এক মানবিক পুলিশ কর্মকর্তার গল্প

Home Page » ফিচার » এক মানবিক পুলিশ কর্মকর্তার গল্প
বৃহস্পতিবার ● ২৩ মার্চ ২০২৩


 ওসি জাহিদুল হক

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর থানা।১৯৭৬ সালে স্থাপিত এ থানায় কোনো কর্মকর্তা বা পুলিশ সদস্য বেশি দিন থাকতে চাননা।এর প্রধান কারণ হলো, দূর্গম হাওরাঞ্চলে চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ থানার যোগাযোগ ব্যবস্থা অতি খারাপ। ‘বর্ষায় নাও(নৌকা) আর হেমন্তে পাও’ এ প্রবাদ বাক্যটি এ থানার ক্ষেত্রে শতভাগ সত্যি। প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক শাহেদ আলী পার্শ্ববর্তী তাহিরপুর উপজেলায় জন্ম গ্রহণ করেন।তাইতো তার প্রতিবেশী মধ্যনগর এলাকা নিয়ে তার বিখ্যাত উক্তি ‘এটা খোদার অদেখা জায়গা’।

রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরের দক্ষিণ-পশ্চিম তীরবর্তী মধ্যনগর থানার উত্তরাংশ মিশে গেছে ভারতের সীমানায়। গারো পাহাড়ের বুকছিঁড়ে অসংখ্য ছোটবড় ঝরনা আর সুবিশাল টাঙ্গুয়ার উত্তাল ঢেউ সীমান্তবর্তী এ জনপদের যাপিত জীবনকে করেছে বৈচিত্র্যময়।

ভারতীয় সীমান্তবর্তী হওয়ায় এ থানায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে পোহাতে হয় নানাবিধ ঝক্কি-ঝামেলা। চোরাচালান ও মাদকের ভয়াল থাবা বিগত সময়ের নৈমিত্তিক সমস্যা হলেও বর্তমানে অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। আর এটা সম্ভব হয়েছে মধ্যনগর থানার ওসি(অফিসার ইনচার্জ) জাহিদুল হকের আন্তরিক প্রচেষ্টায়।
মানবিক এই পুলিশ কর্মকর্তা এ থানায় যোগদানের পর থেকেই ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে চিরাচরিত মধ্যনগর। বিনয়ী ও মানবতাবাদী এই ওসি জাহিদুল হক অপরাধ দমনে মোটিভেশনাল ডেফিসিয়েন্সিকে প্রাধান্য দেন।
তার এই কার্যকর ভূমিকার ফলে কুখ্যাত গরুচোর ও মাদক ব্যবসায়ী সুরুজ আলী এখন মোটরসাইকেল ড্রাইভার। সরে এসেছে অপরাধ জগতের পুরনো জীবন থেকে। সুরুজ আলীর মতো ছোটখাটো অনেক অপরাধী অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে হাঁটতে শুরু করেছে ওসি জাহিদুল হকের কারণে।
ওসি জাহিদুল হকের মানবিক কাজের কথা বললেন কালের কন্ঠ পত্রিকার মধ্যনগর প্রতিনিধি সাংবাদিক আল আমিন। তার বর্ণনায়, ‘গভীর রাতে বাজারের উদোম গলিতে এক পাগলি জন্মদেয় সন্তান।কনকনে শীতের রাতে বিবস্ত্র পাগলীর নবজাতককে নিয়ে টানা হেঁচড়া শুরু করে রাস্তার কুকুরের পাল।নৈশ্যপ্রহরীর মোবাইল ফোনে খবর পেয়ে ওসি জাহিদুল হক পৌঁছে যায় সেই নবজাতকের পাশে। সযত্নে উদ্ধার করে নিজ দ্বায়িত্বে নবজাতক ও তার পাগলী মাকে ভর্তি করান স্থানীয় মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে।’
এ থানার আওতাধীন চামারদানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর খসরু ওসি জাহিদুল হক প্রসঙ্গে বলেন,
‘গত বছরের প্রলয়ংকরী বন্যায় মধ্যনগর থানায় চব্বিশ ঘণ্টা বিরামহীন জরুরি তথ্য সংগ্রহ ও জরুরি উদ্ধার কাজে তার ভূমিকা আজো ইতিবাচক আলোচনার বিষয়।’
সম্প্রতি মধ্যনগর থানায় সরেজমিনে গিয়ে এ প্রতিবেদকের নজরকাড়ে একটি দৃশ্য। থানার পেছনে চিরকালের ঘন ঝোপঝাড় উধাও। সেখানে দেখাগেল নয়নাভিরাম সবুজ শাকসবজীর ক্ষেত।
পরিশ্রমী এই পুলিশ কর্মকর্তা মধ্যনগর থানার পরিত্যক্ত এ জায়গার ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে সেখানে করেছেন সব্জীর চাষ। নানা জাতের শাকসব্জী উৎপাদিত হচ্ছে সেখানে। টমেটো , ডাটাশাক, লাল শাক, ধনিয়া, রসুন, পেঁয়াজ, ও মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করা হয়েছে। জানাগেল এখানে উৎপাদিত শাকসবজী থানার অফিসার ও পুলিশ সদস্যদের চাহিদার অনেকটা পূরণ করে। পাশাপাশি থানা কম্পাউন্ডের চারপাশে লাগিয়েছেন বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ।
এবিষয়ে জানতে চাইলে ওসি জাহিদুল হক বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ‘দেশের এক ইঞ্চি জমিও যেন পতিত না থাকে।’ ওই নির্দেশনা বাস্তবায়নে থানার পতিত জায়গায় সবজির বাগান চাষ করেছি। তারই ধারাবাহিকতায় থানার চারিদিকে বিভিন্ন রকম দেশীয় ফলমূলের গাছ রোপণ করেছি। এক সবজি উঠার পরেই আবার নতুন করে সবজি চাষ করা হবে।আমাদের এই উদ্যোগ দেখে যেন সাধারণ মানুষ যাতে পতিত জমিতে সবজি,শস্য ও বিভিন্ন ফসল চাষে উৎসাহী হয় সেজন্যই এই উদ্যোগ।
তার মানবিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে প্রশ্ন করলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে ওসি বলেন, মধ্যনগর একটি দ্বীপ জনপদ।এই এলাকার সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনা প্রচুর। এখানের হাওরের সুবিশাল জলরাশীর মতো এখানকার মানুষের হৃদয়ও সুবিশাল। প্রয়োজন হৃদয় থেকে ভালবাসা দিয়ে এ জনপদের মানুষকে কাছে টেনে নেওয়া। তবেই খুব সহজে এখানে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। ইতিমধ্যেই মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, ইভটিজিং ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে মধ্যনগর থানা পুলিশ জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। আর এসব ইস্যুতে সফলতাও এসেছে।

এক মানবিক পুলিশ কর্মকর্তার গল্প

রাসেল আহমদ

ব্যুরো চীফ, সিলেট বিভাগ , বঙ্গনিউজ ।

বাংলাদেশ সময়: ১৪:৫৬:১৯ ● ৩৯৫ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