
জ্ঞান পিপাসু ও বই প্রেমী মানুষের গল্প-২
( পূর্বে প্রকাশিতের পর )
আরজ আলী মাতুব্বরের রচনা দেখে অনেকেরই সন্দেহ হয়েছে যে এ সব রচনা আরজ আলী নামের কেহ ছদ্মনামে লিখে থাকতে পারে। এ বিষয়ে জনাব আয়ুব হোসেন লিখেছেন যে, “ আরজ আলী মাতুব্বর নামের আড়ালে ভিন্ন কেউ তার বক্তব্য প্রকাশ করেছেন কিনা সে প্রশ্ন উঠেছে। হয়তো ছদ্মনামধারী কেউ সত্যের সন্ধান ও সৃষ্টি রহস্য বই দু’খানি লিখেছেন। তৎকালীন সরকারের শিক্ষা বিভাগের একজন পদস্থ কর্মকর্তা তো আরজ আলীকে তার বাসায় ডেকে নিয়ে রীতিমত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছিলেন। এ ঘটনা সম্পর্কে মাতুব্বর এক স্থানে লিখেছেন, “রাজধানীর বুদ্ধিজীবী মহলের অনেকেই বই দুখানা আমার বলে স্বীকার করতে চাননি। তাঁরা অনেকেই বলেছেন যে, পল্লীবাসী কৃষকেরা নিরক্ষর হলেও সাধারণত ভালো মানুষ এবং বেশিরভাগই ঈমান ধনে ধনী। তাদের মধ্যে এমন আনাড়ীলোক ও তার এ সমস্ত দান থাকা অসম্ভব। এ বই নিশ্চয়ই কোনো বুদ্ধিজীবীর লেখা। হয়তো তিনি ধুরন্ধরী করে নাম দিয়েছেন একজন কৃষকের। বই দুখানা লেখা আমার পক্ষে সম্ভব কিনা তা যাচাই করবার জন্য প্রাক্তন ডি,পি আই জনাব ফেরদাউস খান তো তাঁর ধানমন্ডির বাসায় আমন্ত্রণ করে নিয়ে রীতিমত পরীক্ষাই নিলেন ০৩/০১/৭৬ তারিখে। পরীক্ষাকালে সেখানে উপস্থিত ছিলেন জনাব আ, ন ম এনামুল হক এবং চিত্রশিল্পী কাজী আবুল কাসেম সাহেব “।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ শামসুল হক আরজ আলী মাতুব্বরের সমগ্র রচনাবলী নিয়ে তিন খন্ডে প্রকাশিত ” আরজ আলী আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্রের “ উপর বিস্তারিত ভাবে লিখে একটি মুখবন্ধ দিয়েছেন। এই অধ্যাপকের লিখা হতেও জ্ঞানের সাগর আরজ আলীর জীবনের অনেক কথা জানা যায়। বাইশ পৃষ্ঠাব্যপী সেই লেখায় তিনি অনেক ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। কৈশোর বয়সে আরজ আলীর একমাত্র অবলম্বন তার স্নেহময়ী জননীর মৃত্যু তাকে ভীষণ ভাবে কাতর করে। তার চেয়েও বেশি আহত হন যখন তার মায়ের মৃত্যুর পর স্মৃতি ধরে রাখতে একটি ছবি তুলেন, তখন আগত সব মুসল্লীগণ যখন তার মাকে আর জানাজা দাফন-কাফন না দিয়েই চলে যান। তখনকার দিনে ফটোগ্রাফার পাওয়াও দুঃসাধ্য ছিল। তিনি বরিশাল সদর থেকে গিয়ে ফটোগ্রাফার নিয়ে এসে ছবি তুলেছিলেন। এই অযুহাতে তার মায়ের জানাজা না দিয়ে মুসুল্লীগন চলে যাওয়াতে অনুসূচনায় তিনি খুবই কাতর হন। প্রশ্ন জাগে তার মনে, কি পরিমাণ অপরাধ তিনি করে ফেলেছন? তার মা জীবনে কোনদিন নামাজ কাজা করেননি, রোজাও