
মধ্যপ্রাচ্যের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও শান্তির একটি আলো দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখন একটি পরমাণু চুক্তির খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরসহ প্রায় সব দাবিতেই সম্মতি দিয়েছে। চুক্তি চূড়ান্ত হলে তিনি নিজে ইসলামাবাদে গিয়ে তাতে সই করতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ট্রাম্পের বার্তা: চুক্তি না হলে যুদ্ধ ফিরবে
নেভাদার লাস ভেগাসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, “ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সাফল্যের সঙ্গে এগোচ্ছে এবং এটি শিগগিরই শেষ হবে।” হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে পরবর্তী বৈঠক এই সপ্তাহের শেষ দিকে হতে পারে। তবে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি — চুক্তি না হলে যুদ্ধ আবার শুরু হবে।
একই সঙ্গে তিনি জানান, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ এখনো কার্যকরভাবে বজায় রয়েছে।
তেহরানের বক্তব্য: শান্তি চাই, তবে মর্যাদার সঙ্গে
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বলেন, “ইরান পরমাণু অস্ত্র চায় না, এই অঞ্চলে অস্থিরতা বা সন্ত্রাসবাদও চায় না।” তেহরান আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে মর্যাদার সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক কমান্ডার, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের হত্যার মাধ্যমে এই অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক মধ্যস্থতার জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান পেজেশকিয়ান।
দ্বিতীয় দফা বৈঠকের তারিখ এখনো অনিশ্চিত
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বিতীয় দফা বৈঠকের কোনো তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে পরমাণু ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইদ খাতিবজাদেহ কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেছেন, তেহরান কোনো আংশিক বা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি মানবে না। লেবানন থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত সব সংঘাতপূর্ণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত না হলে কোনো যুদ্ধবিরতি গ্রহণযোগ্য নয় — এটিকে ইরানের ‘রেডলাইন’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সেন্টকমের সামরিক মোতায়েন
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোয় অবরোধ কার্যকর রাখতে তারা ১২টি জাহাজ, ১০০টি উড়োজাহাজ ও ১০ হাজারেরও বেশি সেনা মোতায়েন করেছে। তবে সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে, হরমুজ প্রণালি নয়, কেবল ইরানের বন্দর ও উপকূলরেখাকে লক্ষ্য করেই এই অবরোধ পরিচালিত হচ্ছে।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর, তবে অনিশ্চয়তা কাটেনি
স্থানীয় সময় ভোর ৩টা থেকে লেবাননে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। যুদ্ধবিরতির আগমুহূর্তে দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। পাল্টা রকেট হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও এটি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
হরমুজ উন্মুক্ত, বাজারে স্বস্তির প্রত্যাশা
লেবানন যুদ্ধবিরতির প্রতি সংহতি জানিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’ ঘোষণা করেছে ইরান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ জানান, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ পর্যন্ত সব বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথে অবাধে চলাচল করতে পারবে — তবে ইরানের নির্ধারিত সমন্বিত রুট অনুসরণ করে।
এই সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আরসেনিও ডোমিঙ্গেজ স্পষ্ট জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। স্পেনের গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলের অধিকার কোনো আলোচনার বিষয় নয়।”