বৃহস্পতিবার ● ২১ মে ২০২৬
রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩২ স্বপন চক্রবর্তী
Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩২ স্বপন চক্রবর্তী
জ্ঞান পিপাসু ও বই প্রেমী মানুষের গল্প-২
( পূর্বে প্রকাশিতের পর )
একজন মৌলিক চিন্তাবিদ ও দার্শনিক হিসেবে আরজ আলী মাতুব্বর যে স্বীকৃতি , সম্মান ও মর্যাদা পাবার কথা ছিল বলাবাহুল্য তিনি তা পাননি। সমাজ তাঁকে পীড়ন করেছে, দিয়েছে কেবল যন্ত্রণা। একদল তাঁকে দেখেছে সন্দেহের চোখে। ভেবেছে যে, এসব লেখা তাঁর নিজের নয়। তাঁকে কম্যুনিষ্ট করার মিথ্যা অপবাদে হাজতে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এক সময় তিনি আর লিখতে পারবেন না মর্মে তার উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘ সময় লিখা বন্ধ রেখেছিলেন।
এ বিষয়ে আরজ আলী লিখেন, “ লোক পরম্পরায় আমার নামটি শুনতে পেয়ে তৎকালীন বরিশালের ল-ইয়ার ম্যজিষ্ট্রেট ও তাবলীগ জামায়াতের আমীর জনাব এফ করিম সাহেব সদলে আমার সাথে তর্কযুদ্ধে অবতীর্ন হন ১৩৫৮ সালের ১২ জ্যৈষ্ঠ তারিখে আমার বাড়িতে এসে, এবং যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বরিশালে গিয়ে তিনি আমাকে এক ফৌজদারী মামালায় সোপর্দ করেন “ কম্যুনিষ্ট” আখ্যা দিয়ে” । লেখা, সভা-সমিতিতে বক্তৃতা স্বমত প্রচার ও বই প্রকাশ সব কিছু বন্ধ করে দেন তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। তিনি ঘরে বসে থাকেন ১৯৭১ সাল নাগাদ সুদীর্ঘ ২০টি বছর। আসলে শুধু আরজ আলী নন, যারা বিশিষ্ট দার্শনিক ও বিজ্ঞানী তাদেরকে সত্য বলার অপরাধে আগেও নির্যাতিত হতে হয়েছে। “ পৃথিবী নয়, সূর্য ঘোরে” তত্ত্বের সাথে দ্বিমত প্রচার কারায় বৈজ্ঞানিক গ্যালিলিও গ্যালিলি শাস্তি পেয়েছিলেন। এর আগে একই মতবাদ প্রচার করায় ক্যাথলিক চার্চের হাতে নির্মম পরিণতি ভোগ করে ছিলেন দার্শনিক জিওর্দানো ব্রুনোকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ অব্দে এথেন্সের আদালত প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেছিল ”হেমলক” নামক মারাত্মক এক বিষ প্রয়োগ করে। বিজ্ঞানের শিক্ষক যে এখনও লাঞ্ছিত হচ্ছে না এমন নয়। তবে আমার প্রতিপাদ্য বিষয় হলো কি করে আরজ আলী স্বশিক্ষিত হলেন সেই গল্প, তাঁর লেখার বিষয়বস্তু নয়।
বহুমুখী প্রতিভাধর আরজ আলীর জীবনে আর একটি সুযোগ এসেছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে আর তা হয়নি। তিনি রাসায়নিক বিদ্যুৎ তৈরী করেছেন, ডায়নামোতৈরী করেছেন।
ছোটখাট অনেক কিছু আবিষ্কার করেছেন আরজ আলী। আবিষ্কৃত এসব জিনিষ তিনি বানিজ্যিক ভাবে উৎপাদন করতে নয়, পরীক্ষামূলকভাবে নিজের জানার আগ্রহে করেছেন। এসবের অনেক কিছুর ফরমূলাই লিখে রেখে গেছেন আগ্রহীদের জন্য। এমনই একটি হলো পাখা তৈরী।
তারই বর্ণনা থেকে তুলে ধরছি। - “ ১৩৩৯ সালের ১৬ই বৈশাখ ( তিনি বেশির ভাগ সময়ে বাংলা তারিখ ব্যবহার করেছেন ) লাখুটিয়ার জমিদার ও পূর্ব বাংলার রেলওয়ের ডি, টি, এস মিঃ পরেশ লাল রায় (ঘুঘু বাবু বা ঘুঘু সাহেব ) আসবেন, স্থানীয় রহম আলী মাতুব্বরের বাড়ীতে। কয়েক দিন পূর্বে খাজানা আদায়ের জন্য তিনি এখানে এসেছেন বজড়া নিয়ে। তিনি কদম তলায় খালে বোট রেখে খাজানা তহশিল করছেন। মাতুব্বর বাড়ীতে সাহেবের অভ্যর্থনার আয়োজন বিপুল। শুধু সাহেবের খোরাকীর ফর্দেই পদের সংখ্যা ৮০টি। মাতুব্বর সা’ব তাঁর বৈঠকখানা সাজাতে অনুরোধ জানালে আমি সম্মত হলাম এবং তিনি আমার ফরমায়েস মত সাজ-সরঞ্জাম ও আবশ্যকীয় দ্রব্যাদি কিনে দিলেন” ।
