এখন আমি যদি বলি যে, বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ কম। তাহলে ? তাহলে আমারই বিরোধীতা আমি করছি বলে প্রতীয়মান হবে। তবুও একই সঙ্গে আমাকে এটিও বলতে হচ্ছে। না বললে উপরের আলোচনা আংশিক সত্য হবে। ‘তাই আমার মতো দুটানাতেই বোধ হয় পড়েছিলেন প্রমথ চৌধুরী। ছোট বেলায় প্রমথ চৌধুরীর নামটা বরাবরই আমি পড়ে এসেছি প্রথম চৌধুরী বলে। মনে মনে পড়েছি যখন তখন কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু একদিন রিডিং পড়তে বলাতে গন্ডগোল বেধে গেলো। প্রচন্ড ধমক খেয়েছিলাম বাবার। বললেন, নামটা দেখে এবং বানান করে পড়। যাক প্রমথ চৌধুরীর কথায় আসি।
প্রমথ চৌধুরী তাঁর ”বই পড়া” নামক প্রবন্ধে লাইব্রেরীকে মনের হাসপাতালের সাথে তুলনা করেছেন। লেখক প্রথম দিকে হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন-
বই পড়া শখটা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শখ হলেও আমি কাউকে শখ হিসেবে বই পড়তে পরামর্শ দিতে চাইনে। প্রথমত , সে পরামর্শ কেউ গ্রাহ্য করবেন না: কেননা , আমাদের এখন ঠিক শখ করবার সময় নয়। আমাদের এই রোগ-শোক, দুঃখ-দারিদ্রের দেশে সুন্দর জীবন ধারণ করাই যখন হয়েছে প্রধান সমস্যা, তখন সেই জীবনকেই সুন্দর করা , মহৎ করার প্রস্তাব অনেকের কাছে নিরর্থক এবং নির্মমও ঠেকবে। আমরা সাহিত্যের রস উপভোগ করতে প্রস্তুত নই: কিন্তু শিক্ষার ফল লাভের জন্য আমরা সকলে উদ্বাহু।
এই প্রাবন্ধিকের জন্ম ৭ আগস্ট,১৮৬৮ এবং মৃত্যু হয়েছিল ২ সেপ্টেম্বর,১৯৪৬ সালে। অর্থাৎ ভারতবর্ষ ভাগ হবারও আগের বছর। সেই সময়ে যে আক্ষেপ তিনি করেছিলেন, তা কি এখন পরিবর্তিত হয়েছে? এতটুকুও নয়। আমরা এখনও পড়াশোনা করতে চাই ফল লাভের জন্য। তারপরও তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, বই পড়তে হবে। তিনি লাইব্রেরীকে একটি মানসিক শান্তির জন্য হাসপাতাল স্বরূপ মনে করেছেন। তিনি ইংরেজদের সম্পর্কে বলেছেন যে, একটি বিশিষ্ট অভিজাত সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েও ইংরেজি সভ্যতার সংস্পর্শে এসে আমরা তাদের গুণগুলো আয়ত্ব করতে না পেরে তার দোষগুলো আত্মসাৎ করেছি। এর কারণও স্পষ্ট। ব্যাধিই সংক্রামক স্বাস্থ্য নয়। তিনি আরও বলেছেন, জ্ঞানের ভান্ডার যে ধনের ভান্ডার নয় এ সত্য তো প্রত্যক্ষ। কিন্তু সমান প্রত্যক্ষ না হলেও সমান সত্য যে, এ যুগে যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শূন্য সে জাতির ধনের ভাঁড়েও ভবানী। তারপর যে জাতি মনে বড় নয়, সে জাতি জ্ঞানেও বড় নয়: কেননা ধনের সৃষ্টি যেমন জ্ঞান সাপেক্ষ তেমনি জ্ঞানের সৃষ্টি মন সাপেক্ষ এবং মানুষের মনকে সরল, সচল সরাগ, ও সমৃদ্ধ করার ভার আজকের দিনে সাহিত্যের ওপরও ন্যস্ত হয়েছে। কেননা,মানুষের দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্মনীতি,অনুরাগ-বিরাগ, আশা-নৈরাশ্য,তার অন্তরে সত্য ও স্বপ্ন এই সকলের সমবায়ে সাহিত্যের জন্ম। তিনি আরও বলেছেন- আমাদের মানতেই হবে যে,সাহিত্যের মধ্যে আমাদের জাত মানুষ হবে। সেই জন্যে আমরা যত