আমার দেখা বই মেলা-৪
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেছিলাম অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনটির কথাঃ
Elizabeth drew says; the Drama is the Art of Life represented by the terms of theatre. Or, Drama is the creation and representation of life in terms of theatre.
মানব জীবনের দৈনন্দিন ঘটনাবলীকে কল্পনা রঙে রঙিয়ে মঞ্চে প্রতিফলন করাকে নাটক বলে। অর্থাৎ মানুষের জীবনের বা সমাজের কথা বলে নাটক। সকল কাব্যের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো নাটক। তাই সংস্কৃতে বলা হয়ে থাকে “ কাব্যেষু নাটক রম্যেম। নাটক সমাজের দর্পণ। নাটক সমাজের সমস্যাকে জীবন্ত করে দর্শকদেরকে উজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়। যা হোক, নাটক দ্বারা ব্রিটিশদের সিংহাসনে কাঁপন ধরাতে সক্ষম হয়ে ছিল তৎকালীন নাট্যকার ও অভিনেতাগণ। তাই তাদের রক্ষা কবচ হিসেবে একটি আইন প্রনয়ণ করতে হয়ে ছিল। তদানিন্তন সময়ে নীলকরদের ও তাদের ম্যাজিষ্ট্রেটদের অত্যাচার অবিচার শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে অতিষ্ঠ্য হয়ে নাট্যকর্মীগণ তাদের নাট্য কর্মের প্রেক্ষাপট আবিষ্কার করেন। তখন রচিত হয় বহু ব্যঙ্গ নাটক বা প্রহসন। এসবের মধ্যে দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পন,মধুসূদন দত্তের বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো এবং একেই বলে সভ্যতা, কিরণ চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের সরোজিনী , জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুরু বিক্রম, দক্ষিণা চরণ চট্টোপাধ্যায়ের চা-কর-দর্পণ,উপেন্দ্রনাথ দাসের সুরেন্দ্র বিনোদিনী প্রভৃতি। এসব এবং অন্যান্য কিছু নাটকে নীলকর ও ম্যাজিষ্ট্রেটদের শোষণ ,নির্যাতন, অমানবিক আচরণের যন্ত্রনাদায়ক কষ্টকর ও অমানবিক দিকগুলো এসব নাটকে যথাযথ ভাবে তুলে ধরতে সক্ষম ছিল এই সব শক্তিশালী নাট্যকর্মীগন। ফলে কর্তৃপক্ষের প্রতি সাম্রাজ্যবাদ বিরুধী এবং ঘৃণার মনোভাব জাগ্রত করতে সক্ষম হতো সহজে। বাংলার তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্ণর স্যার রিচার্ড টেম্পল এসব নাটক মঞ্চায়নকে নাশকতামূলক কার্যকলাপ বলে আখ্যা দেন। তিনি সরকারকে এ মর্মে আরও সতর্ক করে দেন যে, দেশে ইতিমধ্যে স্থানীয় ভিত্তিক কৃষক বিদ্রোহ ব্যাপক ভাবে ঘটে চলেছে যা ভবিষ্যতে একটি জাতীয় বিপ্লব আকারে সংগঠিত হতে পারে। রিচার্ড টেম্পল সরকারের নিকট এ মর্মে সুপারিশ পেশ করেন যে, যেহেতু বিদ্যমান আইনে এ ধরনের নাটকগুলো নিষিদ্ধ করার কোনো ক্ষমতা সরকারের নেই, সেহেতু কুৎসাপূর্ণ ও নাশকতামূলক নাটকাদি রচনা ও মঞ্চায়ন নিষিদ্ধ করে অবিলম্বে একটি আইন প্রনয়ণ করা উচিৎ।
