জ্ঞান পিপাসু ও বই প্রেমী মানুষের গল্প-২
প্রসঙ্গক্রমে আর একজন পুস্তক প্রেমীর দুটি কথা বলা আবশ্যক মনে করছি। তিনিও অর্থের অভাবে কোন দিন স্কুলে যেতে পারেননি। কিন্তু তার অদম্য বাসনা তাকে বিদ্যানের চেয়েও বিদ্যান বানিয়ে দিয়েছে। অদম্য জ্ঞান পিপাসা তার শত প্রতিকূলতাকে পরাজিত করেছে। দারিদ্র তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তার এই বিদ্যলাভের কাহিনী কোন ভাবেই অনুকূল ছিল না। কল্পনার চেয়েও বেশি তিনি করেছেন লেখাপড়ার জন্য। জানার জন্য, জ্ঞান লাভের জন্য। পরে তিনি বইও লিখেছেন। তার লিখা বইগুলো মূল্যবান। তিনি হলেন আরজ আলী মাতুব্বর। তার লেখা বই অনেকের ভালো লাগে, অনেকের হয়তো নয়। আমি তার লেখা নিয়ে নয়, আজ তার শিক্ষিত হওয়ার গল্পটি শুধু বলতে চাইছি।
বরিশাল শহর থেকে এগারো কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকের চরবাড়িয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত লামছরি নামক গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। তিনি বাংলা ১৩০৭ বঙ্গাব্দের ৩ পৌষ, মোতাবেক ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ডিসেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন। ৮৬ বছরের দীর্ঘ জীবনের অধিকারী এই দার্শনিকের ১৯৮৫ সালের ১৫ মার্চ জীবনাবসান ঘটে। তার জীবনের ৭০টি বছরই কেটেছে লাইব্রেরীতে। তিনি জ্ঞান বিতরনের জন্য তার অর্জিত সম্পদ দিয়ে গড়ে তুলেছেন “ আরজ আলী মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরী “। তার লাইব্রেরীতে সংগৃহীত বইয়ের মধ্যে ছিল সাহিত্য, গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, ভ্রমণ, পুথি, ও মাসিক পত্রিকা। প্রায় দেড় হাজারের মতো বই ছিল তার সংগ্রহে। কিন্তু বইগুলো দুবার ঘুর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে সব বিনষ্ট হয়। তিনি লিখেছেন, “ পরিতাপের বিষয় এই যে, আলমারী ছিলনা ব’লে বইগুলো রাখা হচ্ছিল আমার বৈঠকখানায় তাকে তাকে সাজিয়ে। ১৩৪৮ সালের ১২ই জ্যৈষ্ঠ শুরু হ’ল সর্বনাশা ঘুর্ণীঝড়। আমার বৈঠকখানা নিল উড়িয়ে, তৎসহ বইগুলোও। পরের দিন মাঠে-পথে পাওয়া গেল দু’-একখানা ছেঁড়া পাতা। বিনষ্ট হলো প্রায় বাইশ বছরের সাধনার ধন, হৃদয়ে রক্ত শুকিয়ে গেল। ব্যথা রোধ করতে পারিনি। যদিও প্রদাহটা আগের মত নেই, তথাপী হৃদয়ের ক্ষত আজও মোছেনি “। পরের বার আবারও একই ট্রেজেডির মুখোমুখি হন তিনি। তিনি আবারও যে বই সংগ্রহ করেছিলেন, তারও একই পরিণতি হয়। তিনি লিখেন, “ মনের দুর্দমনীয় আকাঙ্খা কমাতে না পেরে আবার পুস্তক সংগ্রহ শুরু করলাম। প্রায় আঠার বছরের প্রচেষ্টায় পৌনে চারশ বই সংগ্রহ করলাম। কিন্তু ১৩৬৫ সালের ৬ই কার্তিক ঘটল – ১৩৪৮ সালের ১২ই জ্যৈষ্ঠের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। বন্যায় আমার জীর্ণ কুঁড়ে ঘরখানা ভেঙ্গে পড়ল এবং বইগুলো উধাও হয়ে গেল। সেদিন হ’ল আমার প্রায় ৪০ বছরের সাধনার নিষ্ফল পরিসমাপ্তি”। আরজ আলী তখন এতটাই ব্যথিত হয়ে ছিলেন যে, তিনি বলেছেন , ”আমি পুত্রবিয়োগের ব্যথা অনুভব করছি”।