বেশি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করব, দেশের তত বেশি উপকার হবে। আমাদের মনে হয় , এ দেশে লাইব্রেরীর সার্থকতা হাসপাতালের চাইতে কিছু কম নয় এবং স্কুল কলেজের চাইতে একটু বেশি। আমার বিশ্বাস শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না। সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত। তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন যে, আজকের বাজারে বিদ্যাদাতার অভাব নেই । এমন কি এক্ষেত্রে দাতাকর্ণেরও অভাব নেই। অর্থাৎ দাতা বহুতই পাওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানদাতার সংখ্যা অপ্রতুল। তাঁর ভাষায় আরও বলা যায়, যে জাতির যত বেশি লোক যত বেশি বই পড়ে, সেজাতি যে ততো বেশি সভ্য , এমন কথা বললে বোধ হয় অন্যায় কথা বলা হবে না। শিক্ষকের স্বার্থকতা শিক্ষাদান করায় নয়, কিন্তু ছাত্রকে তা অর্জন করতে সক্ষম করায়। বিদ্যার সাধনা শিষ্যকে নিজে করতে হয়। গুরু উত্তরসাধক মাত্র।
বনফুল যত্রতত্র ফুটে। কিন্তু গোলাপ ফুলের জন্য প্রচুর পরিচর্যা করতে হয়। মদের দোকান খোঁজে বের করে মানুষ সেখানে যায়। কিন্তু দুধওয়ালাকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ দিয়ে আসতে হয়। ঠিক তেমনি বই পড়াতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হয়। পত্রিকান্তরে দেখেছি উত্তর বঙ্গের একটি লোক, খুব বয়স হয়েছে। দেখেছি দুই কাঁধে ব্যাগে করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই দিয়ে আসেন। আবার কিছুদিন পরে গিয়ে সে বই ফেরৎ নিয়ে আসেন। তাদের ইচ্ছে, তবুও মানুষ বই পড়ুক। চলন্ত যানবাহনে বই বিক্রি করতে দেখেছি। বই বের করে প্রচন্ড শব্দ করে বইয়ের উপর দুটো থাপ্পর দিয়ে সুমিষ্ট সম্ভাষণে তার বক্তব্য তুলে ধরেন। যাত্রীগণ তন্ময় হয়ে শুনে এবং বই কিনে। কখনও বা বিফল হয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়। কিন্তু তার সে প্রচেষ্টা থেমে যায় না। বলার একটা ষ্টাইল, যা তার একান্ত নিজস্ব। বলে- দেখেন, জানেন, এবং বুঝেন। প্রিয় যাত্রী ভাইয়েরা! আপনাদের এই যাত্রা পথের নিরস সময়টাকে সরস করার জন্য আমি আপনাদের হাতে কিছু বই পৌঁছে দেব। আমার হাতে যে বইগুলো দেখতে পাচ্ছেন , এর মধ্যে আছে ভরাডুবি, প্রেম কুমার, মাধবী লতা, পরশ পাথর, চিতা বহ্নিমান, মেজ দিদি, বড় দিদি, পাথর বাড়ি, পথে হলো দেরি, অপূর্ব প্রেম , প্রেমের সমাধি তীরে, পথে হলো দেখা, যে কথা যায় না বলা, আর এক ফাগুণ, ফাগুণ আসিল ফিরে, ভুলনা আমায়, শুধু তোমার জন্য, একরে ভিতরে পাঁচ, নামাজ শিক্ষা, শয়তানের ডাইরী, স্মৃতি তুমি বেদনা, হিমু, যে ব্যাথা যায় না বলা, বাসর রাতের গোপন কথা, বিরাজ বৌ, কৃষ্ণকান্তের উইল, । আরও জানতে পড়ুন কুঞ্জবনের কুহু কথা, জ্ঞান জিজ্ঞাসা, যৌবনের ঢেউ, যৌবনকে ধরে রাখুন। এক নিঃশ্বাসে সব বলে যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যাত্রীদের রকমভেদ অনুযায়ী তার সংগ্রহ। বিক্রি হয় দু’চারটে। হয়তো তাই দিয়ে সংসারও চলে। কিন্তু হাতের নাগালে বই এনে অন্তত পড়তে তো উদ্বুদ্ধ করে সে। তাতে মন্দ কি?
( চলবে )