রবিবার ● ৫ এপ্রিল ২০২৬
এক-এগারো সরকারের সঙ্গে ইউনূস সরকারের যোগসূত্র
Home Page » জাতীয় » এক-এগারো সরকারের সঙ্গে ইউনূস সরকারের যোগসূত্র![]()
২০০৭ সালের এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিংবা সমর্থন জানিয়েছিলেন এমন বেশ কয়েকজন ব্যক্তি অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলেও ক্ষমতাবান ছিলেন। যাঁরা দুই অনির্বাচিত সরকারের আমলেই ক্ষমতার কাছাকাছি ছিলেন, তাঁদের লক্ষ্যও ছিল এক ও অভিন্ন-গণতন্ত্র ধ্বংস, অর্থনীতি বিদেশনির্ভর এবং দেশকে বিদেশি শক্তির তাঁবেদার করা। এক-এগারোর অধরা নীলনকশা বাস্তবায়নের জন্য এঁরা গত ১৮ মাসেও ষড়যন্ত্র করেছেন। এঁরাই হলেন এক-এগারো এবং বিদায়ি অন্তর্র্বর্তী সরকারের যোগসূত্র। বিদায়ি সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক- এগারোর অন্যতম সমর্থক ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই এক-এগারো সরকার গঠিত হওয়ার কথা ছিল। অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন এক-এগারোর সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। বিএনপি ভাঙার ক্ষেত্রে তিনিই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার বিএনপিকে অযৌক্তিকভাবে তিনিই বৈধতা দিতে চেয়েছিলেন। ২০০৮-এর নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ইউনূস সরকারের সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব। সেই সময়ও তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের নামে বিরাজনীতিকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এ ছাড়া সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ অন্তত সাতজন অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, যাঁরা এক-এগারোর সময় সক্রিয় ছিলেন। দুই সময়ই তাঁরা নির্বাচন ছাড়া দীর্ঘদিন সুশীল সরকারকে ক্ষমতায় রাখার চেষ্টা করেছেন। এক-এগারোর সময় মাইনাস ফর্মুলার জনক দুই সম্পাদক অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময়ও পাদপ্রদীপে ছিলেন। ইউনূস যখন পদত্যাগের নাটক করলেন, তখন এঁদের একজন ড. ইউনূস সরকারের জন্য রীতিমতো কান্নাকাটি করে কলাম লিখেছিলেন। এ দুই সুশীল সমাজের মুখপত্র দুটি সংবাদপত্র নির্বাচন না করে সংস্কারের পক্ষে ওকালতি করেছে গত দেড় বছর। ২০০৭ সালেও এ দুই সংবাদপত্র মাইনাস টু ফর্মুলার পক্ষে, ‘দুই নেত্রীকে সরে যেতেই হবে’ শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠায় সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা-ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালিয়ে এরা দেশ ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের পক্ষে একের পর এক অপপ্রচার চালায়। বিগত দেড় বছরও এরা রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই এক-এগারোর ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এক-এগারোর সময় সেনাবাহিনীতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এর ফলে ২০০৭ সালে সংঘটিত বিরাজনীতিকরণ ষড়যন্ত্রের বিচার হবে বলে জনগণ আশা করছে। এ বিচার দেশের গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যতে অবৈধ ক্ষমতা দখলের পথ বন্ধ করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এক-এগারো কেবল সেনাবাহিনীর একটি অংশের ষড়যন্ত্র ছিল না। এ ষড়যন্ত্রের মূল কুশীলব ছিল সুশীল সমাজের একটি গোষ্ঠী। এঁরাই এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর ক্ষমতা দখল করেন। সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য তাঁদের ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল। এক-এগারোর এসব সুশীল ষড়যন্ত্রকারীকে এখনো আইনের আওতায় আনা হয়নি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এক-এগারোর বিচার করতে হলে সুশীল সমাজের ভূমিকা তদন্ত করতেই হবে। কারা ছিলেন এক-এগারো ষড়যন্ত্রের মূল হোতা?
