বুধবার ● ১৪ অক্টোবর ২০২৬

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালির প্রতিবাদে নতুন ঝড় !

Home Page » সংবাদ শিরোনাম » রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালির প্রতিবাদে নতুন ঝড় !
বুধবার ● ১৪ অক্টোবর ২০২৬


রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালির প্রতিবাদে নতুন ঝড় !

ঢাকার সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেওয়ালে আঁকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি কালি দিয়ে মোছার চেষ্টা ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা চলছেই। একই দেওয়ালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বাউল সাধক ফকির লালন শাহসহ দেশের বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। সেই দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি মুছে ফেলার চেষ্টার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে।শনিবার (১০ অক্টোবর) এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি লাগাচ্ছেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত এক পুলিশ সদস্য তাকে বাধা দেন।

খবর পেয়ে অন্য পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। এ ঘটনায় একজন নারী ও তিনজন পুরুষসহ মোট চারজনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম আয়াসও রয়েছেন। আটক অন্য তিনজন হলেন, মো. সাকিবুল হাসান (১৯), মো. সুজন মিয়া (১৮) ও মারজিয়া খন্দকার রিমি (২৭)।

এ ঘটনায় রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে করা মামলায় এই চারজনকে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। রোববার (১১ অক্টোবর) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম তাদের গ্রেফতার দেখানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।তিনি বলেন, মামলায় রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ, ধর্মীয় সম্প্রীতিতে আঘাতের চেষ্টা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। শাহবাগ থানার পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি করেছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১২০ খ, ১৫৩ ক ও ২৯৫ ক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

ঘটনার দিন ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মারজিয়া খন্দকার রিমি নামে ওই নারী বলছেন, ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানাতে এসেছেন তারা। তার সঙ্গে থাকা আরও কয়েকজনকেও পুলিশের বাধার মুখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লাগানোর যুক্তি তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন, আমাদের যে বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই এ ঘটনাকে দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি অসম্মান হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক বা আদর্শিক অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার সবার রয়েছে। তবে সেই প্রতিবাদের নামে দেশের বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের স্মৃতিতে আঘাত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিকে লক্ষ্যবস্তু করার যৌক্তিকতা কী। তাদের মতে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার সৃষ্টিকর্ম বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান বা কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন সাহিত্যিকের গ্রাফিতি মুছে ফেলার চেষ্টা সংস্কৃতির পরিসরে নতুন বিতর্ক তৈরি করে।

 আবার প্রতিবাদের ধরন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। অনেকের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ক্ষোভ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মনীষীদের প্রতি সম্মান বজায় রাখা জরুরি।রবীন্দ্রনাথের দেওয়ালচিত্র মোছার চেষ্টা এবং তাতে কালি দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. আব্দুন নূর তুষার। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবি, সত্যজিতের ছবি, বিদ্যাসাগরের ছবি নিয়ে এই প্রলাপ ও বিলাপের কারণ এরা ভাষা সংস্কৃতিহীন রাজনীতি করে। এদের চাই বিরোধ আর বিবাদ। এদের আইকন নাই। কবি নাই। চিত্রকর নাই। চিত্র নির্মাতা নাই। এদের সবচেয়ে বড় আইকনদের উচ্চতা বেগুনবৃক্ষের চেয়েও কম। এদের জন্য সেগুনবাগিচা না, বেগুনবাগিচা দরকার।’রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বড় মেয়ের জামাতা ও অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম আবদুস সালাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‌‘কোন লেভেলের জাহিল আর জংলি হলে একজন ৮০ বছর আগে মরে যাওয়া কবির ছবিতে কালি দেওয়ার চিন্তাটা মাথায় আসতে পারে- ভাবতেছি।’লেখালেখি করেন নতুনদের মধ্যে এমন একজন হলেন ইমতিয়াজ মাহমুদ। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ যে ভারতীয় কবি সেই হিসেবে নজরুলও ভারতীয় কবি। তিনি আরও লেখেন, নজরুলের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ এই ভূ-খণ্ডে বেশিদিন বসবাস করেছেন।

 

সেই কালি আবার মুছে দিয়ে নজর কেড়েছেন এক রিকশাচালক

এদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় যখন ক্ষোভ ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তখন সেটি মুছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া এক রিকশাচালক আলোচনায় এসেছেন। খেটে খাওয়া এই মানুষের কাজটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত হিসেবে অনেকের নজর কেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার ছবি পোস্ট করে তাকে শ্রদ্ধাও জানাচ্ছেন অনেকে।

পেশায় সাধারণ শ্রমজীবী হলেও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি তার দায়বদ্ধতার বিষয়টি মানুষের মনে দাগ কেটেছে।

ফুটপাত সংস্কার থেকে দেওয়ালচিত্র

শিল্পকলা একাডেমির সামনের সড়কের ফুটপাত একসময় হকারদের দখলে ছিল। সেখানে গড়ে উঠেছিল পুরোনো আসবাবপত্রের ভ্রাম্যমাণ বাজার। ফলে ফুটপাত দিয়ে পথচারীদের চলাচলে অসুবিধা হতো। এ পরিস্থিতিতে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উদ্যোগ নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

 এর অংশ হিসেবে সেগুনবাগিচা ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদে সমন্বিত অভিযান চালানো হয়। ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ওই এলাকায় ফুটপাত সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি। শুধু চলাচলের উপযোগী ফুটপাত তৈরি নয়, এলাকাটিকে নান্দনিক করে তোলার অংশ হিসেবেও দেওয়ালে আঁকা হয় দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের গ্রাফিতি।

দেওয়ালে স্থান পায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, বাউল সাধক ফকির লালন শাহ, প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম, অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি এবং সংগীতশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর গ্রাফিতি।গত ৫ অক্টোবর এসব গ্রাফিতি আঁকার কাজের উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম। নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি দেশের সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা ও চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত গুণীজনদের নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি উদ্যোগ হিসেবেও দেওয়ালচিত্রগুলো দেখছেন অনেকে।

প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধে তার অবদান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তার রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। অন্যদিকে, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন শাহ, জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান ও অন্যান্য মনীষীর সৃষ্টিকর্মও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেগুনবাগিচার দেওয়ালে আঁকা ছবিগুলো কেবল নগরসজ্জার উপকরণ নয়, এগুলো দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বও করে।

বিজ্ঞাপন

 

বাংলাদেশ সময়: ১২:৫৪:৫৩ ● ২২ বার পঠিত