
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে আন্দোলনরত নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের র ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। গতকাল বিকালে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে হাদি হত্যার বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করলে পুলিশ তাদের ওপলাঠিচার্জ, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হন। এ ছাড়াও ইনকিলাব মঞ্চের ফাতেমা তাসনিম জুমা (মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক, ডাকসু), শান্তা আক্তার (সদস্য, জকসু), সালাউদ্দীন আম্মারসহ (জিএস, রাকসু) শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এদিকে পুলিশ বলছে, তারা গুলি করেনি। সরকার বলছে, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হলো গুলি করল কে? ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের এখানে অর্ধশতাধিক রোগী এসেছে। তবে এদের মধ্যে কোনো গুলির রোগী পাওয়া যায়নি। যারা আহত হয়ে এসেছেন, তাদের জরুরি বিভাগে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অনেকে চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। আহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের জখম রয়েছে।’ ঢামেক হাসপাতাল থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘আমাদের কিছু হয়ে গেলে আপনারা হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করবেন।’ প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীরা শাহবাগ থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। তারা ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে পথরোধ করে। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগিয়ে যেতে চাইলে তাদের ওপর পুলিশ চড়াও হয়। এ সময় শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। আন্দোলনকারীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ শুরু করলে এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে গণমাধ্যমকর্মীসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। প্রায় দুই ঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের পর আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব জাবের নেতা-কর্মীদের শাহবাগে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর বিকালে নেতা-কর্মীরা শাহবাগে অবস্থান নিলে শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
নিহত হওয়ার খবরে সত্যতা নেই : প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ’ একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে, পুলিশের গুলিতে যমুনার সামনে আন্দোলনরত তিনজন নিহত হয়েছেন। কমপক্ষে আরও ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবে ফ্যাক্ট চেক যাচাইয়ে এমন দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। যমুনার সামনে লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের খবর পাওয়া গেলেও কোথাও নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি ব্যবহার করেনি পুলিশ : ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, যমুনা ও আশপাশের এলাকায় বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে কোনো প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি ব্যবহার করেনি পুলিশ। প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ও সংলগ্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও শুক্রবার বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে একাধিক গোষ্ঠী পুলিশের বাধা অতিক্রম করে যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এদিকে নির্বাচনের আগে এ ধরনের ঘটনায় নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে গুলি ব্যবহৃত হয়নি। তাহলে গুলি করল কে? গতকাল দেওয়া বিবৃতিতে সরকার স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করছে যে শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারে সরকার বদ্ধপরিকর। জাতিসংঘের অধীনে তদন্ত পরিচালনার আইনগত দিক সরকার গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে এবং এ বিষয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হবে। বিভিন্ন মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তা সঠিক নয়। আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে এই সংবেদনশীল রাজনৈতিক সময়ে সরকার সবাইকে ধৈর্য, সংযম ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছে। দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষ অধীর আগ্রহে এই নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি বর্তমানে বাংলাদেশের দিকে নিবদ্ধ। বিদেশি বহু সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক ইতোমধ্যে বাংলাদেশে উপস্থিত হয়েছেন। সরকার দেশের সব নাগরিকের প্রতি একটি উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা ও সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছে।
জামায়াতের নিন্দা : ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশের হামলা, এ সময় সদস্যসচিব আবদুুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে এই নিন্দা জানান।