রবিবার ● ১৭ মে ২০২৬

রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২৭ স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২৭ স্বপন চক্রবর্তী
রবিবার ● ১৭ মে ২০২৬


স্বপন কুমার চক্রবর্তী
জ্ঞান পিপাসু ও বই প্রেমী মানুষের গল্প-২
( পূর্বে প্রকাশিতের পর )
আরজ আলী মাতুব্বর অত্যন্ত আত্মসম্মানী এবং অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয়ী ব্যক্তি ছিলেন। উপরের উদ্ধৃতি সমূহ তাই প্রমাণ করে। শুধু মাত্র উক্ত পদগুলো তার জন্য যথেষ্ট উদাহরণ নয়। তার চেয়েও অনেক বেশি সম্মানের অধিকারী তিনি ছিলেন। সমাজের বিশিষ্ট্য ও লব্ধপ্রতিষ্ঠ অনেকেই তার সাথে দেখা করতে , দুটো কথা বলতে অনেক অপেক্ষা করতেন। কিন্তু আরজ আলী আসলে ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। নিজেকে কোন দিন জাহির করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তিনি তার আত্মজীবনী লিখে শিরোনাম দিয়েছেন “ ভিখারীর আত্মকাহিনী”। কবিতা সমগ্র লিখে খাতায় নাম দিয়ে ছিলেন “ সীজের ফুল “।
তিনি বলেন, “ কবিতাগুলো একত্র করে সাজিয়ে গুছিয়ে একখানা খাতায় লিখতে এক সময় আমার ইচ্ছে হল, লেখা শুরু করলাম এবং শেষ করলাম ১৩৪০ সালের ১৫ই চৈত্র তারিখে। খাতাটার নাম রাখলাম “ সীজের ফুল “। প্রকাশক এই সীজ ফুলের ব্যাখ্যা দিলেন এই ভাবে যে, সীজ একটি গাছের নাম। অঞ্চল বিশেষ উহাকে সেউজ গাছও বলা হয়। এ গাছটির চেহারা কদর্য, রস বিষাক্ত ; বিশেষত ; কখনো ফুল ধরে না, বলা যায় এটা একটা নির্গুণ উদ্ভিদ। লেখক নিজেকে ঐ গাছটির সহিত তুলনা করে তার রচিত কবিতা ( পদ্ম=ফূল ) গুলোর নাম রেখেছেন “ সীজের ফুল” । অর্থাৎ নির্গুণীয় কবিতা।
জনৈক ফজলুর রহমানকে পান্ডুলিপি খানার ভ্রমাদি সংশোধনের জন্য দিয়ে ছিলেন মাতুব্বর সাহেব। কিন্তু সেখান থেকে জনৈক মোঃ কোব্বাত আলী মিঞা চেয়ে নিয়ে পান্ডু লিপি খানা আর ফেরৎ দেননি।
তার কবিতার মানও ছিল বেশ উন্নত। আবার তিনি তার পুস্তক আকারে সব লেখা প্রকাশের জন্য নয়, লিখে রেখেছেন নিজের জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে। তারপর অন্যরা তার লেখা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে ঢাকাস্থ লালমাটিয়ার জনৈক আইয়ুব হোসেন আরজ আলী সম্পর্কে যথার্থ লিখেছেন যে, কলের লাঙ্গল, কলের নৌকা, ( কেরসিন চালিত) ইত্যাদিও তৈরী করেছেন তিনি। বৈজ্ঞানিক অনেক খুঁটিনাটি পরীক্ষা-নিরিক্ষা চালিয়েছেন। যখন যা ভেবেছেন, মনে হয়েছে তা-ই বাস্তবায়নে ব্রতী হয়েছেন। এমনিতর বিবিধমুখী প্রতিভার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল তার জীবনের প্রথম পর্বে। পরবর্তীতে যা সংহত হয়েছে জীবন দর্শনে। জীবনাচরণের নানাবিধ তত্ত্ব ও পর্যবেক্ষণাকে তিনি গোছগাছ করে তাঁর রচনাশৈলিতে স্থান দিয়েছেন। মানব মনের প্রবৃত্তিগুলোকে বিজ্ঞান ও দর্শনের সমন্বয়ে জারিত করে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেছেন। লেখক হবার বাসনা বা তাতে খ্যাতিলাভের আকাঙ্খা পোষণ করেননি কখনো। দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অঙ্ক, ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে সুপ্রচুর লেখাপড়া করেছেন তিনি। এসব বিষয়ে বিপুল জ্ঞানের অধিকারী হয়েছেন এক সময়। পান্ডিত্য অর্জন বলতে যা বোঝায় তা হয়েছিল তার। কিন্তু পান্ডিত্য ফলাননি কখনও। তিনি আরও লিখেছেন, “ আমরা ইতিমধ্যে প্রায়-দুষ্প্রাপ্য পান্ডলিপি গুলো বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করে রচনাবলী আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেই। একজন ব্যক্তি পুরুষকে সামগ্রিক ভাবে অনুধাবন করতে তাঁর সমগ্র রচনা পাঠের প্রয়োজন সর্বাগ্রে। আরজ আলী মাতুব্বরের মানস ও দর্শন উপলব্ধির জন্য তাঁর রচনা সমগ্রের সাথে পরিচিত হওয়াটা জরুরী। আমরা এই উপলব্ধি থেকে তিন খন্ডে তাঁর রচনা সমূহকে বিভাজন করে আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি”। ( চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ৮:৩১:৩২ ● ৩৪ বার পঠিত