রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩৫ স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩৫ স্বপন চক্রবর্তী
মঙ্গলবার ● ২৬ মে ২০২৬


স্বপন চক্রবর্তী
রঙলেপার জন্মদিন কেন ১ অগ্রহায়ণ?
১ অগ্রহায়ণ রঙলেপার শুভ জন্মদিন। দিনটি আমাদের জন্য বিশৈষ তাৎপর্যপূর্ণ । আশ্বিন ও কার্তিকের অভাব অনটন বাংলাকে খুবই দুঃসহ করে তুলে। যদিও কার্তিক আর অগ্রহায়ণ মিলে হয় হেমন্তকাল। এ সময়ে কোন ফসল ঘরে উঠে না। তবে উঠবে উঠবে শুরু করে। মাঠে ধান পরিপক্ক হয়ে উঠেনা তখনও। ফলে কৃষকের ঘরে অন্নের অভাব প্রকট হয়। হাত থাকে শূণ্য, কপর্দক হীন। স্নেহ মমতা ভালোবাসা তখন উবে যায়। কথায় আছে, দারিদ্র দরজা দিয়ে ঢুকলে ভালোবাসা তখন জ্বানালা দিয়ে পলায়ন করে। পেটের ক্ষিদেয় কত মা তার সন্তান বিক্রি করেছেন জঠর জ্বালা নিবৃত্তি করতে। অনেক স্বামী প্রিয়তমা স্ত্রীকে বেহুশের মতো তালাক দিয়ে বসেন। পরে সন্তানের শুকনো মুখ, খাদ্যের অভাব ও নিরাপত্তা এবং রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া, প্রভৃতি কারণে আবার যদি স্ত্রীকে ঘরে তুলতে একান্তভাবে আগ্রহী হয়, তখন বাধসাধে সমাজ। সমাজপতিরা দুর্দিনে এগিয়ে না এলেও হিলা বিয়ের ব্যাপারে মানবতা দেখাতে কার্পণ্য করে না। তারা তখন এগিয়ে আসে ত্রাণকর্তা হয়ে। এসময় অনেকে উপায়ান্তর না দেখে হয় ঋণগ্রস্ত। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষকে কাছে থেকে দেখেছি, আর তাই এসব দৃশ্যগুলোর চিত্র দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে। তখন আমি উত্তর বঙ্গে থাকি। দুর্ভিক্ষের করাল থাবা থেকে পরিত্রাণের জন্য ফসলের ক্ষেতের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধন করা ছাড়া কৃষকের আর গত্যন্তর থাকেনা। তখন যেন অপেক্ষার প্রহর আর কাটে না। অঞ্চল ভেদে তখন কেহ বলে মঙ্গার মাস, কেহ বলে মরা কার্তিকের মাস। দুর্ভিক্ষও তখনই ঘটে। অবশ্য চুয়াত্তরের মতো না হলেও প্রায় প্রতি বছরই এ সময়ে মঙ্গা দেখা দিতো। বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে, কার্তিকের খাদ্যাভাবকে কোন অবস্থাতেই প্রকৃত দুর্ভিক্ষ বলা যাবে না। এটা খুবই সাময়িক হয়, শুধু ফসল ঘরে উঠার সময়ের একটি ব্যবধান মাত্র, যা একবারই গতানুগতিক। কিন্তু চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ মানুষকে নাজেহাল করে ছিল। তবে সেটা কার্তিকে হয়নি, ইংরেজী মার্চ মাস হতে শুরু হয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে ছিল। দুর্ভিক্ষের উপর গবেষণা করে ড. অমর্ত্য সেন নোবেল পুরস্কারও পেয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে অমর্ত্য সেন একটি বই প্রকাশ করেন। “ Poverty and Famines: An Eassay on Entitlement and Deprivation” নামক এই বইটি খুব বিখ্যাত একটি বই। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, দুর্ভিক্ষ কেবল খাদ্যের অভাবেই হয়না, বরং খাদ্য বিতরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অসমতার কারনেও ঘটে। তিনি আরও্র যুক্তি দিয়ে ছিলেন যে, বাংলার দুর্ভিক্ষের কারন ছিল শহুরে অর্থনৈতিক উথ্থান যা খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। যার ফলে লক্ষ লক্ষ গ্রামীণ শ্রমিক তাদের মজুরি না পেয়ে অনাহারে মারা যায়। তিনি ১৯৯৯ সালে লিখেছেন ” কার্যকর গনতন্ত্রে কখনও দুর্ভিক্ষ হয়নি”। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। বিভিন্নজন এর বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মূলে ছিল রাজনৈতিক কারণই বেশি। সাথে ছিল অব্যবস্থাপনা বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ১৯৭১ সালে দেশ সদ্য স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু বিশেষ লক্ষনীয় বিষয় যে, ১৯৭২ বা ১৯৭৩ সালে তেমন দুর্ভিক্ষ হয়নি। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ। তখনই ১৯৭৪ সালে দেশে দেখা দেয় এক ভয়াবহ বন্যা। যমুনা নদী জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ছয়বার ভেঙ্গে পড়ে। প্রচুর ফসল নষ্ট হয়ে যায় এবং বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে। ফলে কৃষি কাজে নিয়োজিত শ্রমিকগণ কাজ হারান। ফসল উৎপাদনে ভীষণ ঘাটতি দেখা দেয় । কৃষকগণ হয় কপর্দকহীন। চালের দাম তখন বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। ফলে নিম্নবিত্ত মানুষের খাদ্য ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে যায়। অমর্ত্য সেন বলেছেন যে, দুর্ভিক্ষ খাদ্যের অভাবে নয়, মানুষের কেনার সামর্থের অভাবে ঘটে ( অধিকার তত্ত্ব, Entitlement Theory ).
তাছাড়া, ১৯৭৩ সালে তেলের সংকট দেখা দেয়, যা আমাদেরকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ছিল আর্থিক সংকটে। আমদানি হয়নি তখন। বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না তখন। খাদ্য আমদানি নির্ভর দেশটিকে চুক্তি মোতাবেক খাদ্য সহায়তা দেয়নি আমেরিকা। এর পিছনে পাকিস্তান-বাংলাদেশ যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানের পক্ষে আমেরিকার অবস্থান এবং কিউবার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপন ছিল অন্যতম কারণ। আমেরিকার পিএল -৪৮০ ( Public law -480 ) অনুসারে তাদের সম্পর্কের বিরুদ্ধে কেউ অবস্থান নিলে সাধারনত আমেরিকা মেনে নেয় না, এখনও কোন ব্যতিক্রম অবস্থানে নেই। আমেরিকা সব সময় তাদের অনুগতদের সাহায্য করে। সেই চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ এতটাই ভয়াবহ হয়েছিল যে, সরকারি হিসাবেই মৃতের সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার উল্লেখ করা হয়। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা লক্ষাধিক ছিল। যদিও তখনকার পরিসংখ্যান ব্যবস্থা ছিল অনুন্নত।
যাক , সিপাইয়ের গীত রেখে আসল কথায় আসি। ( চলবে ) কম দেখুন

বাংলাদেশ সময়: ২০:৪১:৫১ ● ২৫ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