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতা দখলের আগে যাঁরা এ ধরনের একটি সরকারের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেছিলেন, যাঁরা এ সরকারের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন তাঁরা কারা? সে সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সুশীল সমাজের মুখপত্র দুটি সংবাদপত্র এবং সুশীল সমাজের একটি অংশ ও কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ এ দেশে দীর্ঘমেয়াদি অনির্বাচিত সরকার গঠনের পরিকল্পনা শুরু করেন। অনেকেই মনে করেন, এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্যই ২০০৬ সালে ড. ইউনূসকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাঁর আত্মজীবনী ‘মাই লাইফ’-এ বলেছেন, ইউনূস যেন নোবেল পুরস্কার পান সেজন্য তিনি সুপারিশ করেছিলেন। স্মরণ করা যেতে পারে, দেশিবিদেশি ষড়যন্ত্রে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত এবং সংঘাতপূর্ণ, ঠিক তখনই গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নোবেল পুরস্কার দিয়ে তাঁকে বাংলাদেশের জনগণের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা হয়। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর রাজনীতিমুখী হয়ে ওঠেন ড. ইউনূস। ‘নাগরিক শক্তি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। দল গঠনে জনমত গড়ে তোলার জন্য ইউনূস তিনটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। যার সব কটি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত হয়েছিল।
দেশের প্রধান দুটি দলের মুখোমুখি অবস্থানকে উসকে দিয়েছিল সুশীল সমাজের মুখপত্র সংবাদপত্র দুটি। রাজনৈতিক দলগুলো যেন কোনো অবস্থাতেই সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে সেজন্য একযোগে কাজ করে এ সংবাদপত্র দুটি এবং সুশীল সমাজের একটি অংশ। এভাবেই এক-এগারোর পটভূমি তৈরি করা হয়। এক-এগারো সরকারে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রথম পছন্দ ছিলেন ড. ইউনূস। সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের গ্রন্থে পাওয়া যায়, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হওয়ার জন্য ড. ইউনূসকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দুই বছর তাঁর লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট সময় নয়, এ যুক্তিতে তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তাঁর পরামর্শেই ফখরুদ্দীন আহমদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হয়েছিল। অর্থাৎ ২০০৭ সাল থেকেই ড. ইউনূসের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার আকাক্সক্ষা ছিল। এজন্য অন্তর্র্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়ে প্রথম ১০ মাস নির্বাচনের বিরুদ্ধে ছিলেন। জনগণের চাপে শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। যেমন লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছিলেন ফখরুদ্দীন সরকার, তেমন দেশ পরিচালনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ার পর ইউনূসকে আন্তর্জাতিক মুরুব্বিদের পরামর্শে এবং চাপে নির্বাচন দিতে হয়। ফখরুদ্দীন আহমদ সরকারের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কিন্তু তাঁদের দুই বছরের শাসনকালে বাংলাদেশ অন্তত ১০ বছর পিছিয়ে গেছে। এঁদের অসম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র আবার জাগরিত হয় অন্তর্র্বর্তী সরকার আমলে। দেড় বছরে অন্তর্র্বর্তী সরকারও দেশ পরিচালনার সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। ইউনূস সরকারও বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিয়েছে আরও ২০ বছর।
লক্ষ করলে দেখা যায়, অন্তর্র্বর্তী সরকারের ভিতরে যাঁরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছিলেন, তাঁরা সবাই এক-এগারোরও কুশীলব ছিলেন। নির্বাচন নয়, আগে সংস্কার; জনগণ চায় আমরা আরও ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকি; শুধু নির্বাচন দেওয়ার জন্য আমরা ক্ষমতায় বসিনি-এ কথাগুলো যাঁরা দেড় বছর বলেছেন, তাঁরা সবাই এক-এগারোর সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। এক-এগারোর লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাঁরা এবারও চেষ্টা করেছিলেন। এঁরা যদি আইনের আওতায় না আসেন তাহলে আবার গণতন্ত্রকে বিপদাপন্ন করার ষড়যন্ত্র করবেন। এঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার নিরাপদ নয়।
তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন
বাংলাদেশ সময়: ১০:১১:৪৪ ● ২১ বার পঠিত