রঙলেপা-( রঙে ভরা লেখক-পাঠক ফোরাম ),ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩৯: স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা-( রঙে ভরা লেখক-পাঠক ফোরাম ),ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৩৯: স্বপন চক্রবর্তী
রবিবার ● ৯ আগস্ট ২০২৬


স্বপন কুমার চক্রবর্তী
পর্ব-১
বাংলার স্বভাব কবি, চারণ কবি , মরমী তথা বাউল কবিদের কথা
বাংলাদেশের আনাচে কানাচে একদা অনেক চারণ কবির দেখা মিলতো। অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত মানুষ তাঁরা। কিন্তু কবি প্রতিভা ছিল হৃদয় কাড়া। তাঁরা এক একজন স্বভাব কবিও বটে।
স্বভাব কবি হলেন তাঁরাই, যাঁরা বলতে গেলে জন্মগত ভাবেই কবিত্বশক্তি লাভ করে থাকেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে চমৎকার ছন্দে কবিতা রচনা করতে পারেন। তাঁরা তেমন কোন সাধনা ব্যতিরেকেই ছন্দ ও সুরে কবিতা রচনা করেন এবং নিসর্গ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে উপজীব্য করে কাব্য রচনা করে থাকেন। নারীর রূপ অপরূপ সৌন্দর্য সংমিশ্রণেও বর্ণিত হয়ে থাকে তাঁদের কাব্যে।
তাঁদের উল্লেখযোগ্য আরও বৈশিষ্ট্য হলো-
কোন রকম পূর্ব প্রস্তুতি বা কঠিন নিয়মকানুন ছাড়াই তাঁদের প্রখর কবিত্বশক্তি দিয়ে তাৎক্ষণিক কবিতা সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া তাঁদের কাব্যের প্রধান বিষয়বস্তু থাকে প্রকৃতি, ফুল পাখি নদী বা চারপাশের পরিবেশ। আর অন্যটি হলো তাঁদের সৃজনশীলতার মধ্যে থাকে সহজ সরল সাবলীল এবং একান্তই সাধারণ মানুষের জন্য বোধগম্য উপস্থাপন।
এক সময়ে গ্রামের হাটে-বাজারে অথবা লোক জমায়েতের স্থলে এক ধরণের কবির উপস্থিতি দেখা যেতো, এখনও দেখা যায়, তবে সীমিত। কাঁধে বড় লম্বা কাপড়ের ব্যাগ, কারো কারো একটু লম্বা ধরনের চুল থাকতো। পরনে বেশির ভাগেরই থাকতো লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী। তাঁদের বেশির ভাগ নিরক্ষর। ঝুলিতে থাকতো ছাপানো কবিতা। একটি লিগেল সাইজের কাগজকে চারটি ভাঁজ করে মোট আট পৃষ্ঠা অথবা কখনও কখনও আরও বেশি কবিতা লিখা থাকতো। কিন্তু সেই কবির কোন কবিতাই দেখে দেখে নয়, মুখস্থ থাকতো এবং সুর করে করে বিশেষ ছন্দে তা আবৃত্তি করতেন। লোকের ভীড় জমে যেতো। বিষয়বস্তু নির্বাচন করা হতো সমকালীন জ্বলন্ত ( Burning Issue or Talk of the country ) কোন ঘটনা। প্রেম ঘটিত বিষয়, বিয়োগান্তক অথবা মিলনাত্মক কাহিনী। কখনওবা নৃশংস হত্যাকান্ড ইত্যাদিকে প্রাধান্য দিয়ে লিখতেন কবিতা। সেই কবিতা আটআনা /একটাকার বিনিময়ে অনেকেই কিনে নিতো। আর যারা কিনে নিতে পারতো না তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কবিতা শুনে নিতো। আমার লেখাটির উদ্দেশ্য এখানেই। এই যে মানুষের ঘটনা জানার আগ্রহ এবং সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ এটাই আমার আলোচ্য বিষয়। এই টুকু লিখতে গিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা এসে যায়, তাই লেখা সহজে শেষ করতে পারি না। যাক সেকথা। তবে প্রাসঙ্গিক কথাও কিছু থাকবে। সেই শ্রোতাদের মনের অতৃপ্ত বাসনা কিছু থাকে, ফলে কবিতা বিক্রী হয় এবং কবির