
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে আচরণবিধি লঙ্ঘন না করার অঙ্গীকার মানছেন অনেকেই। প্রায় সব দলের প্রার্থীরাই আচরণবিধিমালা ভাঙছেন। তপশিল ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর বিরুদ্ধে এ নিয়ে অভিযোগ আসতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনই এর মাত্রা বাড়ছে।
গত ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর গত ছয় দিনে সারাদেশ থেকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের কমপক্ষে ৮০টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। সারাদেশের রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং বিচারকদের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বাস্তবায়ন কমিটিতে জমা হয় এসব অভিযোগ। এর বাইরেও অনেক ঘটনা আছে, যেগুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর যেসব অভিযোগ এসেছে, তার মধ্যে আচরণবিধি প্রতিপালনে গঠিত নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বাস্তবায়ন কমিটি (ভ্রাম্যমাণ আদালত) ৩৫টিতে মামলা করেছে। চার লাখ ৫০ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। এই ছয় দিনে ঢাকার ২০টি আসনে ৩৫টির মতো অভিযোগ জমা পড়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় রাজধানীসহ সারাদেশে অর্ধশতাধিক প্রার্থীকে শোকজ অথবা জরিমানা করা হয়েছে।
এবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় প্রথমবারের মতো নির্বাচনী আচরণবিধিমালা মেনে চলার অঙ্গীকারনামা দিতে হয়েছিল প্রার্থীদের। তারপরও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ প্রায় সব দলের বিরুদ্ধেই অভিযোগ এসেছে।
জানতে চাইলে ইসির নির্বাচন পরিচালনা কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন-সংক্রান্ত অনেক লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেগুলো পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ফাইলে নথিবদ্ধ করে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। আরও কিছু অভিযোগ ইসির আইন শাখা থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।
এবার আচরণবিধি প্রতিপালনে ‘নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি’র নাম পরিবর্তন করে ‘নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে আছেন ৩০০ জন বিচারক। তারা আচরণবিধিমালা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তিন দিনের মধ্যে ইসিতে প্রতিবেদন জমা দেবেন। তাদের বিচারিক ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। ফলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য এই কমিটি তাৎক্ষণিক বিচার ও শাস্তি দিতে পারবে। ইসির আচরণবিধিমালা অনুযায়ী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্তসাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।
প্রচারণা শুরুর আগের দুই সপ্তাহের চিত্র
তপশিল ঘোষণার পর থেকে ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগের দিন পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ও শাস্তি প্রদানের অন্তত ৭৭টি ঘটনার তথ্য ইসি সূত্র থেকে পাওয়া গেছে। গত ৮ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই সপ্তাহে সারাদেশে এসব ঘটনায় ৫৯টি মামলা হয়েছে। নির্বাহী হাকিমরা ৮ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত আচরণবিধি প্রতিপালন/অভিযোগ নিয়ে ৬৭ নির্বাচনী এলাকায় ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা করেছেন। নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি ৪ জানুয়ারি থেকে ৮৭৩টি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে ইসি সচিবালয়ে। এর মধ্যে পোস্টার অপসারণে ১২৫টি ব্যবস্থা এবং ১৯০টি বিষয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটে উপস্থাপনের জন্য ৭৫টি, সামারি ট্রায়ালে জরিমানা চারটিতে এবং বিবিধি ৪৭৯টি বিষয় রয়েছে।
এ নিয়ে ৮ থেকে ২৬ জানুয়ারি সোমবার পর্যন্ত প্রায় ২০ দিনে আচরণবিধি ভঙ্গের মোট অভিযোগ এসেছে ১৪৪টি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৯৪টি মামলায় ৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। সারাদেশের ১২৮টি নির্বাচনী এলাকা থেকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের এসব অভিযোগ এসেছে।
এই সময়ে ২৭ জেলায় অন্তত ৭৩ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন বিএনপির ৩৫ জন, জামায়াতে ইসলামীর ১৮, এনসিপির ৪ ও ইসলামী আন্দোলনের ৩ জন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দুজন; গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফতে মজলিস, এবি পার্টি ও লেবার পার্টির একজন করে আছেন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন পাঁচজন।
অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত প্রার্থীদের সতর্ক করা হয়েছে। কোথাও কোথাও জরিমানা ও মামলা হয়েছে। তবে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এখন পর্যন্ত কারও কারাদণ্ড হয়নি বলে ইসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অপরাধভেদে সর্বনিম্ন ৫০০ থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়েছে।
ঢাকায় ৩৫ অভিযোগ
দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা জেলার ২০টি আসনে গত বৃহস্পতিবার থেকে ছয় দিনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অন্তত ৩৫টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে প্রচারণা শুরুর পর ঢাকা মহানগরীর ১৩টি সংসদীয় আসনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ২৩টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এ ছাড়া প্রচার শুরুর আগে আরও তিনটি অভিযোগ জমা পড়ে।
