থাইরয়েড অপারেশন যা জানতে হবে

Home Page » সংবাদ শিরোনাম » থাইরয়েড অপারেশন যা জানতে হবে
বুধবার ● ৩১ জানুয়ারী ২০২৪


ফাইল ছবি

মানবদেহে ঘাড় বা গলার সামনে নিচের দিকে প্রজাপতি আকৃতির গ্লান্ড বা গ্রন্থির নামই থাইরয়েড। মানুষের বৃদ্ধি, বিকাশ, শারীরবৃত্তিক আর বিপাকীয় নানা ক্রিয়া-প্রক্রিয়া সাধন করার জন্য এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত থাইরয়েড হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাভাবিক অবস্থায় গলার শ্বাসনালির সামনে থাকা থাইরয়েড গ্লান্ডটি খালি চোখে দেখা যায় না। যখন থাইরয়েড গ্লান্ড ফুলে যায়, তখন গলার সামনে মাঝ বরাবর ঢোক গেলার সঙ্গে গ্লান্ডটিকে ওপর-নিচ ওঠানামা করতে দেখা যায়।

থাইরয়েড গ্রন্থি আকারে বৃদ্ধি পেয়ে গলার অগ্রভাগে ফুলা দেখা গেলে একে গলগণ্ড বলে। এর কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো–আয়োডিনের অভাব, গ্রেভস ডিজিজ, থাইরয়েডের সংক্রমণ এবং থাইরয়েডের টিউমার ইত্যাদি। তবে গলগণ্ড থাকার মানেই এই নয়, থাইরয়েড গ্রন্থি খারাপ বা এটি অপারেশন করে কেটে ফেলতে হবে। অনেকেই গলা ফুলা থাকলেই ক্যান্সার বা টিউমারের ভয় করেন; সব গলগণ্ডই খারাপ নয়।

গলগণ্ড হলে কী করবেন

গলগণ্ড মনে হলে নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ সার্জনকে দিয়ে গলা পরীক্ষা করাবেন। প্রয়োজন ও সম্ভাব্য রোগের ধরন অনুযায়ী থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট, অর্থাৎ রক্তের টিএসএইচ, ফ্রি-টিফোর, ফ্রি-টিথ্রি নামক হরমোনসহ অন্যান্য পরীক্ষা করাতে হবে। পাশাপাশি থাইরয়েডের আলট্রাসনোগ্রাফি দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। এ ছাড়া শরীরের যে কোনো জায়গায় টিউমারের মতো গলগণ্ডের ক্ষেত্রেও এফএনএসি নামক পরীক্ষা করতে দেওয়া হয় যার মাধ্যমে ক্যান্সার হয়েছে কিনা ধারণা পাওয়া যায়। পুরো কথাটা হলো, ফাইন নিড্ল অ্যাসপিরেশন সাইটোলজি। অর্থাৎ কোনো টিউমার থেকে সুচের সাহায্যে রস বের করে পরীক্ষা করা হয়। টিউমারে কোনো ক্যান্সার কোষ আছে কিনা বোঝার জন্য এফএনএসি নামক টেস্ট করতে হয়।

কখন অপারেশনের প্রয়োজন হয়

রোগীর লক্ষণ, গলগণ্ডের আকার এবং এর কারণের ওপর চিকিৎসার প্রয়োজন ও ধরন নির্ভর করে। আকারে ছোট, চোখে পড়ে না এমন উপসর্গহীন নিরীহ ধরনের (ক্যান্সার নয় এমন) গলগণ্ডের সাধারণত কোনো চিকিৎসার দরকার হয় না। সাধারণত নিম্নোক্ত কারণ বা উপসর্গ পরিলক্ষিত হলে নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ এবং হেড-নেক সার্জনরা বিভিন্ন ধরনের থাইরয়েড সার্জারির পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যেমন–

lযদি অনেক বড় আকারের গলগণ্ড বা থাইরয়েড নডুউল থাকে যা গ্লান্ডের পেছনে থাকা শ্বাসনালি, খাদ্যনালি, গলার স্নায়ু বা রক্তনালির ওপর চাপ প্রয়োগ করে এবং যার ফলে ঘাড়ের সামনে অস্বস্তিকর অনুভূতি, মাঝে মাঝে শ্বাসকষ্ট, খাবার গিলতে অসুবিধা, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন বা অন্যান্য সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে ।

l বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় থাইরয়েডের ক্যান্সার ধরা পড়লে বা সন্দেহ হলে, থাইরয়েড ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অপারেশনের কোনো বিকল্প নেই।

l এই থাইরয়েড গ্লান্ড বড় হয়ে (বিনাইন টিউমার বা নিরীহ টিউমার) যদি আপনার জীবনযাত্রার স্বাভাবিকতাকে ব্যাহত করে।

l যদি রোগী গলগণ্ডকে সৌন্দর্যহানির কারণ বলে মনে করেন। এ ছাড়া বেশি বড় হয়ে দেখতে যদি কুৎসিত বা অসুন্দর লাগে।

l রোগী যদি ক্যান্সারের ধারণা করে ভীত হয়ে থাকেন, তাহলে চিকিৎসকরা অপারেশনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

তাই গলার সামনের দিকে ফুলা দেখা দিলে অথবা গলগণ্ড হয়েছে বলে মনে করলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত একজন নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন। অপারেশনের প্রয়োজন হলে আপনার চিকিৎসকের কাছ থেকে অপারেশন সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপারেশন-পরবর্তী করণীয় জেনে নেবেন অবশ্যই।

অপারেশনের ফলে কী জটিলতা হতে পারে

থাইরয়েড গ্রন্থির পেছনে প্যারাথাইরয়েড নামে দুই জোড়া গ্রন্থি থাকে। যেই গ্রন্থির গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আমাদের শরীরে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখা। পুরো থাইরয়েড গ্রন্থি কোনো কারণে কেটে ফেলার সময় প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি হঠাৎ করে অস্ত্রোপচারের সময় ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে, যদিও বর্তমান আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে খুব কম দেখা যায় এই জটিলতা। পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের আরেকটি জটিলতা হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে, যা এক থেকে দুই ভাগ। সেটা হলো, একটি নার্ভ বা স্নায়ু থাকে, এটি আঘাত করলে বা কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে রোগীর কণ্ঠস্বর বসে যায়। তবে সার্জনরা এই ব্যাপারে আগে থেকে সতর্ক থাকার কারণে এই জটিলতাগুলো সাধারণত খুব কম পরিমাণে দেখা যায়। আমাদের দেশে দেখা যায় এখনও অনেকেই গলগণ্ডের ব্যাপারটাতে বেশ অনীহা প্রকাশ করেন এবং এর জন্য রোগীকে ও তার পরিবারকে শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাই সচেতন থাকি, সুস্থ থাকি।

[রেজিস্ট্রার, নাক-কান-গলা এবং হেড-নেক সার্জারি বিভাগ, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ]

বাংলাদেশ সময়: ১৫:৪৩:৩৯ ● ৭৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