বৃহস্পতিবার ● ২৩ এপ্রিল ২০২৬
লোডশেডিংএ বিপর্যস্ত জনজীবন
Home Page » জাতীয় » লোডশেডিংএ বিপর্যস্ত জনজীবন![]()
জ্বালানিসংকটের আঘাত এবার সরাসরি পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। গত বুধবার দিনের বেলায় চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। ঢাকায় পরিস্থিতি কিছুটা সামলানো গেলেও গ্রামাঞ্চলে দিনরাত মিলিয়ে ৮ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। তীব্র গরমে এই দীর্ঘ অন্ধকার এখন সাধারণ মানুষের জীবনে অসহনীয় দুর্ভোগ হয়ে উঠেছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, বুধবার দুপুর ১২টায় ১৫ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয় মাত্র ১৩ হাজার ৪০ মেগাওয়াট। বিকেল ৪টায় ঘাটতি ছিল প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট — যা চলতি বছরের মধ্যে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। অথচ গত বছরের একই দিনে লোডশেডিং ছিল মাত্র ১৫৭ মেগাওয়াট।
দেশে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে এর অর্ধেকও উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর ভারতীয় কোম্পানি আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই ইউনিটটি পুনরায় চালু হতে আরও তিন থেকে চার দিন লাগতে পারে। বিকল্প হিসেবে সিরাজগঞ্জ ও খুলনার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রেখে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া এখন ৪৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। শুধু বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পাওনাই সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত বলেন, “সরকারের কাছে গড়ে আট মাসের বকেয়া আটকে আছে। এই টাকা না পেলে জ্বালানি তেল আমদানি করা সম্ভব নয়। বর্তমানে মোট সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে, যা শিগগিরই ২০ শতাংশে নেমে আসতে পারে।” সে ক্ষেত্রে লোডশেডিং আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
জামালপুরের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। জেলায় ১৯৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ মেগাওয়াট — চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ ঘাটতি। মাদারগঞ্জের বাসিন্দা হৃদয় হাসান জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। এসএসসি পরীক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে মোমবাতি বা চার্জলাইটের আলোয় পড়ছে।
রংপুর বিভাগের আট জেলায় প্রতিদিন ৮৫০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৭২০ মেগাওয়াট। কোথাও কোথাও দিনে গড়ে মাত্র সাত-আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। নুরপুরের ঝালাই ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় ক্রেতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন তারা।
পাবনায় প্রায় এক মাস ধরে গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে।
রাঙামাটির কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রেও পরিস্থিতি সংকটাপন্ন। শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানি নেমে যাওয়ায় পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে চলছে মাত্র একটি। এই একটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট, যেখানে পাঁচটি ইউনিট মিলিয়ে সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা ২৪২ মেগাওয়াট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মে মাসে তাপপ্রবাহ তীব্র হলে বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই চাহিদা পূরণ করা কার্যত অসম্ভব। কৃষিতে সেচব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় বোরো ধানের ফলন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মাছের হ্যাচারিতে উৎপাদন কমে গেছে। গ্রামীণ শিল্পকারখানায় উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট একসঙ্গে জমাট বেঁধে যে চাপ তৈরি করছে, তার ভার এখন সবচেয়ে বেশি বহন করছে দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।
বাংলাদেশ সময়: ১০:১১:৪৫ ● ১০ বার পঠিত