মঙ্গলবার ● ৩১ মার্চ ২০২৬

রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২১ স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২১ স্বপন চক্রবর্তী
মঙ্গলবার ● ৩১ মার্চ ২০২৬


স্বপন কুমার চক্রবর্তী  বই পড়া নিয়ে বহু উপদেশ পাওয়া যায়। সেই ছেলেবেলা থেকেই শুনতে শুনতে এটাকে এখন আর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। যেমন- বই পড়ুন, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না, প্রিয়জনকে বই উপহার দিন অথবা বই হলো বিশ্বস্ত বন্ধু ইত্যাদি। আমিও আবার উল্লেখ করছি। কিন্তু এবারও পুরাতন কথা বলেই মনে হবে। মানুষকে বই পড়তে আগ্রহ করতে মানুষের কি প্রানান্তকর প্রচেষ্টা। তবুও বই পড়ুক লোকেরা। কিন্তু সবক্ষেত্রে যে বই পড়তে উৎসাহিত করতে হয় তাও নয়। অনেক ক্ষেত্রে বিপরীত প্রকৃতিও বিরাজ করে। ছোটদের বেলায় দেখা যায় নিষিদ্ধ বই পড়তে বেশি আগ্রহী। পাঠ্যবই ছাড়া অন্য বই যখন নিষিদ্ধ তখন সেই নিষিদ্ধ বই পড়ার প্রতি খুব আগ্রহ দেখা দেয়। পাঠ্যবই পড়তে পড়তে ঘুম চলে আসে। রাজ্যের সকল ঘুম যেন এসে চেপে বসে। বিদ্যাসারেরও ঘুম চলে আসতো। তখন নাকি মাথার টিকির সাথে উপরে রশি বাঁধা থাকতো। ঘুমে টলে পড়তে থাকলে চুলে টান পড়তো। অনুরূপ ছোটদের বেলায়ও ঘুম থেকে রেহাই পেতে বহু পদক্ষেপ নেয়া হতো । কিন্তু ঘুমের আক্রমণ থেকে বাঁচা খুব কষ্টকর । রাত পোহালে পরীক্ষা, ঘুমালে স্বস্তি নেই। তাই বলা হতো চোখ মুখ ধোয়ে আবার পড়তে বসো। নইলে বলা হতো যে, চোখে সরিষার তৈল মেখে পড়তে বসো। তাতেও খুব একটা রকম ফের ঘটতো না। ঘুমরাজ আর পড়ুয়ার মধ্যে চলতো লড়াই। এরকম অবস্থাতে এবং অভিভাবকের কঠোর শাসনের মাঝেও পাঠ্য বইয়ের ভিতরে গুঁজে গল্পের বই পড়তে অনিহা লাগতো না। ঘুম তখন চলে যায় দুরে বহু দুরে। তার একটা আকর্ষণ ছিল আলাদা। আগের দিনে শরৎ কাহিনী পড়া অথবা চমৎকার সব গোয়েন্দা কাহিনী পড়া কোন সমস্যা সৃষ্টি করতো না। তখন ঘুম নয়, শুধুমাত্র অভিভাবক দেখলে মহা বিপত্তি ঘটে যেতো।

গোয়েন্দা কল্পকাহিনী বা গোয়েন্দা কাহিনী একটা বয়সে মানুষকে খুব আকৃষ্ট করে। যদিও বয়স্কদেরও যে আকর্ষণ করে না তা নয়। গোয়েন্দা কাহিনী হলো কল্পকাহিনী ও রহস্য কল্পকাহিনীর একটি উপশাখা। যেখানে সাধারনত একজন শৌখিন বা পেশাদার গোয়েন্দা কোনো অপরাধ বা খুনের ঘটনা তদন্ত করেন। কাহিনী হয় সাধারণত রহস্যপূর্ণ এবং প্রায়ই দুঃসাহসিক এবং একই সাথে রোমাঞ্চকর। তাই এসব গল্প সহজে সকলকে আকর্ষণ করে। সারা পৃথিবী ব্যাপী বহু বিখ্যাত সাহিত্যের মাঝে গোয়েন্দা কাহিনীর স্বকীয়তা আছে। জনপ্রিয়তার বিচারে গোয়েন্দা কাহিনী সবার উপরে। এগুলো মানুষকে আনন্দ দেয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সাধন করে। গোয়েন্দা গল্পের উল্লেখযোগ্য চরিত্রের মধ্যে বলা যায় শার্লক হোমস, ফেলুদা ইত্যাদি।