এই সুপারিশের বলে ১৮৭৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারী ভারত সরকার বাংলা সরকারকে কতিপয় নাটক মঞ্চায়নের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার ক্ষমতা প্রদান করে। অধ্যাদেশটিতে বলা হয় যে, যখন লেফটেন্যান্ট গভর্ণর মনে করবেন যে, মঞ্চস্থ হয়েছে বা হতে যাচ্ছে এমন কোনো নাটক, পুতুল নাচ,বা অন্য কোনো নাট্যকর্ম কুৎসাপূর্ণ বা নাশকতামূলক প্রকৃতির বা তা থেকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে বা সে ধরনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি/ ব্যক্তিবর্গের জন্য ক্ষতিকর, নৈতিকভাবে হানিকর হতে পারে বা অন্য কোনোভাবে জনস্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর হয়, তাহলে সরকার আদেশ বলে সে ধরনের অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করতে পারবেন। অধ্যাদেশে আরও বলা হয় যে, ওই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে শুধু যে প্রযোজক, পরিচালক এবং অভিনেতারাই আইনত শাস্তিযোগ্য হবেন তা নয়, দর্শক এবং থিয়েটার বা মঞ্চের মালিকরাও আইনত শাস্তিযোগ্য হবেন। অধ্যাদেশটি ১৮৭৬ সালের ১৪ মার্চ আইনে পরিণত হয়। এটিই হলো কুখ্যাত সেই অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন।
১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর ”ন্যাশনাল থিয়েটার” এর উদ্বোধনী রজনীতে মঞ্চস্থ হয় নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের ”নীল দর্পণ” । “ গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে অভিনীত হলো উপেন্দ্রনাথ দাসের “ সুরেন্দ্র বিনোদিনী” ও ”শরৎ সরোজিনী”। শরৎ সরোজিনীতে প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ বিরোধীতার সংলাপ ও চরিত্রের আচরণ লক্ষণীয় ছিল। ১৮৭৫ সালের বরোদার ঘটনা নিয়ে “ হীরকচূর্ণ” নাটক লিখেছিলেন রসরাজ অমৃতলাল বসু। নাট্যকার দক্ষিণা রঞ্জন চট্টোপাধ্যায় লিখলেন “ চা-কর দর্পণ “। নাটকটি অভিনীত না হলেও মঞ্চস্থ হয় “ হীরক চূর্ণ “। উল্লেখ্য যে, এখানে উপলক্ষ হিসেবে যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় তা হলো “ জগদানন্দ ও যুবরাজ “ প্রহসনটির অভিনয়। এই প্রহসনটিতে সরাসরি ব্যঙ্গ করা হয় ইংল্যান্ডের মহারাজকে। রানী ভিক্টোরিয়ার পুত্র প্রিন্স অব ওয়েলসকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়। ঘটনাটি ছিল ইংল্যান্ডের যুবরাজ ভারতে এসে নারীদের দেখতে আগ্রহী হন। তখন চাটুকার ভবানীপুর নিবাসী হাইকোর্টের উকিল জগদানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে আমন্ত্রিত হয়ে যান যুবরাজ। তাকে তার পরিবারের নারীগন উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে নেয়। এই প্রেক্ষাপটে নাটকটি লেখা হয় এবং অভিনীত হয়। নাটকটির নাট্যকার ছিলেন উপেন্দ্রনাথ দাস। প্রহসনটির নাম দিয়েছিলেন “ গজদানন্দ ও যুবরাজ” । গজ শব্দের অর্থ হলো হাতি। নাটকটি ১৮৭৬ সালের ১৯ ফ্রেব্রুয়ারী তারিখে “ সরোজিনী “ নাটকের সঙ্গে অভিনীত হয়। রাজভক্ত প্রজাকে বিরূপ করার কারণে নাটকটি বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে প্রশাসনকে ফাঁকি দিতে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে কর্তৃপক্ষ বিষয়বস্তু অপরিবর্তিত রেখে নাটকটির নাম পাল্টে নাম দেন “ হনুমান চরিত “। এই হনুমান চরিত নাটকটিও পুলিশ বন্ধ করে দেয়। এরপর পুলিশের প্রতি আক্রোশ বশতঃ বিরূপ হয়ে নাটক লিখেন “ দি পুলিশ অব পীগ এন্ড শীপ “। এটি অভিনীত হয় ১৮৭৬ সালের ১ মার্চ যৌথভাবে ”সুরেন্দ্র বিনোদিনীর” সঙ্গে। ইতি মধ্যে লর্ড নর্থব্রুক জারি করলেন এক অর্ডিন্যান্স। তখন ৪ঠা মার্চ গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে ” সত্তা কি কলঙ্কিনী “ অভিনয় কালে পুলিশ রঙ্গমঞ্চ ঘিরে ফেলে । গ্রেফতার করে থিয়েটারের লোকজন ও মালিককে। অবশেষে সকল বিরোধীতা উপেক্ষা করে ১৮৭৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর জারি হলো কুখ্যাত অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন” ।
এই আইনের আওতায় যা ছিলঃ
ক) অশ্লীল, মানহানিকর, সমাজমন বিক্ষিপ্ত করতে পারে বা রাজদ্রোহ মূলক বা প্ররোচনা মূলক নাটকের অভিনয় চলবে না। এর ব্যত্যয় হলে নাট্যকার,নাট্যাভিনেতা, , নাট্যাভিনয়ে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ এমনকি দর্শক পর্যন্ত শাস্তির আওতায় আসবে।
খ) নাটক অভিনয়ের আগে পান্ডলিপি পুলিশের কাছে জমা দিতে হবে এবং অনুমতি নিতে হবে। শত প্রতিবাদ, পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পরও এই আইনটি বন্ধ করা গেলো না।
আইনটি জারির ফলে যা ঘটলো-
১) প্রত্যক্ষ ফল যা ঘটেছিল তা হলো রঙ্গমঞ্চ জনশূন্য হলো। মামলায় সর্বশান্ত হয়েছিলেন ভূবন মোহন নিয়োগী। নাট্যকার উপেন্দ্রনাথ দাস চলে গেলেন বিলেতে। রসরাজ অমৃতলাল বসু চলে গেলেন আন্দামান। সুকুমারী দত্ত থিয়েটার ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফী দেশ ভ্রমণে বের হয়ে চলে গেলেন।
২) রঙ্গমঞ্চের শুণ্যতা পূরণের জন্য এগিয়ে এলেন পৌরানিক কাহিনীকারগন। তারা সাময়িকভাবে সচেষ্ট হলেন কিছুটা বিকল্প কিছু করার। ফলে নাট্যমঞ্চে পদধুলি পড়লো সাধু-সন্যাসীদের। রঙ্গমঞ্চ হয়ে গেলো তীর্থক্ষেত্র।
৩) রঙ্গমঞ্চে তথা নাট্য সাহিত্যে জীবন সংগ্রামের চেয়ে মূখ্য হয়ে উঠলো দেব-সাহিত্য।
৪) ক্রমে ক্রমে রঙ্গমঞ্চে যুক্ত হতে থাকলো লঘু নাচ গানের গীতি নাট্যের প্রসার। ফলে বাংলা নাটক তার সেই বলিষ্ঠতা হারালো। হারালো গতিপথ।
৫) এই আইনের আওতায় বহু মূল্যবান ও দর্শক নন্দিত নাটক নির্বাসনে গেলো, নিষিদ্ধ হলো। যেমন, নাট্যকার গিরিশ চন্দ্রের “সিরাজদৌলা, মীর কাসিম ,ছত্রপতি শিবাজী, ক্ষীরোদ প্রসাদের পলাশীর প্রায়শ্চিত্ত, বাঙ্গলার মসনদ, নন্দ কুমারের পদ্মিনী, প্রতাপাদিত্য, দাদা ও দিদি, অমৃতলাল বসুর চন্দ্রশেখর, মন্মথরায়ের কারাগার, শচীন সেনগুপ্তের নরদেবতা, এর মতো অসংখ্য বলিষ্ঠ নাটক। নাট্য সাহিত্যের ঔজ্বল্য আর অগ্রগতি ম্লান হয়ে গেলো।
জোটবদ্ধভাবে এরশাদ বিরুধী আন্দোলনের রূপরেখা অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০০১ সালের ৩০ জানুয়ারী জাতীয় সংসদ কর্তৃক এই অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনটি রহিত করা হয়। ( চলবে )