শনিবার ● ১৬ মে ২০২৬

রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২৬: স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » বিবিধ » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২৬: স্বপন চক্রবর্তী
শনিবার ● ১৬ মে ২০২৬


স্বপন কুমার চক্রবর্তী  জ্ঞান পিপাসু ও বই প্রেমী মানুষের গল্প-২

( পূর্বে প্রকাশিতের পর )
আরজ আলী মাতুব্বরদের এক সময় সামান্য জমিজমা ছিল। স্থানীয় জমিদার তা নিলাম করে। তার পিতার মৃত্যু তাদেরকে নিদারুন কষ্টে ফেলে দেয়। তার মাকে তখন হাঁস-মুরগী পালন ছাড়াও ধাত্রীর কাজ করতে হতো। অন্যের বাসায় কাজ করতে হতো। তিনি লিখেছেন- “ আত্মীয় কুটুম্বরা কেহ কোনরূপ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন নি। দেখেছেন, অভাব গ্রস্থ ব্যক্তির নিকট হতে- “ আত্মীয় কুটুম্ব সব দূরে সরে যায় কেননা নিকটে পেলে যদি কিছু চায় “ কিন্তু আমাদের তুচ্ছ করে সরে যায়নি মাত্র দু’জন, তারা হ’ল উপবাস ও ছিন্নবাস” ।

তিনি দেখে এবং শুনে অনেক কিছু রপ্ত করে ছিলেন। এক সময় পুঁথিপাঠ, বয়াতী গান, কবি গান ইত্যাদি নিজে নিজেই শিখে ফেলেন। তিনি নিজে ১২২৭ সালে একটি পুঁথি গানের দল গঠন করে ছিলেন। পুঁথি গান প্রতিযোগিতার গান। শ্রোতাগণই বিচারক থাকেন।
তিনি লিখলেন,- “ দেশী ও বিদেশী অনেক বয়াতীর সহিত আমার পাল্লার (প্রতিযোগিতা ) গান হ’তে লাগল। এতে দেখা গেল যে, সব সময় তর্কযুদ্ধে জযী হ’তে হ’লে যে পরিমান শাস্ত্রজ্ঞান থাকা আবশ্যক, তা আমার নাই। কাজেই আমার আরো বেশী পরিমাণ পুস্তকাদি অধ্যয়ন করা আবশ্যক। তিনি পরে সংসার খরচ রাহা করেও কিছু পয়সা বাঁচিয়ে বই কিনতে শুরু করলেন। আলেপ-লায়লা, কাছাছোল আম্বিয়া, ফকির বিলাস, হযরতল ফেকা, তালে নামা, ছায়ত নামা, ইত্যাদি কতগুলো পুঁথি এবং একই সাথে রামায়ন, মহাভারত, মনসা মঙ্গল, গীতা, রাধাকৃষ্ণ বিলাস, ইত্যাদি কতগুলো হিন্দু শাস্ত্রও কিনে পড়তে লাগলেন। পরে আরও বই পেয়ে ছিলেন। তিনি লিখেছেন, “ রায় বাবুদের লামছড়ি তহশীল কাছাড়ীতে নীল কান্ত মুখার্জী নামক একজন মোহরার ছিলেন, নিবাস পান বাড়িয়া। তিনি ছিলেন হিন্দুশাস্ত্রে সুপন্ডিত। বিশেষতঃ সংস্কৃত ভাষা ভাল জানতেন। তাঁর সাথে আলাপ-ব্যবহারে তিনি আমার বেশ বন্ধু হয়ে গেলেন। আমি তাঁর কাছে হিন্দু শাস্ত্র সম্বন্ধে কিছু জানার ইচ্ছে প্রকাশ করলে তিনি আমাকে কয়েকখানা বৈদিক ও পৌরাণিক গ্রন্থ দান করেন এবং ঋক বেদের কিছু অংশ বঙ্গানুবাদ করে দেন। মনু সংহিতা নামক বৈদিক গ্রন্থখানা দান করেন আমাকে চর মোনাই নিবাসী বাবু যামিনী কান্ত বিশ্বাস” । এভাবেই চলছিল আরজ আলীর জ্ঞান সাধনা ও বই সংগ্রহের কাজ।

একদিন জনৈক আব্দুর রহীম মৃধা তার ছেলের শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে যাবেন। অত্যন্ত নামী দামী ও লোকের বাড়ি। বয়াতী গানের জন্য আরজ আলী আমন্ত্রিত হলেন। অত্যন্ত আত্ম সম্মান বোধ সম্পন্ন আরজ আলী সেখানে গিয়ে কিছুটা অবহেলিত হলেন। অপমানে তিনি বয়াতী গান ছেড়ে দিলেন। তার ভাষায় বিষয়টিকে তিনি নিজেই বর্ণনা করলেন। তিনি বলেন- “ তিনি তার কুটুম্ব ও সব জ্ঞাতি ভাইদের দাওয়াত করলেন এবং আমাকেও । অধিকন্তু আমাকে আমার গানের দোহারগণকে নিয়ে যেতে বল্লেন। তিনি যাবেন সেখানে “ পয়নামা” নিয়ে খুব ধুমধামের সহিত, সেখানে আমাকে গান করতে হবে। নির্দিষ্ট দিনে যথা সময়ে আমরা কাজী বাড়ী গেলাম এবং সবাই বৈঠকখানা ঘরে বসলাম। ঘরের মধ্যভাগটা –গের্দা, বালিশ তাকিয়া ইত্যাদি নানা উপকরনে সাজানো। মৃধা সা’ব ও আমার অন্যান্য জ্ঞাতি ভাইয়েরা ওখানেই বসলেন। কিন্তু আমাকে বসতে দেওয়া হ’ল বারান্দায়। কারন আমি “বয়াতী”। গান করলাম। বাড়িওয়ালা পুরস্কার দিলেন দশ টাকা। কথায় বলে “ যাক জান, থাক মান” । অর্থাৎ মানহানীর চেয়ে প্রাণহানী ভাল। আত্মমর্যাদায় আঘাত পেয়ে সেদিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম- বেঁচে থাকতে আর কখনো গান করবো না, চেষ্টা করে দেখব কোনা দিন মৃধা সা’বের পাশে বসতে পারি কিনা। তিনি আরও বলেন, চেষ্টায় সফলতা লাভ করেছিলাম তখন, যখন- ১৩৩৯ সালে চর বাড়ীয়া ইউনিয়ন বোর্ডের প্রথম পদে নির্বাচিত হলাম এবং ১৩৪৩ সালের নির্বাচনেও উভয়ে পুনঃ উহার সদস্য পদে নির্বাচিত হলাম। অধিকন্তু আমি হলাম নির্বাচিত সহ সভাপতি, মৃধা সা’ব নন। এতদ্ভিন্ন আমি তাঁর সামনেই সরকার কর্তৃক মনোনিত হয়েছিলাম ১৩৪৬ সালে স্থানীয় ডি এস বোর্ডের ”সদস্য” এবং ১৩৪৮ সালে চর বাড়ীয়া ইউনিয়ন জুট কমিটির সহ সভাপতি।” । ( চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ২০:৪৫:২৭ ● ২৭ বার পঠিত