
তবে আগে উল্লেখ করেছি যে, কিছু কিছু বিদ্যুৎসাহীজন নিঃস্বার্থভাবে পরিশ্রম করে মানুষকে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন। তেমনই অন্যতম আর একজন হলেন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। “আলোকিত মানুষ চাই” শ্লোগান নিয়ে তিনি পাঠকদের পাঠাভ্যাসে উদ্বুদ্ধ করতে সচেষ্ট আছেন। তিনি ১৯৩১ সালে কোলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাবনা জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৫৭ সালে বাগেরহাটের প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। পরে ১৯৬০ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিী অর্জন করেন। আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ দেশের একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ। তিনি সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক এবং একজন প্রতিশ্রুতিশীল কবি। সে সময়ে একজন সমালোচক ও সাহিত্য সম্পাদক হিসাবেও তিনি যথেষ্ট অবদান রাখেন। তিনি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র নামক একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন যা তাঁর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কীর্তি। বিগত প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি তাঁর অন্যতম শ্লোগান “ আলোকিত মানুষ চাই” নিয়ে মানুষের মাঝে আলো বিতরণ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৭৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রটি। মানুষের দ্বার প্রান্তে তিনি বই পৌঁছে দিতে স্বক্রিয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এই বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র সম্পর্কে জনাব সায়ীদ বলেন, “ দেশের এই সার্বিক অবক্ষয় এবং সম্ভাবনাহীনতার ভেতর সীমিত সংখ্যায় হলেও যাতে শিক্ষিত ও উচ্চমূল্যবোধসম্পন্ন আত্মোৎসর্গিত এবং পরিপূর্ণ মানুষ বিকশিত হওয়ার পরিবেশ উপহার দেয়া যায়, সেই উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র গড়ে তুলতে চেষ্টা করছি। একজন মানুষ যাতে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অধ্যয়ন, মূল্যবোধের চর্চা এবং মানবসভ্যতার যা-কিছু শ্রেয় ও মহান তার ভিতর দিয়ে পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বসম্পন্ন হয়ে বেড়ে উঠতে পারে- আমরা এখানে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই। কাজেই আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রাণহীণ ,কৃত্রিম, গতানুগতিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সর্বাঙ্গীণ জীবন-পরিবেশ” ।
বাংলাদেশে পাঠাগারের অপ্রতুলতা অনুধাবন করে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ১৯৭৮ সালে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরী কার্যক্রম শুরু করে।
তিনি আরও বলেন- আমাদের দেশের ভালো লাইব্রেরী-ব্যবস্থা আজ প্রায় নেই বললেই চলে। লাব্রেরীগুলো সংখ্যায় দীন, এদের ব্যবস্থাপনা দুর্বলবইয়ের মান দুঃখজনক এবং পরিবেশ বিমর্ষ। ভালো বই বাড়িতে নিয়ে পড়ার সুযোগ পাঠকদের আজ নেই বললেই চলে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে জাতির মননশীলতা ও জ্ঞানতাত্বিক ভিত্তি কী করে মজবুত হবে? বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আমরা তাই দেশের প্রতিটি বাড়ির দোরগোড়ায় বই পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম ও পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি সারা দেশে গড়ে তোলা হয়েছে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরী। এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আদর্শ ও উদ্দেশ্য আশা করি বুঝতে অসুবিধা নেই। কত মহৎ উদ্দেশ্য লুক্কায়িত আছে এই একটি লাইব্রেরী স্থাপনে।
শুধু লাইব্রেীতে গিয়েই যে পড়তে হবে তেমনটি নয়। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরীও এর আওতায় রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন আকারের খুবই দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় রঙে রঙিন এবং বিভিন্ন আকার সম্বলিত সাতটি গাড়ি বই সজ্জিত করে প্রতি সপ্তাহে শহর ও গ্রাম এলাকার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বই বিতরন করে থাকে। এলাকাগুলো আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। গড়ে প্রায় ৪০টি এলাকায় গিয়ে সদস্যদের মধ্যে বই বিতরন করা হয়ে থাকে। গাড়িগুলোতে চার হাজার, ছয় হাজার, আট হাজার এগারো হাজার এবং সতেরো হাজার বই নিয়ে যাওয়া হয়। আধ ঘন্টা থেকে প্রায় দু’ঘন্টা পর্যন্ত সদস্যদের বিই দেওয়া-নেওয়া করা হয়। ১৯৯৯ সাল থেকে এই ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরী চালু করা হয়। প্রথমে দেশের বড় চারটি শহরে যথা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, ও রাজশাহীতে এই ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরীর কার্যক্রম সীমিত থাকলেও পরে ২০২২ সালে দেশের ৬৪টি জেলার মোট ৩০০টি উপজেলার ৩২০০ লোকালয়ে এই কার্যক্রম প্রসারিত করা হয়েছে। এই লাইব্রেরীগুলোর বর্তমান সদস্যসংখ্যা তিন লক্ষ তিরিশ হাজার। এই সংখ্যাটি অবশ্যই নগন্য বলা যায় না। তাই এই মহতী উদ্দ্যোগের উদ্দোক্তা জনাব আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের অবদান খুবই প্রশংসনীয় বলা যায়। তবে একটি ঘোড়াকে বেঁধে চাবুক মেরে নদীতে নিয়ে নামানো যায়, কিন্তু তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে জল খাওয়ানো যায় না।
আবার বলছি বই পড়াতে রকমফেরও আছে। একটি উদাহরণ দিতে চাই। এক শিক্ষক আপ্রাণ চেষ্টা করেন সত্যিকার ভাবে পড়া বুঝাতে এবং ক্লাসে তা আদায় করে নিতে। একদিন ক্লাসে ছাত্রদেরকে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে উত্তরটা জানতে চান। কিন্তু সবাই নিশ্চুপ। একবারে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এলো ক্লাসে। শিক্ষক হতাশ হলেন। তার শ্রম সব ব্যর্থ। কেহই উত্তর দিতে পারলো না। শিক্ষক এমন নিরাশ হলেন যে, দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বিষন্ন হয়ে বসে রইলেন। অবশেষে একজন ছাত্র হাত উঁচিয়ে বললো, আমি পারি স্যার। শিক্ষক মহোদয় প্রচন্ড খুশি হলেন। তার শ্রম যে বৃথা যায়নি, তিনি যে অন্তত ক্লাসে আলোচনা করেছেন, তা তো প্রমাণিত হলো। ছাত্রটিকে অনেক ধন্যবাদ জানালেন শিক্ষক মহোদয়। তারপর মনে মনে স্থির করলেন যে, এই উত্তর দাতা ছাত্রটিকে দিয়ে বাকি সব ছাত্রদের কান মলে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করবেন। অবশেষে ছাত্রটিকে উত্তরটি সকল ছাত্রকে শুনিয়ে বলে দিতে বললেন। ছাত্রটি অত্যন্ত গর্বের সাথে উত্তরটি বলে দিলো। স্যার উত্তর হচ্ছে –See Summary. শিক্ষক অগ্নিশর্মা হয়ে রেগে ফেটে পড়লেন, অত্যন্ত জোরে ধমক দিলেন। ছাত্রটি আবারও গর্বের সাথে বললো- আমি স্যার গাইড বই দেখে সারা রাতে মুখস্ত করে এসেছি স্যার। সে পড়েছে, পরিশ্রম করেছে, এবং সেই জন্যেই সে আত্মপ্রত্যয়ী। ( চলবে )