
বুড়িগঙ্গার তীরের পুরনো ঢাকায় হরহামেশাই চোখে পড়ে ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন। পুরান ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের মন্দির এমনই এক কীর্তি, যা চোখ এড়ায় না ইতিহাস সচেতন মানুষদের।
এখানেই উনিশ শতকের শেষ ভাগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকার প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি বা গণগ্রন্থাগার। ঢাকায় ব্রাহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠার সময়, ১৮৬৯ সালে দোতলার একটি কক্ষে ঢাকার প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অভয় চন্দ্র দাশ। বাংলার রেনেসাঁ বা নবজাগরণের প্রধানতম পুরুষ রাজা রামমোহন রায়ের নামে লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে হিসেবে গ্রন্থাগারটির বর্তমান বয়স ১৫৬ বছর।
ঐতিহাসিক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই অবস্থিত রামমোহন রায় লাইব্রেরি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় গেটের সামনে দিয়ে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের পাশ ধরে সামনে এগোলেই ডান পাশে চোখে পড়ে পুরাতন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে এই লাইব্রেরির সাইনবোর্ড। ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিল লাইব্রেরিটি। কিন্তু ভবনের দেয়াল আঁকড়ে জন্ম নিয়েছে বিরাট একটা গাছ। ফলে পাঠাগারটিকে এখন ব্রাহ্ম মন্দির ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
কালের বিবর্তনে অস্তিত্বের হুমকিতে রয়েছে ঢাকার এই প্রথম পাঠাগারটি। এখন পাঠাগারটিতে কেউ যায় না বললেই চলে। মাঝে মাঝে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আড্ডা দিতে দেখা যায় মন্দিরের বারান্দায়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা ঢুকতেও পারে না পাঠাগারটিতে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, ঐতিহাসিক এ পাঠাগারটিতে এসেছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম স্বার্থক ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এছাড়াও ১৮৯৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় এসে যে তিনটি দর্শনীয় স্থানের কথা বলেছিলেন তার মধ্যে এ পাঠাগার একটি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বুদ্ধদেব বসু, মুহাম্মদ আব্দুল হাই, কাজী মোতাহার হোসেন, সুফিয়া কামাল, শামসুর রহমানের মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিরা এ লাইব্রেরি আলোকিত করেছেন। ১৯৩০ সালে কবি জীবনানন্দ দাশের সাথে লাবন্য গুপ্তর বিয়েও হয় এ লাইব্রেরিতেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতি সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই গ্রন্থাগারে এসেছিলেন।
১৯৪৭ সালে রামমোহন রায় লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজারের বেশি। রাজা রামমোহন রায়ের মুদ্রিত পুস্তকের প্রথম সংস্করণ, বেদান্ত দর্শন, ফার্সি ভাষায় লেখা তোফায়াতুল মোহাম্মাদিন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র ও তাদের সমকালীন অন্য লেখকদের রচনাবলির প্রথম সংস্করণ, গিরিশচন্দ্র সেন অনূদিত কোরআন শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদ এই লাইব্রেরিতেই সংরক্ষিত ছিল। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের মধ্যে ছিল ১৯৭১ সালের পূর্ববর্তী ৫০ বছরের সরকারি সব গেজেট। বর্তমানে এসব দুর্লভ বই ও নথির কিছুই অবশিষ্ট নেই বললেই চলে!
একসময় হাজার হাজার বই থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় এখন বইয়ের সংখ্যা একেবারেই কম। এখন পাঠাগারটিতে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বই রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে ব্রাহ্ম মন্দির ভবনের দোতলার একটি অংশে চালু রয়েছে পাঠাগারটি। সেখানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জসীমউদ্দীন ও সুফিয়া কামালের মতো বরেণ্য সাহিত্যিকদের আলোকচিত্র।
লাইব্রেরিতে ব্রাহ্ম ধর্মীয় গ্রন্থের পাশাপাশি আরো রয়েছে রাজা রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্র রচনাবলী।
ব্রাহ্ম সমাজ পাঠাগারে গিয়ে কথা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে। তারা জানান, ‘আমরা একটা রিসার্চ পেপার তৈরি করার জন্য এখানে এসেছি। প্রয়োজন ছাড়া পাঠাগারে আগের মতো শিক্ষার্থী আসেন না। কেউ কেউ দল বেঁধে এসে মন্দিরের বারান্দায় বসে আড্ডা দেয়। কেউ আবার আসে কাঠগোলাপ ফুল কুঁড়াতে। আসলে পড়াশোনার জন্য আসে না বললেই চলে। তার ওপর পাঠাগারে দেখাশোনার জন্য কোনো ব্যক্তি নিয়োজিত নেই।‘
রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরীর জরাজীর্ণ ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ২০০৪ সালের ১৯ এপ্রিল ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেয়। ২০০৫ সালে তৎকালীন ব্রাহ্ম সমাজের আচার্য ও ট্রাস্টি প্রাণেশ সমাদ্দার উচ্চ আদালতে রিট করে ঐতিহ্যবাহী ভবনটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্তির আবেদন করেন। পাশাপাশি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে একই দাবি জানিয়ে আরেকটি আবেদন করা হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২০০৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের এক প্রতিবেদনে ভবনটি পুরাকীর্তি আইনের আওতায় পড়ে না বলে জানান। তবে তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন জানায়, রাজউক কর্তৃপক্ষের প্রণীত ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় রয়েছে এই পাঠাগারটির নামও। ফলে আটকে যায় ঢাকার প্রথম এই পাঠাগারটি পুনর্নির্মাণ ও পরিবর্ধনের কার্যক্রম।
পাঠাগারটির সার্বিক অবস্থা নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য এ বি পালের সাথে। তিনি বললেন, ’এই পাঠাগারটি সবার জন্য সব সময় উন্মুক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসেন গবেষণার জন্য। পাঠকের জন্য সব সময় উন্মুক্ত থাকলে আশানুরূপ পাঠক পাওয়া যায় না। পাঠাগারটি আলাদা ভবনে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।