এই কার্যালয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান ও ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ জমা পড়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর আগের দিন বুধবার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান। অভিযোগে বলা হয়, গত ২১ জানুয়ারি রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে এক জনসভায় বস্তিবাসীর জন্য সেখানে আধুনিক আবাসনের ব্যবস্থা করা ও ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান। এটি আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
একই রকমের অভিযোগে একই দিন বিএনপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আবেদন জমা দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ। এ ছাড়া রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রতীক বরাদ্দকালে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একই অভিযোগ করে বলেন, তারেক রহমানের কড়াইল বস্তিবাসীকে ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আচরণবিধি লঙ্ঘন।
এদিকে, গতকাল ঢাকা-৬ আসনের বিএনপি প্রার্থী ইশরাক হোসেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের তিনটি পৃথক অভিযোগ দায়ের করেছেন। জামায়াতের প্রার্থী এ আসনের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে জনগণের মধ্যে বিরিয়ানি বিতরণ করে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে ইশরাকের অভিযোগ। এ ছাড়া তিনি গত ২১ জানুয়ারি ঢাকা-৬ সংসদীয় আসনে নির্বাচন কার্যালয় স্থানান্তর ও কর্মকর্তাদের বদলি প্রসঙ্গে আরেকটি অভিযোগ দায়ের করেন।
গত রোববার ঢাকা-১২ আসনে জনতার দল প্রার্থী ফরিদ আহমেদ অভিযোগ জমা দিয়েছেন তাঁর ব্যানার ছিঁড়ে অন্য প্রার্থীর ব্যানার টানানোর কারণে। তাঁর অভিযোগ, পূর্ব নাখালপাড়ার জরিনা হোটেল মোড় থেকে রেলগেট পর্যন্ত রাস্তায় ১৭টি ব্যানার ছিঁড়ে সেখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর ব্যানার টানানো হয়েছে।
এ ছাড়া আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পরদিন শুক্রবার আচরণবিধি ভেঙে ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ড. এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে পোস্টার লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। ওই দিন বিকেলে রাজধানীর পূর্ব রামপুরার মারকাযুত তাকওয়া বাংলাদেশ মাদ্রাসার সামনে ও আশপাশের বিভিন্ন গলির মধ্যে তাঁর নির্বাচনী পোস্টার সাঁটানো দেখা গেছে।
ঢাকা-১১ আসন ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র সহকারী সচিব নীলুফা ইয়াসমিন চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘প্রতিদিন ভ্রাম্যমাণ পরিচালনা করা হচ্ছে। একদিকে পোস্টার নামিয়ে ফেললে আরেকদিকে লাগায়। আমরা সিটি করপোরেশনকে কোথাও যেন পোস্টার না থাকে, সেটি দ্রুত অপসারণ করা হয়– এ জন্য তপশিল ঘোষণার পর থেকেই বারবার তাগিদ দিচ্ছি। পোস্টার লাগানোর সময় কাউকে পেলেই সঙ্গে সঙ্গে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কাউকে পাওয়া না গেলেও সে ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগীয় কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে তিনজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঝালকাঠি-১ আসনের প্রার্থী ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান। নাহিদ ও পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে বড় আকারের রঙিন ছবিসহ ‘দেশ সংস্কারের গণভোট, হ্যাঁ-এর পক্ষে থাকুন’ স্লোগানসংবলিত বিলবোর্ড টানানোয় তাদের শোকজ করা হয়। পরে তারা শোকজের জবাব দেন। আর ইরান ইতোমধ্যে তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন।
ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য কর্মকর্তা তানজীব হাসান হৃদম বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আসা অভিযোগগুলো সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে খতিয়ে দেখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদের থেকে আসা প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ঢাকা-১৩ ও ঢাকা-১৫ আসনের রিটার্নিং কমকর্তা ছাড়াও বাকি পাঁচ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অন্তত ৯টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রচারণা শুরুর আগেই ঢাকা-১৩ আসনের প্রার্থী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মামুনুল হক নির্বাচন কমিশনের সামনে লিফলেট বিতরণ করার পাশাপাশি ভোট চেয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁকে শোকজ করা হয়।
গত শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে আট জেলায় ৮ আচরণবিধি লঙ্ঘন হওয়ার অভিযোগ তোলেন জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, প্রত্যেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আচরণবিধি মেনে চলার বিষয়ে দলীয় প্রধান ও প্রার্থীর অঙ্গীকারনামা রয়েছে। এটি একটা ভালো ফল এনে দিয়েছে। অতীতের নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা তুলনামূলক কম হয়েছে। রাস্তাঘাট, বাজার ও মাঠে-ময়দানে গেলেও দেখা যাবে, নির্বাচনের সময়ও অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রয়েছে। এর কারণ, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থী ও দলের লিখিত অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেন, পাশাপাশি রিটার্নিং কর্মকর্তা ও মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনী কাজে দায়িত্বপ্রাপ্তরা আচরণবিধি প্রতিপালনে উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম করেছেন। ফলে এবার আচরণবিধি প্রায় শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন মনে করে।
ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সমকালকে বলেন, তপশিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের মাঠে আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী হাকিম ও বিচারিক হাকিমদের কমিটি কাজ করছে। তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে।