
বড় কোনো ফলাফল বা আনুষ্ঠানিক সমঝোতা ছাড়াই চীন সফর শেষ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার বেইজিং থেকে দেশে ফিরেছেন তিনি। ইরান যুদ্ধ নিরসনে তাৎক্ষণিক কোনো অগ্রগতি না হলেও দুই পরাশক্তির সম্পর্কে নতুন করে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংঘাত নিরসনে বেইজিং এখন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
টানা দুই দিনের বৈঠকে ট্রাম্প ও শি জিনপিং ইরান যুদ্ধ, তাইওয়ান, বাণিজ্য, জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, দুই নেতা একমত হয়েছেন যে হরমুজ প্রণালি অবশ্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। পাল্টা চীনও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির সামরিকীকরণ এবং সেখানে টোল আরোপের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করবে বেইজিং।
ইরানের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক অংশীদার ও সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা হিসেবে চীন শুরু থেকেই যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে। ট্রাম্প ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, শি জিনপিং ইরান সংকট সমাধানে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং চীন ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভিন্ন কথা বলেছেন। তিনি এনবিসিকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের কাছে ইরান সংকট সমাধানে সহযোগিতা চায়নি।
এদিকে ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে চীনের যেকোনো কূটনৈতিক উদ্যোগকে ইরান স্বাগত জানাবে।”
ইরান প্রসঙ্গের পাশাপাশি তাইওয়ান ইস্যুতে দুই নেতার মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা গেছে। শি জিনপিং ট্রাম্পকে সরাসরি সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি দুই দেশের সম্পর্কের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়। চীনা বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই ইস্যু সঠিকভাবে না সামলালে সংঘাত এমনকি সরাসরি মুখোমুখি অবস্থাও তৈরি হতে পারে। তবে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, তাইওয়ান বিষয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
সফরের আগে ট্রাম্প বিশাল বাণিজ্যচুক্তির কথা বলেছিলেন। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দাবি করেছেন, আগামী তিন বছরে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, চীন ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনায় সম্মতি দিয়েছে। তবে এসব চুক্তির বিষয় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি বেইজিং।
রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও দুই নেতার ব্যক্তিগত উষ্ণতা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। গ্রেট হল অব দ্য পিপলে সামরিক ব্যান্ড ও জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে স্বাগত জানানো হয় ট্রাম্পকে। শি জিনপিং নিজে ঐতিহাসিক ঝংনানহাই কমপ্লেক্স ও উদ্যান ঘুরিয়ে দেখান।
ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, “এটি ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো পারস্পরিক সম্মান।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগই এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামানোর একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। বেইজিং সফর সেই পথে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে কিনা — সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।