সীমান্ত ভ্রমণের সাতটি দিন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ; পর্ব- ২০: স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » সীমান্ত ভ্রমণের সাতটি দিন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ; পর্ব- ২০: স্বপন চক্রবর্তী
সোমবার, ২০ জুন ২০২২



স্বপন কুমার চক্রবর্তী

বঙ্গ-নিউজ: আগেই বলেছি, কুশান গান মুলতঃ রামায়ণের কাহিনি নির্ভর বর্ণনা। রামায়ণের কান্ড বা অধ্যায় সংখ্যা সাতটি। কুশান গানে যে কোন একটি করে পালা নিয়ে কুশান গান গাওয়া হয়। এক এক দিন এক একটি পালা সম্পন্ন হয়। একাধিক দিনেও চলে এই গান। অনেক সময় সপ্তাহ ব্যাপি এই গানের বিভিন্ন পালা মঞ্চস্থিত হয়। যেমন- রাবণের বিলাপ, মেঘনাদ বধ, শক্তি শেলে লক্ষণ,মহীরাবন বধ, লব-কুশ, অশ্বমেধ যজ্ঞ, সেতুবন্ধন, বালিবধ, সীতার বনবাস, কুম্ভকর্ণ বধ, বিভীষণের সপক্ষ ত্যাগ, রাম-রাবণের যুদ্ধ, সীতা দেবীর পাতালে প্রবেশ ইত্যাদি। এই পালাগুলো গিদালের উপস্থাপনার গুণে এমনই আবেগঘণ হয়ে উঠে যে, দর্শক সবাই অশ্রুসিক্ত ও আবেগ প্রবণ হয়ে পড়েন। আবেগাপ্লুত হয় যখন শিল্পী রাবণের বিলাপের মতো বিলাপ করে বলতে থাকে, “ এক লক্ষ পুত্র মোর সোয়া লক্ষ নাতী, রহিল না কেহ আর বংশে দিতে বাতি। কিংবা শক্তি সেলে লক্ষণ নিহত হলে রামের মনের ভাবটি চিন্তা করে বিলাপ দেখাতে গিয়ে শিল্পীর যে ভাবাবেগ প্রকাশ হয়ে থাকে তা সাবাইকে অশ্রুসিক্ত করে তুলে। ক্রন্দনরত ভাবে রামরূপী গিদাল দরদ কন্ঠে গেয়ে ওঠে- “ দেশে গেলে জিজ্ঞাসিবে সুমিত্রা মাতা, তোমরা তো ফিরেছ সবাই, লক্ষণ মোর কোথা “।
কুশান গানের বন্ধনার পরপর গানের মাধ্যমেই রামায়ণের সাতটি কান্ড সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে ধারণা দেওয়া হয়। যেমন-
” আদি কান্ডে রামের জন্ম, বিবাহ সীতার
অযোধ্যাতে বনবাস, ত্যাজি রাজ্য ভার।
অরণ্য কান্ডেতে সীতা হরিল রাবণ
কিস্কিন্ধাতে বালি বধ, সুগ্রিব মিলন।
সুন্দরা কান্ডেতে হইলো সাগর বন্ধন
লঙ্কা কান্ডে উভয় পক্ষে বাঁধে মহারণ।
উত্তরা কান্ডেতে হলো কান্ডের বিশেষ
সীতা দেবী করিলেন পাতালে প্রবেশ।
কুশান গানের গিদাল প্রয়োজনে উপস্থিত গান রচনা ও রসসৃষ্টির খোড়াক দিতে পারঙ্গম হয়ে থাকে। এই কুশান পালা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে উপস্থাপিত হয়। গান শুরুর পূর্বে বন্ধনা গাওয়া হয়। চতুর্দিক বন্ধনা, গুরু বন্ধনা, চন্দ্র-সূর্য় বন্ধনা, দর্শক-শ্রোতা বন্ধনা ও সরস্বতীর বন্ধনার মাধ্যমে শুরু করা হয় এই গান। এই গানের কোন স্ক্রিপ্ট নাই। শুধুই গুরুমুখী বিদ্যা। তাই গুরুকেই গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে পালা শুরু হয়। যে কোন সঙ্গীতের বাণী গীতিকারের রচনা হলেও সঙ্গীতের সুর তাল লয় গায়কী ইত্যাদি হয়ে থাকে গুরুমুখী। তাই সার্বিকভাবে সঙ্গীতকে গুরুমূখী বিদ্যা বলা হয়ে থাকে।
গিদাল ও দোয়ারী একই সংগে পরস্পর সংলাপ ও অভিনয়েও অংশ নিয়ে থাকেন। তাঁরা অভিনয় করেন কখনো রাম-রাবণ, কখনো লব-কুশ কখনো গুরু–শিষ্য, আবার কখনো বা সীতা-হনুমান ইত্যাদি চরিত্রে। অন্যান্য দোহার যারা, তারাও প্রয়োজনে অভিনয় করে থাকেন। আবার সংগীতের মাধ্যমেও বর্ণনা দিয়ে থাকেন। এইভাবে বিশেষ এক মাধুর্যে অনুষ্ঠিত হয় কুশান পালা। রামায়ণের মতো তথা মহাকাব্যের মতো কুশান গানেও কাব্যিকভাবে অনেক চরিত্রকে বিভিন্ন নামে ফুটিয়ে তুলা হয়। যেমন-রামকে কখনো বলা হয় রাঘব, কখনো দশরথাত্মজ, দাশরথি, সীতাপতি, বৈদেহীনাথ ,বৈদেহীরঞ্জন, কৌশল্যানন্দন, দেহীমনোরঞ্জন, রঘুকুলমণি, রাঘবেন্দ্র, রঘুবর, রঘুনন্দন, রঘুশ্রেষ্ঠ, সীতানাথ, রবিকুল রবি, রঘুকুলনিধি, রঘুচূড়ামণি, নরবর, রঘুপতি, রঘুনাথ, রঘুবংশ-অবতংশ, সীতাকান্ত, রাঘবচন্দ্র, রঘুকুলরাজা, বৈদেহীবিলাসী, রাঘবেশ্বর, মৈথিলীনাথ, নরপাল, বৈদেহীপতি, রক্ষোরিপু, মৈথিলীবিলাসী, রামভদ্র, মৈথিলীপতি, রক্ষোরিপু,, রঘুজ-অজ-অঙ্গজ-দশরথাত্মজ ইত্যাদি। আবার রাবণেরও তেমনি অনেক নাম ব্যবহৃত হয় যেমন- রাবণ, দশানন, লংকাপতি, রাক্ষসপতি, রাক্ষসরাজ, লংকেশ্বর, ইত্যাদি। মেঘনাথের ও রয়েছে ইন্দ্রজিৎ , রাবনী, মন্দোধরীপুত্র । প্রায় প্রত্যেকটি চরিত্রেরই একাধিক নাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
এই কুশান পালা ছাড়াও রামায়ণ নিয়ে অনেক গান অনুষ্ঠিত হয়-যেমন, রামায়ণ গান, রাম মঙ্গল গান রাম যাত্রা ইত্যাদি। রামায়ণ দুই ধরনের রয়েছে । একটি তুলশি দাসের আর অন্যটি হলো বাল্মিকী রচিত। বাংলাদেশে ও ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলে বাল্মিকী রচিত রামায়ণকেই বেশি পাঠ করা হয়ে থাকে। কারণ এই রামায়ণটি বাংলায় রচিত। উল্লেখ্য যে, জনসংখ্যার দিকে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় গ্রন্থ হলো রামায়ণ। তবে সেটা একটু ভিন্ন আঙ্গিকের। অকেটা মাইকেল মধুসূধন দত্তের মেঘনাদ বধ কাব্যের মতো।