গোয়েন্দা কাহিনীর পুরনো দৃষ্টান্ত হলো ” তিনটি অ্যাপেল” আরব্য উপন্যাসের “ আলিফ লায়লা” । শেহেরজাদের বলা কাহিনীগুলোর গল্প। যে গল্পে আছে এক জেলে দজলা নদীতে একটি তালা বন্ধ ভারী সিন্দুক খুঁজে পায়। সে এটিকে বিক্রি করে দেয় আব্বাসী খলিফা হারুনুর রশীদের কাছে। সিন্দুক ভেঙ্গে পাওয়া যায় টুকরো টুকরো করে কাটা এক তরুণীর মরদেহ। হারুন তার উজির জাফর ইবনে ইয়াহিয়াকে নির্দেশ দেন অপরাধের তদন্ত করে তিন দিনের মধ্যে খুনিকে খুঁজে বের করতে, অন্যথায় জাফরের শিরশ্ছেদ করা হবে। গল্প এগিয়ে যাবার সাথে সাথে কাহিনী বিভিন্ন দিকে মোড় নেয়, সৃষ্টি হয় রোমাঞ্চের।

তবে ইংরেজি সাহিত্যে অনেক আগে থেকেই গোয়েন্দা উপন্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। প্রথম জনপ্রিয় গোয়েন্দা উপন্যাস The Murders in Rue Morgue , যেটি এডগার অ্যালান পো ১৮৪১ সালে রচনা করেছিলেন। এটিকেই পৃথিবীর প্রথম আধুনিক গোয়েন্দা গল্প হিসেবে গণ্য করা হয়। যাক সেকথা। মনে করিয়ে দিতে বাংলায় দুএকটি গোয়েন্দা চরিত্রর লেখক ও তার সূচনা উল্লেখ করতে চাই।

কিরীটি রায়-নীহাররঞ্জন- কালোভ্রমর।
জয়ন্ত-হেমেন্দ্রকুমার রায়-জয়ন্তকীর্তি
ফেলুদা- সত্যজিৎ রায়-ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি।
বিমল- হেমেন্দ্র কুমার রায়- যক্ষের ধন।
ব্যোমকেশ বক্সী-শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়- সত্যান্বেষী।
মিসির আলী-হুমায়ুন আহমেদ-দেবী।
এছাড়াও কাজী আনোয়ার হোসেন, বেগম রোমেনা আফাজ প্রমুখ লেখক বহু গোয়েন্দা কাহিনী লিখেছেন যা খুবই জনপ্রিয় ছিল। দস্যু বনহুর, কালোভ্রমর, কুয়াশা, এসব একদা পাঠ্য বইয়ের অন্তরালে লুকিয়ে লুকিয়ে বিস্তর পড়া হতো। কাজী আনোয়ার হেসেনের মাসুদ রানা সিরিজ পড়েনি এমন পাঠক বোধ হয় খুব কমই পাওয়া যাবে। বেগম রোমেনা আফাজও ছিলেন অনেক জনপ্রিয় একজন লেখিকা। তাঁর লেখা কিছু উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো কাগজের নৌকা,মোমের আলো, মায়ার সংসার,মধুমিতা, মাটির মানুষ, সিরিজ দস্যু বনহুর ইত্যাদি। রোমেনা আফাজ ২০১০ সালে মরনোত্তর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ”স্বাধীনতা পুরস্কার” লাভ করেছিলেন। ২০০৩ সালে তিনি মৃত্যুবরন করেন। তাঁর অন্যান্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে দেশের মেয়ে, জানি তুমি আসবে, রক্তে আঁকা ম্যাপ, মান্দিগোর বাড়ি,বিদগ্ধা জননী ইত্যাদি বহুল পঠিত পুস্তক।
যাহোক , পড়ার রকমফের অনেক আছে। তাদেরকে পড়তে অনীহা না বলে বরং ভিন্ন রুচির পাঠ্যাভ্যাস বলাই সমীচীন মনে করি। ( চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ২০:১৮:৩২ ● ৮৪ বার পঠিত