জ্বালানি সংকটে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ধাক্কা

Home Page » জাতীয় » জ্বালানি সংকটে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ধাক্কা
রবিবার ● ১২ এপ্রিল ২০২৬


জ্বালানি সংকটে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ধাক্কা

জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক অস্থিরতা এবার সরাসরি ধাক্কা দিচ্ছে বাংলাদেশের ভেতরের অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন, সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল পরিস্থিতি, যার প্রভাব পড়ছে ঢাকার বাজার থেকে গ্রামাঞ্চলের রান্নাঘর পর্যন্ত। জ্বালানি তেলের দাম, সরবরাহ এবং প্রাপ্যতা এই তিনের টানাপড়েনে বদলে যাচ্ছে মানুষের চলাচল, ব্যয় ও জীবনযাপনের ধরন।

এমন অবস্থায় পাকিস্তানের ইসলামাবাদে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি আলোচনার দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই আলোচনা শুধু একটি কূটনৈতিক ঘটনাই নয়, বরং তা নির্ধারণ করতে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজার কত দ্রুত স্থিতিশীল হবে, নাকি আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে যাবে। তবে বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ থেমে গেলেও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে; ফলে স্বল্পমেয়াদে সংকট কাটার কোনো সহজ ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সত্যিকার অর্থে গত ৪০ দিনের যুদ্ধে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা গেলেও অনেক বেগ পেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। তিনি বলেন, শুরুতে আমাদের ধারণা ছিল এই যুদ্ধ হয়তো আগের বারের মতো এক দুই সপ্তাহে থেমে যাবে। তবে টানা ৪০ দিন চলার পরও ততটা উন্নতি দেখছে না। এ কর্মকর্তা বলেন, আমরা ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত তেহরান ওয়াশিংটনের আলোচনার দিকে তাকিয়ে আছি। আশা রাখছি সমাধান হবে। সেটা না হলে সংকট কেবল বাড়তেই থাকবে।

জ্বালানি বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, ইরান-আমেরিকার যুদ্ধবিরতি বা বন্ধের আলোচনা সবে শুরু হয়েছে। এখনও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি চালু হয়নি। এ ছাড়া যুদ্ধ শেষ হলে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ে এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায় করতে চায়। এ ছাড়া এমন আলোচনাও এসেছে যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষ যে মাইন স্থাপন করেছে সেগুলো অপসারণও সময়সাপেক্ষ বিষয়। ফলে খুব দ্রুত জ্বালানি তেলের আমদানি সরবরাহ চেইন যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে আসবে সেটা বলা যাচ্ছে না। কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার এখন সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বিভিন্ন দেশ থেকে বেশি দামে জ্বালানি তেল আমদানি করছে। তবে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি স্বাভাবিক না হলে অব্যাহতভাবে বেশি দামে তেল আমদানি করাও কঠিন হবে। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার মতে, জ্বালানি তেলের আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিশ্ববাজার ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে।

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় মোটরসাইকেলের তেলের জন্য অপেক্ষা করছিল আফজাল নামে এক বাইকার। তিনি বলেন, কখনও এক ঘণ্টা, কখনও তার চেয়ে বেশি সময় অপেক্ষা করে তেল সংগ্রহ করতে হয়। তেল সংগ্রহ করতে অনেক ঝক্কি ঝামেলা হওয়ায় রোজগার কমে গেছে। আফজাল আরও বলেন, জ্বালানি তেল সংগ্রহ ও সংকটের কারণে রাস্তায় গাড়ি কমে গেছে। ফলে রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা থাকায় অনেক যাত্রী এখন বাইকে না চড়ে বাসে চড়ে চলে যাচ্ছে।

জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ে অস্থিরতার কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়েছে। বেশি দামে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করায় রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্বালানি আমদানিতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল না পেয়ে শিল্প কারখানা, বিভিন্ন খাতের ব্যবসায় ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মো. মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, আমরা পরিবহন, কৃষি, শিল্পকারখানা সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি তেল সরবরাহ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। তবে মজুদের প্রবণতা ঠেকাতে নানা দিক বিশ্লেষণ করে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে। আগের মতো যে যত চাইছে ততটুকু দেওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়াটা অবশ্যই যুদ্ধ বন্ধের ওপর নির্ভর করে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, যেকোনো যুদ্ধেই বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইরান যুদ্ধের কারণে সেটা ক্রমান্বয়ে খারাপ দিকে যাচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ডলারের দামটা ওঠানামা করছে। আগামীতে পরিস্থিতি বুঝতে দুটি বিষয় দেখতে হবে রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে কতটুকু প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, এ যুদ্ধে জ্বালানি তেলের স্বাভাবিক প্রবাহ ছাড়াও নানা ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ছে জনশক্তি রপ্তানি, শিল্পকারখানায় উৎপাদন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। তিনি বলেন, আপাতত জ্বালানিতে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। যুদ্ধ থামলেও তেলের দাম খুব দ্রুত সেই ৮০ ডলার বা ৭০ ডলারে তেলের যাবে না।

বাংলাদেশ সময়: ১০:৩৭:৪৮ ● ৮ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