বুধবার ● ২৭ মে ২০২৬

রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩৬ স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩৬ স্বপন চক্রবর্তী
বুধবার ● ২৭ মে ২০২৬


স্বপন কুমার চক্রবর্তী
রঙলেপার জন্মদিন কেন ১ অগ্রহায়ণ?
( পূর্বে প্রকাশিতের পর )
নিদারুন অভাব, কষ্ট ও ঋণগ্রস্থতা শেষে অগ্রহায়নে কৃষকের ঘরে আসে চরম আনন্দ, আসে বহু প্রতিক্ষীত সোনার ফসল। এটি যে কি আনন্দ বয়ে আনে গ্রামীণ জনপদের মানুষের জন্য তা এখন আর আলোচনা করে বুঝানো যাবে না। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বহুমাত্রিক ফসলের যুগের মানুষদের এই অনুভূতি লিখে বুঝানো কষ্টকর ব্যপার। কারণ ফসলের মাঠের দিকে পলকহীন চেয়ে চেয়ে থাকার দিন বলতে গেলে গত হয়ে গেছে।
আমন ধান ঘরে এলে বাংলার ঘরে ঘরে বিশেষ অনুষ্ঠান পালিত হতো। নিমন্ত্রিত আত্মীয়-স্বজনদের আনাগোনা বেড়ে যেতো অনেকগুণ। নবান্নের উৎসবে মেতে উঠে দেশ। অগ্রহায়ণ-পৌষে ঘরে ঘরে প্রথম ধান তোলার পর সেই ধানের চাল থেকে তৈরি হয় রকমারি পিঠা-পায়েস-মিষ্টান্ন। এই নবান্ন মূলত শস্য উৎসব। বাংলায় এই উৎসব কবে শুরু হয়েছিল তার দিনক্ষণ নির্ণয় করা আজ খুব কঠিন। তবে বাংলার উৎসবের বর্ষপঞ্জির শুরুটা হয় এই নবান্ন দিয়ে। আর শেষ হয় চৈত্র সংক্রান্তির চড়কের উৎসব দিয়ে। বলা বাহুল্য, এই অগ্রহায়ণ মাসই নাকি একদা খাজনা আদায়ের মাস ছিল। ফলে বাংলা নববর্ষের শুরু হয়েছিল ১ অগ্রহায়ণ মাস থেকে। পরে ক্রমান্বয়ে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ১ বৈশাখ থেকে নববর্ষ শুরু হয়। এ নিয়ে অনেক মতবাদ আছে। এখানে সেটা প্রাসঙ্গিক হবে না বিধায় আর উল্লেখ করছি না। তবে ১ অগ্রহায়ণকে বাংলা নববর্ষ পুনঃ বিবেচনা করা যায় কিনা তা ভেবে দেখতে লেখক জালাল উদ্দিন মাহমুদ বহুবার বহু যুক্তি দিয়ে দাবি করেছেন।
বাঙালির প্রধানতম এই উৎসবটি এখন বিক্ষিপ্তভাবে পালন হয়ে থাকে, কিন্তু ঘটা করে নয়। হিন্দুসম্প্রদায়ের মধ্যে এখনও এই রীতিটি কমবেশি প্রচলিত আছে। তবে গ্রামেই বেশি। আগেই উল্লেখ করেছি যে, অধিকাংশ মেলার উৎপত্তিস্থলই গ্রাম থেকে।
কার্তিকের অভাব যেমন কৃষককূলকে বিচলিত করতো, ঠিক তার অব্যবহিত পরেই দেখা যেতো বিপরীত চিত্র। যেন গভীর অমানিশা কেটে গিয়ে রক্তিম সূর্য উদিত হতো পুব আকাশে।
আবহাওয়ার দিক থেকেও হেমন্ত খুব সহনশীল একটি মাস। একান্তই মৃদুভাবাপন্ন। কোন উৎপীড়ন নেই। সব দিক থেকেই এটি চমৎকার একটি ঋতু।
হেমন্তে এক সময় বাংলার গর্ব ছিল রকমারি ধান। শষ্য ক্ষেতের আল দিয়ে হেঁটে গেলেও সুগন্ধি সব ধানের ঘ্রাণ নাকে লাগতো। কত নামের বাহার ছিল সেসব ধানের। যেমন আকাশমণি, কপিলভোগ, কাজলা, কামিনী, কালিজিরা, কাশফুল, কুসুমকলি, ঘৃতশাল, চন্দনচূড়া, চন্দ্রপুলি, চিনিসাগর, জটাশালী, জনকরাজ, জামাইভোগ, ঝিঙেফুল, ঠাকুরভোগ, তিলসাগরী, তুলসীমালা, দাদখানি, দূধকমল, নীলকমল, পঙ্খিরাজ, পদ্মরাগ, বাকশালি, বেগম পছন্দ, ভাদ্রমুখী, মতিহার, ময়ূরপঙ্খী, মানিকশোভা, মুক্তাঝুড়ি, রাঁধুনিপাগল, রানিপাগল, রাজভোগ, সন্ধ্যামণি, সুর্যমুখি, হরিকালি, হীরাশাল, লতাশাল, ঝিঙেশাল, কাটারিভোগ, ইত্যাদি নামের ধান পাওয়া যেতো এই বাংলায়। কিন্তু জনসংখ্যা ব্যপকভাবে বৃদ্ধির ফলে খাদ্যোৎপাদন চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হতে থাকে। ফলে এগিয়ে আসে বিজ্ঞান। ইরি ( IRRI ) বিরি ( BIRRI ) এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি গবেষণা কেন্দ্র ইত্যাদির উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান আবিষ্কারের দিকে ঝুঁকে, ফলে সুগন্ধি সব ধানের বিলুপ্তি ঘটে। একই সাথে বিলুপ্ত হতে বসে রকমারি এবং বাহারি সব পিঠা পায়েস ও মিষ্টান্নের। সেসব পিঠা এখন বয়ষ্কজনদের স্মৃতিতে আছে, বাস্তবে নেই। কতশত নামের সেসব খাদ্য ও পিঠা, যেমন আন্দেশা, ক্ষীরপুলি, ক্ষীরমোহন, ভক্তিপিঠা, কলা পিঠা, হাফরি পিঠা, কন্যাভোগ, জামাইভোগ, ছাঁট পিঠা, মুখসওলা, পাক্কন পিঠা, চুকা পিঠা, খান্দেশ পিঠা, পাতা পিঠা, পোয়া পিঠা, তেলপোয়া, মালপোয়া, দানাদার,দুইবিরানি, জালি পিঠা, ছই পিঠা, পাটিসাপটা,পুলিপিঠা, মেরাপিঠা, ভাপা পিঠা, জলডুবা,দুধপুলি, চিতই পিঠা আরও কত কি। মনে হলে অনেকেরে হয়তো এখনও জিভে জল আসে।
যে কার্তিকের মন্বন্তরকে তখন আকাল, অভাব, দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা প্রভৃতি নামে অবিহিত করা হতো, সে সব বিব্রতকর নামের অবসান ঘটে যেতো অগ্রহায়ণের শষ্য প্রাপ্তিতে। (চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ২০:৫৯:০৩ ● ৩৫ বার পঠিত