
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানযুদ্ধের মেয়াদ যত দীর্ঘ হচ্ছে, বাংলাদেশে ততই সংকট বাড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। সরকার একদিকে বলছে জ্বালানি সংকট নেই। অন্যদিকে প্রতিনিয়ত তেলের পাম্প ও ডিপোগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। সরকার সব ধরনের জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে। অফিস ও দোকানপাট খোলা বা বন্ধের নতুন নিয়ম ঘোষণা করেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা মেনে চলতে বলছে দেশবাসীকে। সরকারের এসব উদ্যোগের লক্ষ্য আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা।
এদিকে ইরানযুদ্ধের ফলে অনেক দেশেই জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে অনেক দেশে জ্বালানি তেল ও পণ্যের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশে দাম না বাড়লেও একাধিক সূত্র জানায়, দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে সরকার। বিশেষ করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি বিশ্লেষণ করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এদিকে বাড়ছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। বিশেষ করে এপ্রিল-মে মাস গরম ও শুষ্ক থাকে, এ সময় কৃষির সেচকাজে বিদ্যুৎ ও তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়। ফলে ইরানযুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকার নানা উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এখন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল, এলএনজি অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। সরকারি রিজার্ভে চাপ পড়ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি আমদানির স্বাভাবিক সময়েও দেশে লোডশেডিং করতে হয়। এখন যুদ্ধের কারণে এলএনজি, জ্বালানি তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া চলতি বছর সর্বোচ্চ গরম পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে আগামী দুই-তিন মাস বিদ্যুৎ সরবরাহ সামলানো নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের উদ্বেগ রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসূত্রে জানা যায়, এপ্রিল ও মে মাসে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নানা পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসাব অনুযায়ী, এই দুই মাসে বিদ্যুতের চাহিদা থাকবে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত। তবে ইরানযুদ্ধ, এলএনজি আমদানি ও জ্বালানি তেলের সংকট, নিজস্ব গ্যাসপ্রাপ্তি ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া, সর্বোপরি আর্থিক সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহের কিছু কৌশল প্রণয়ন করেছে। এসব কৌশলের মধ্যে রয়েছে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং বা লোড ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধের কারণে সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ একটা বড় সমস্যার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। মার্চ মাস ভালোভাবে পার হলেও এপ্রিল এবং মে মাস নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এ সময় এলএনজি সরবরাহ কমে গেছে। গ্যাসসংকটের কারণে প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎকেন্দ্র সারা বছরই বন্ধ থাকে। অর্ধেক চালু থাকলেও গ্যাসসংকটে সব সময় চালু রাখা কঠিন।
সূত্র জানায়, এ বছর মার্চ-এপ্রিলে গড়ে ৮০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হতে পারে- এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কমপক্ষে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। এর চেয়ে কম গ্যাস সরবরাহ করা হলে লোডশেডিং এক হাজার মেগওয়াট পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে। জানা গেছে, এপ্রিল-মে মাসে পেট্রোবাংলা সর্বোচ্চ ৯০০ মিলিয়ন ঘটফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটে সার আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরকার গ্যাস সরবরাহ দিয়ে কয়েকটি সার কারখানা চালু করবে। ফলে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ আরও কমবে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
দুই মাসের সরবরাহের ব্যাপারে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াটের পরিকল্পনা রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে রয়েছে পাঁচ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট। তেলভিত্তিক বিদুৎকেন্দ্র ব্যয়বহুল হওয়ায় দিনের বেলা চালাতে চায় সরকার। অন্যদিকে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ভারত থেকে দুই হাজার ৬৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে গতকাল বিকাল পর্যন্ত পিডিবির ওয়েবসাইটে দেখা যায়, বিদ্যুতের চাহিদা ১২ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট, তবে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৪১৫ মেগাওয়াট। গতকাল পর্যন্ত দেখা যায় আদানি থেকে বিদ্যুৎ এসেছে মাত্র ৭৬৩ মেগাওয়াট, ত্রিপুরা থেকে ১৯২ মেগাওয়াট, ভেড়ামারা থেকে বিদ্যুৎ আসছে ৮৯৬ মেগাওয়াট। আদানি থেকে ১৫০০ মেগাওয়াটের পরিবর্তে অর্ধেক বিদ্যুৎ আসার বিষয়ে জানা যায়, তাদের কারিগরি ত্রুটির কারণে অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, আদানি থেকে অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। অর্থাৎ একটি ইউনিট চলছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে অন্য ইউনিটটি বন্ধ আছে। ১১ এপ্রিলের পর বাকি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
জানা যায়, এ বছর গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে। বিপিডিবি থেকে পেট্রোবাংলার কাছে ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলা এখন গড়ে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ করছে। এলএনজি কার্গো আসতে না পারায় সেটা ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহে নেমেছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কীভাবে স্বাভাবিক রাখা যাবে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যাতে পুরোদমে চালানো যায় সে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সবগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে। শুধুমাত্র নরিনকোর একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ আছে। এপ্রিল মাসের পুরো কয়লা রয়েছে। আরও কয়লা আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে সব দোকানপাট ও শপিংমল সন্ধ্যা ছয়টার পরিবর্তে সাতটা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির নেতারা অন্তত সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার আবেদন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী দোকান মালিক সমিতির আবেদন বিবেচনায় নিয়ে আগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেছেন। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা যাবে।