কোনদিন বাদ দেননি। ভীষণভাবে আহত হন তিনি। এটাই তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। সেখান থেকেই জানার আগ্রহ কৃষক আরজ আলীকে দার্শনিক আরজ আলী করে তুলে। এ বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক মুহম্মদ শামসুল হক লিখেছেন, “ আরজ আলী মাতুব্বর ছিয়াশি বছরের জীবনে প্রায় সত্তর বছর জ্ঞানসাধনা করেছেন। নিজের শ্রম, বুদ্ধি ও মেধা দিয়ে তিনি তাঁর আর্থীক অবস্থার উন্নতি সাধন করেছেন। জমিদার ও মহাজনদের কাছ থেকে বন্ধককৃত জমি-জমা উদ্ধার করেছেন। শুধু তাই নয়, নিজের প্রচেষ্টায় লেখাপড়া শিখেছেন। কৈশোরের একটি ঘটনা তাঁকে সত্যসন্ধ করে তোলে। তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের ছবি তোলার দায়ে মৃতদেহ কেউ জানাজা পড়ে দাফন করতে রাজি হয়নি। শেষে বাড়ীর কয়েকজন লোক মিলে তাঁর মায়ের সৎকার করেন। আরজ আলী মাতুব্বর সামাজিক এই আঘাতের পর সত্য অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হন। ধর্মের নামে কুসংস্কার সত্য না বিজ্ঞান লব্ধ জ্ঞান সত্য?
তিনি আরও লিখেছেন, “ মাতুব্বর সাহেব পড়াশোনা করতেন প্রচুর, ভাবনা-চিন্তা করতেন আরো বেশী, বলতেন খুবই কম, লিখতেন আরো কম। একটা প্রবাদ আছে-”আঘাত করিলে কাংসে ( কাঁসায় ) যত শব্দ হয়, স্বর্ণে তার শতাংসের একাংশও নয়”। তিনি তাঁর প্রয়োজনীয় বক্তব্য প্রকাশ করা ছাড়া বাহুল্য লেখা পছন্দ করতেন না। সেজন্য তাঁর লেখার পরিমাণ খুব কম। ব্যক্তিগত জীবনে মৃদু এবং মিষ্টভাষী ছিলেন। তাঁর মতের পরিপন্থী কোন বিষয়ের অবতারণায় তিনি সহজে উত্তেজিত হতেন না। মৃদু হেসে ধীরস্থিরভাবে যুক্তিসহকারে পরমত খন্ডন করতেন। এমনকি যুক্তিপূর্ণ হলে ভিন্নমত সহজভাবে গ্রহণ করতেন” ।
আরজ আলী মাতুব্বর সকল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ছিলেন। তবে ধর্মের নয়। এবিষয়ে অধ্যাপক শামসুল হক লিখেছেন, “ আরজ আলী মাতুব্বর মনে করেন, ধর্ম যুগে যুগে মানুষকে সুশৃংখল করে শুভ ও মঙ্গলের পথে নিয়ে যেতে চেয়েছে। কাজেই ধর্মের একটা প্রগতিশীল ভূমিকা আছে। পৃথিবীতে এমন কোন ধর্ম নেই যা মানুষকে অমঙ্গলের পথে নিয়েছে। বরং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা , সহানুভূতি এবং সেবাপরায়নতাই ধর্মের ধ্যেয়। ধৃ ধাতু থেকে ধর্ম- যা মানুষকে ধারণ করে, পোষণ করে। কিন্তু কুসংস্কারের কালো মেঘ ক্রমশ ধর্মকে আচ্ছন্ন করে এক শ্রেণীর মানুষকে মনুষত্ব বিবর্জিত করে ফেলেছে। মাতুব্বরের সংগ্রাম এই মনুষত্বহীন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে”। ( চলবে )