ইন্দোনেশিয়ার দেওয়া আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে স্থাপিত সরস্বতী মূর্তী
রামায়ণ শুধু কাব্য গ্রন্থ নয় , একটি মহাকাব্য। মহাকাব্যের সকল বৈশিষ্ট্যই এর মধ্যে বিদ্যমান আছে। ইন্দোনেশিয়া মুসলিম দেশ হলেও অনেকাংশেই ভারতীয় সংস্কৃতিকে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাদের বিমানের নাম গারুড় ইন্দোনেশিয়া ( Garuda Indonesia )। এই গরুড় হলো হিন্দু দেবতা ভগবান বিষ্ণুর বাহন। শুধু তাই নয়, অনেক কিছুতেই তাঁরা ভারতের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধারণ করেন। তাদের নাম রাখার ক্ষেত্রেও দেখা যায় সুকর্ণ, সুহার্তো. সুকর্ণপুত্রী, মেঘবতী ইত্যাদি। আবার একটা মিলনায়তন রয়েছে যার নাম কন্যা-জায়া। মুদ্রা এবং নোটের মধ্যে ব্যবহার করা হয় গণেশের ছবি। ২০১৩সালে ইন্দোনেশিয়া আমেরিকাকে একটি সরস্বতী মূর্তী উপহার দিয়েছে, যার উচ্চতা ১৬ ফিট। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু সরস্বতীর মূর্তী বলে মনে করা হয়। ওয়সিংটন ডিসিতে ইন্দোনেশিয়ার দূতাবাসের কাছেই রয়েছে এই মূর্তীটি। উচ্চতা বেশী হওয়ায় এটা দর্শকদেরকে খুব আকৃষ্ট করে। এই ঘটনা সারা পৃথিবীর কাছে সৌহার্দের প্রতীক হয়ে আছে। সরস্বতীর পায়ের কাছে তিনটি বাচ্চার মূর্তী রয়েছে, মনে হচ্ছে তারা বিদ্যাভ্যাস করছে। একটি পদ্ম ফুলের উপর স্থাপিত এই মূর্তীটি শ্বেত পাথরের তৈরী। মূর্তীটির গায়ে রয়েছে স্বর্ণের অলংকার।
চলবে-

বাংলাদেশ সময়: ২০:৫৩:১২   ১৪৪ বার পঠিত   #  #  #




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

সাহিত্য’র আরও খবর


সীমান্ত ভ্রমণের সাতটি দিন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ; পর্ব- ২৪ : স্বপন চক্রবর্তী
সীমান্ত ভ্রমণের সাতটি দিন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ; পর্ব- ২৩ : স্বপন চক্রবর্তী
সীমান্ত ভ্রমণের সাতটি দিন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ; পর্ব- ২২ : স্বপন চক্রবর্তী
সীমান্ত ভ্রমণের সাতটি দিন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ; পর্ব- ২১: স্বপন চক্রবর্তী
সীমান্ত ভ্রমণের সাতটি দিন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ; পর্ব- ২০: স্বপন চক্রবর্তী
সীমান্ত ভ্রমণের সাতটি দিন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ; পর্ব- ১৯ : স্বপন চক্রবর্তী
সীমান্ত ভ্রমণের সাতটি দিন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ; পর্ব- ১৮ :স্বপন চক্রবর্তী
প্রণয়কুঞ্জ - গুলশান আরা রুবী
সীমান্ত ভ্রমণের সাতটি দিন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ; পর্ব- ১৭: স্বপন চক্রবর্তী
কল্ললিত ঝরণার টানে- শামীমা বেগম

আর্কাইভ

16. HOMEPAGE - Archive Bottom Advertisement