আরজ আলী মাতুব্বর সেই অভ্যর্থনা কেন্দ্রটির সাজানোর বর্ণনা দিয়েছেন তার লেখায়। নানাবিধ রঙিন কাগজ ও মিনাপাত কেটে এবং লতাপাতা, ফুল ইত্যাদি দিয়ে ঘর সাজালেন। দরজার প্রবেশ পথে গেট এবং দুপাশে দু’জন দারোয়ান দাঁড় করালেন। সেই দ্বারীদ্বয়ও ছিল কাগজের তৈরী। কাগজে আর্ট করা কাগজ কেটে দারোয়ান বানালেন। পরনে ছিল হাফ প্যান্ট, গায়ে জামা, পায়ে জুতো, মাথায় লাল রংয়ের পাগড়ী ও কাঁধে বন্দুক। পরে পীজবোর্ড কাগজে প্রতিস্থাপন করে কেটে নিলেন। দুর থেকে কেউ আন্দাজই করতে পারেনি যে, ওরা দারোয়ান ছিল না। তারপর তার তৈরী কৃত্রিম বৈদ্যতিক পাখা যুক্ত করলেন বৈঠকখানায়। যথাসময়ে সাহেব আসলেন। অনেক লোকের সমাগম হলো। তার সঙ্গে তার সহধর্মিনী মিসেস ইন্দিরা দেবী। এই ইন্দিরা দেবী এক সময়ে “ আলী বাবা “ চলচ্চিত্রে মর্জিনার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। সাথে পুত্র হ্যারিকেল। সাহেব এসে বসতেই মাথার উপরে পাখা চলতে শুরু করলো। নতুন বা আজব কিছু দেখলেন বলে নয়, অশিক্ষিত কৃষক পল্লীতে এমন বৈদ্যতিক পাখা মাথার উপরে ঘুরছে, সাহেব সহ অভ্যাগতগণ বিষ্মিত হলেন। পাখাটির সম্পর্কে সাহেব বিস্তারিত জানতে চাইলেন। জানতে চাইলেন দারোয়ান দুটির কথা। অবশেষে এ্যংলো ইন্ডিয়ান সাহেব আরজ আলীকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাইলেন । ইংলেন্ডে জন্ম সেই সাহেব তার ভাষায় আরজ আলী সম্পর্কে মৃধা সাহেবকে বললেন, “ মৃঢা! টোমার ভাইকে হামার সাঠে ডেও, হামি ওকে ইঞ্জিনিয়ারিং শিখাবে” । কোলকাতা থেকে আরজ আলীর ইঞ্জিনিয়ারিং শিখা তার পক্ষে সম্ভব নয় জানালে সাহেব বলেন, “ ক্যালক্যাটা ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ইন্সটিটিউটের হেড সা’ব হামার বন্ঢু আছে, ওখানে বেটন ডিটে হবে না, খাওয়া ও অন্য খরচা হামি ডেবে, রেল-ষ্টীমারে পাস ডেবে। বল,যাব “ ? আরজ আলী তার মায়ের সম্মতি আনতে গেলেন।
সাহেব পূজোর ছুটি কাটিয়ে তিন মাস পর পুনঃ কোলকাতা যাবেন এবং তখন তাকে ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ইন্সটিটিউটে ভর্তি করাবেন। যাবার সময় আরজ আলীর প্রতিটি কাজে সাহেব সন্তুষ্ট হলেন এবং পারিতেষিক দিলেন দশ টাকা। কিন্তু নিয়তি কোন বাধ্যতে। যাবার পূর্বদিন আত্মীয় স্বজন এলো, তাদেরকে আপ্যায়িত করা হলো। সারারাত আনন্দ হলো ,কথাবার্তা হলো। কিন্তু যাবার আগের দিন রাতে তার মা তাকে বললেন, কুডী আমাকে ধর আমি আর বাঁচবোনা। সব শেষ হলো ,আরজ আলীর আর যাওয়া হলো না। আরজ আলী দিকবিদিক শূন্য হলেন। তিনি লিখলেন, “ উপস্থিত বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে মা’র জীবনী সম্বন্ধে আলোচনা-অনুশোচনার ঝড় বইতে লাগল, একান্ত দরদীরা কাঁদতে লাগল। কিন্তু আমার কান্না এলোনা। কি হচ্ছিল এবং কি হ’ল ভেবে কোন কুল পেলাম না। একবার মনে হ’ল আমার যেন কেউ নেই, কিছু নেই,রোগ, শোক, দুঃখ বেদনা ক্ষুধা তৃষ্ণা , তাও নেই। শেষমেশ ( সম্বিৎ হারাইলাম ) ,আমি যেন নিজেও নেই। জ্ঞানোদয় হ’লে আবার মনে হতে লাগল, এ যেন আমি ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছি। ঘুম ভেঙ্গে গেলেই আবার সব ঠিক হয়ে যাবে, প্রভাত হলেই মা আমাকে “ কুডি” বলে ভাত খেতে ডাকবেন”।
( অথঃ সমাপ্ত হলো আরজ আলী , তবে জ্ঞান পিপাসু অন্য একজনকে নিয়ে সামান্য লিখতে চাই)
বাংলাদেশ সময়: ২০:২৮:০৭ ● ৩৮ বার পঠিত