তিনি বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্যপদ ( ১৯৮৫) , বালাদেশ লেখক শিবিরের হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার ( ১৯৭৮ ) এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ( বরিশাল শাখা) সম্মাননা ( ১৯৮২ ) লাভ করেন। তিনি মূলত বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী হয়ে উঠে ছিলেন। তার রচনায় মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদী দর্শনের ছাপ প্রকট। মানব কল্যাণ ও বিশ্বধর্ম আদর্শে উদ্বুদ্ধ তিনি দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের জন্য বৃত্তি প্রদান, পাঠাগার স্থাপন ও রচনা প্রতিযোগীতার ব্যবস্থা করেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ (১) ম্যাগগ্লেসান চুলা - ১৯৫০ (২) সত্যের সন্ধানে - ১৯৭৩ (৩) সৃষ্টির রহস্য -১৯৭৭ (৪)স্মরণিকা - ১৯৮২ (৫) অনুমান -১৯৮৩ (৬) মুক্তমন- ১৯৮৮ । এখানে আমি শুধু তার প্রতিকূলতার মধ্যে বিষ্ময়করভাবে স্বশিক্ষিত হবার কঠিন এক অধ্যবসায়ের কাহিনীটি বলতে চাই।
প্রথাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ,বা গুরুর সহায়তায় নয়, একবারেই নিজের চেষ্টায় তিনি যে বিদ্যালাভ করেছেন তা কল্পনাকেও হার মানায়। অত্যন্ত পশ্চাদপদ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও নিভৃত এক গ্রামে থেকে তিনি নিজেকে শিক্ষিত করেছেন। যদি পোস্ট গ্রেজুয়েটকে উচ্চ শিক্ষিত ধরা যায়, তবে সেই উচ্চ শিক্ষিতদের শতকরা নব্বইভাগ লোকের কাছ থেকে শিক্ষার প্রতিফলন পাওয়া যায় না। আমি আচরণের কথা বলছি না, জ্ঞানের পরিধির তথা জ্ঞানের আলো বিকিরনের কথা বুঝাতে চাচ্ছি। সমাজকে নিজের শিক্ষার প্রতিদান বিতরনের কথা বলতে চাই। সবার লেখা সকলের নিকট পছন্দ হয়না। আমরা সবার লেখা সকলে পড়িও না। তাই বলে লেখকদেরকে যেমন অজ্ঞ বলা যাবে না, ঠিক আরজ আলী মাতুব্বরকেও নয়। তিনি সত্যসন্ধানী , কুসংস্কার বিরোধী এবং বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষ ছিলেন। তিনি তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন সেই কথা। তিনি বলেছেন-”সাধু-সজ্জনেরা বলেন যে, জগত অনিত্য। অর্থাৎ জগত বা জগতের মধ্যে “ চিরস্থায়ী “ বলে কিছুই নেই। আর বিজ্ঞানীরা বলেন যে, সৃষ্টি বৈচিত্রের মূলে রয়েছে পরিবর্তন বা বিবর্তন। তিনি আরও বলেছেন যে, - ”আমার মনকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে বিজ্ঞান, বিশেষতঃ প্রকৃতি বিজ্ঞান। ওসব পড়ে ওতে আমার অনেক গুলো ধাঁধাঁর সমাধান পেলাম, কিন্তু তা ধর্মীয় মতের বিপরীত, বাস্তব মুখী”। ( চলবে )