পরিশ্রম সার্থক হয় তখনই। কবি তাঁর কবিতা সুর করে করে আবৃত্তি করেন এবং সমাপ্তি টানেন অসমাপ্ত ভাবে। কাহিনীটি জানার আগ্রহে তখন কবিতা বিক্রী হতো প্রচুর। সিনেমা হলে দর্শক নন্দিত কোন ছবি চলতে থাকলেও একই রকম অবস্থা হয়। সিনেমার আলোচিত কিছু গান আর অসমাপ্ত কাহিনী নিয়ে চটি লেখা বিক্রয় হতো হলের সামনে। কাহিনীটির নিচে লিখা থাকতো “ বাকীটুকু রূপালী পর্দায়” । তাতে পাঠকের ক্ষুধা নিবৃ্ত্ত হতো না। তবুও এসব বিক্রী হতো। যাহোক, এই যে জমায়েতে এসে কবি পাঠ করতেন তাঁর সেই অমর কবিতাখানি। সেখানে কখনও এমন দৃশ্যও দেখা যেতো যে, কোন ব্যক্তির মাথায় অন্তত দু;মণ ধানের বস্তা, ঘর্মাক্ত শরীর, তবুও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কবিতা শুনছে। সেই সাহিত্যপ্রেমী মানুষ এখন বিরল। কালের চাহিদার বিবর্তনে রুচি পরিবর্তিত হয়েছে। এ ধরণের কবিতার একটু উদাহরণও দেয়া প্রয়োজন মনে করছি। তাহলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে আশা করি। জনৈক আব্দুর রহিম শিকাদারের সহায়তায় একটি কবিতার অংশ বিশেষ হুবহু তুলে ধরছি। জনাব শিকদার কবিতার বই দিয়ে নয়, মুখস্থ ও মেমোরিতে ধরে রাখা থেকে বলে বলে আমাকে সাহায্য করেছেন। কয়েকটি কবিতা তিনি মুখস্থ শুনালেন। আমি পাঠকদের জন্য উদাহরণ স্বরূপ একটি কবিতার সামান্য অংশ এখানে তুলে ধরলাম। তিনিও হয়তো কবিতা কিনে, নয়তো শুনে শুনে মুখস্থ করেছেন। এক সময়ে আমরাও কবিতা মুখস্থ করতে চেষ্টা করতাম , যাতে কোথাও গিয়ে আবৃত্তি করে শুনাতে পারি। যাক সেকথা,কবিতার একটি নমুনা-
” …. হায় মোহনপুরে ( ২ ) বহু দূরে টাউন ছাড়িয়া, পল্লীগ্রামের হাইস্কুলে পড়ে খোকন মিয়া, পিতা কদম আলী ( ২) শুনেন বলি গরীব অতিশয়, কোনমতে কামলা দিয়া সংসার চালায়, খোকার বন্ধু যারা ( ২) গেছে তারা শহরে পড়িতে, এখন খোকাবাবুর শখ জাগে শহরে যাইতে, খোকন কয়দিন পরে ( ২) পিতার ধারে দুইশ’ টাকা চায়, বর্গা দিয়া খোকার পিতা দুইশ’ টাকা দেয়, খোকন টাকা লইয়া (২), কাপড় গুছাইয়া কালিগঞ্জে যায় ,সেখান থেকে খোকা মিয়া ঢাকাতে পৌঁছায়, যেথায় খালার বাড়ী (২) , আছে তারই সেথায় চলে গেলো, ওখান থেকে খুঁজে খুঁজে জায়গীর একখান পেলো, সে তো জমিদার (২) , নেই জুড়ি যার নামটি উমা খান, টাকাকড়ি বিত্তবৈভব অগাধ আছে যার, তাহার একটি ছেলে (২), একটি মেয়ে ইস্কুলেতে যায়, ১৩৬৮ সালে দারুণ কলেরায়, ছেলে গেলো মারা (২), পুত্র হারা হায়রে মা জননী, পুত্র শোকে পিতামাতা খায়না দানাপানি, এখন মেয়ে লইয়া (২), আছে বইয়া মেয়ের নাম আমেনা, ক্লাস ফোরে পড়ে মেয়ে দেখতে পরীর ছানা, মেয়ের সিনা মোটা ( ২), মাঞ্জা শরু দেখতে চমৎকার, রূপেতে দুনিয়া পাগল তুলনা নাই তার, মেয়ের নীল চোখের মনি (২) ঠোঁট দুখানি আলতার মতো লাল, ঝিকিমিকি করে কন্যার চার আঙ্গুল কপাল, কন্যার বুকের মাঝে (২) ,ফুটে আছে যৌবনেরই ধারা, রূপ দেখিয়া বুড়া পাগল যুবক দিশা হারা, হায়রে বলবো কতো ( ২) শত শত কবিতা হয় ভারী, তাই এক কথায় বললাম কন্যা পরমা সুন্দরী” ।
( চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ২০:৪৮:২৩ ● ১১৩ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