খরচের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ

Home Page » জাতীয় » খরচের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ
শনিবার ● ১৮ এপ্রিল ২০২৬


খরচের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ

বাজারে ঢুকলেই গায়ে লাগে দামের ধাক্কা। শুধু বাজার নয় — হাসপাতালের বিল, সন্তানের স্কুলের ফি, বাসাভাড়া, যাতায়াত — প্রতিটি খাতেই চাপ বেড়েছে। অথচ সেই অনুপাতে বাড়েনি মানুষের আয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সংসার এখন যেন এক অদৃশ্য যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট এই চাপকে আরও ঘনীভূত করেছে। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় নিত্যপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন যাঁরা চাকার ওপর নির্ভর করে জীবিকা চালান।
দেশে রাইড শেয়ারিং খাতে কর্মরত আছেন অন্তত ১০ লাখ মানুষ। পাঠাও ও উবারে নিবন্ধিত চালকের সংখ্যা কয়েক লাখ। জ্বালানির লাইনে দাঁড়িয়েই এই চালকদের দিনের অর্ধেকের বেশি সময় কেটে যাচ্ছে। ফলে কমে গেছে আয়, বেড়েছে অনিশ্চয়তা। এর ওপর শপিং মল ও বাজার সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশনায় ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন চাপে।

ঢাকা হোক বা জেলা শহর — বাজারে এখন অনেকেই হাত গুটিয়ে ফিরছেন। প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা কমিয়ে দিয়েছেন অনেকে, কেউ কেউ খালি হাতেই বাড়ি ফেরেন। পরিবারের চাহিদা পূরণ তো দূরের কথা, তিন বেলার খাবার জোগানোই এখন অনেকের কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ চিকিৎসার খরচ সামলাতে গিয়ে নতুন করে দারিদ্র্যে পড়ছেন। অনেকে সুদে ঋণ নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন, পরে সেই ঋণ শোধ দিতে গিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে জমিজমা। বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা মিলছে না — এই ক্ষোভ এখন সর্বস্তরে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই ভঙ্গুর চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক হামের প্রকোপে। গত এক মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৭টি শিশুর, উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ১৭৪ জন।

শিক্ষার খরচও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে দিন দিন। স্কুলের বেতন, কোচিং, প্রাইভেট টিউটর ও বই মিলিয়ে খরচ বেড়েছে ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত। মাধ্যমিক পর্যায়ে এই চাপ সবচেয়ে বেশি।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষায় গড় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। একটি বেসরকারি গবেষণা বলছে, বর্তমানে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী কোনো না কোনো পর্যায়ে ঝরে পড়ছে — যার মূল কারণ দারিদ্র্য। উদ্বেগজনকভাবে, দেশের প্রায় ৭ শতাংশ পরিবারকে সন্তানের পড়ালেখার খরচ চালাতে ঋণ নিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে — যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ — ঈদকেন্দ্রিক চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই চাপ আরও বেশি অনুভূত হয়েছে।
একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ — অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির নিচে। সহজ ভাষায়, মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। বেতন বাড়লেও সেই টাকায় আগের মতো পণ্য মিলছে না।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “দেশে এখন প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছেন।”
তিনি আরও বলেন, “অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে, কর্মসংস্থান সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী থাকলে অনেক বিপদ এড়ানো যেত। শিক্ষার ব্যয় বাড়ায় অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথে ঝরে পড়ছে — আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হারাচ্ছি। সব মিলিয়ে আমরা এখন এক কঠিন সময় পার করছি।”

বেসরকারি চাকরিজীবী থেকে রিকশাচালক, গৃহিণী থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী — জীবনের প্রতিটি স্তরে এখন একটাই প্রশ্ন: মাস শেষে টিকে থাকা যাবে তো?

বাংলাদেশ সময়: ১০:২১:৩৫ ● ১১ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