮২ কোটি টাকা।
• ২০২১ সালে বই বিক্রি হয় ৩ কোটি ১১ লক্ষ টাকা। মহামারির কারনে বিক্রয় কমে যায়।
• ২০২২ সালে বই বিক্রয় হয় মোট ৫২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। নতুন বিই প্রকাশিত হয়েছিল ৩,৪১৬ টি।
• ২০২৩ সারে মেলায় বই বিক্রয় হয়েছিল ৪৭ কোটি টাকা। নতুন বই এসেছিল ৩,৭৩০টি।
• ২০২৪ সালে মেলায় বই বিক্রয় হয়েছিল ৬০ কোটি টাকা। নতুন বই এসেছিল ৩৭৫১ টি।
উপরোক্ত পর্যালোচনা এটাই প্রমাণ করে যে মলাটবন্দি বইয়ের প্রতি পাঠকদের চাহিদা হ্রাস পায়নি এতোটুকুও।
( চলবে )